সোশ্যাল মিডিয়ায় ভূকম্পনের ভুয়ো আতঙ্ক! আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ৮.৫ মাত্রার ভূকম্পনের ভাইরাল, বৈজ্ঞানিক দাবি ভিত্তিহীন

তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই সাক্ষাৎকারের মূল বয়ান কিংবা সুনির্দিষ্ট সময়ের এই আগাম সতর্কবার্তার কোনো স্বাধীন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি। নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বা তারিখ বেঁধে ভূমিকম্পের আগাম পূর্বাভাস দেওয়ার এই দাবিকে কোনোভাবেই বৈজ্ঞানিক বা সরকারি তথ্য হিসেবে গণ্য করা যায় না। ভারত সরকারের ভূবিজ্ঞান মন্ত্রক ও ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি বারবার অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, পৃথিবীর কোনো উন্নত বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির পক্ষেই ভূমিকম্পের নির্ভুল সময়, সুনির্দিষ্ট স্থান বা সঠিক মাত্রা আগে থেকে বলা সম্ভব নয়। ভূকম্পন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলি কেবল ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার পর তার মাত্রা ও উপকেন্দ্র সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করতে পারে।

বিজ্ঞানীদের মতে, উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রাকৃতিক ঝুঁকির বাস্তব তথ্যকে বিকৃত করে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার কাল্পনিক পূর্বাভাসের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে সমাজমাধ্যমে এই ভ্রান্ত প্রচার চালানো হচ্ছে। এ ধরনের অপপ্রচারে ড. বরদলৈয়ের নাম জড়ানো অনুচিত এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। নির্দিষ্ট কোনো তারিখের পূর্বাভাস কাল্পনিক হলেও, উত্তর-পূর্বাঞ্চল যে এক বিশাল ভূকম্পন বলয়ের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে—সেই তেতো সত্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

ভারতীয় ভূকম্পন-ঝুঁকি মানচিত্র অনুযায়ী অসম ও সংলগ্ন রাজ্যগুলি ‘সিসমিক জোন-৫’এর অন্তর্গত, যা দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক শ্রেণি। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এই অঞ্চলে অতীতে একাধিক বিধ্বংসী ভূকম্পন ঘটেছে, ১৮৯৭ সালের মহা-ভূমিকম্প, ৮-এর বেশি মাত্রার এই কম্পন পুরো অঞ্চলকে তছনছ করে দিয়েছিল এবং ব্যাপক প্রাণহানি ঘটিয়েছিল।

১৯৫০ সালের আসাম-তিব্বত ভূমিকম্প, বর্তমান অরুণাচল সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় সৃষ্ট ৮.৬ মাত্রার এই ভূমিকম্প পৃথিবীর নথিভুক্ত অন্যতম শক্তিশালী ভূকম্পন, যা নদনদীর গতিপথ পর্যন্ত বদলে দিয়েছিল। বর্তমান সময়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রায়ই মৃদু ও মাঝারি মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এসব ছোট কম্পন কেবলই ভূগর্ভস্থ শক্তি নির্গমনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া,  এগুলোকে আগাম বড় কোনো বিপর্যয়ের নিশ্চিত লক্ষণ বলা চলে না।

আসল উদ্বেগ অন্য জায়গায়। অসম দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মতে, প্রাকৃতিক ঝুঁকির চেয়েও বড় বিপদ ডেকে আনছে মানুষ নিজেই। গুয়াহাটির মতো দ্রুত বর্ধনশীল মেট্রোপলিটন শহরগুলিতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নিম্নমানের নির্মাণকাজ, বহুতল ভবনের বিল্ডিং কোড না মানা এবং অতিরিক্ত জনঘনত্ব বিপর্যয় মোকাবিলার ক্ষমতাকে ভঙ্গুর করে তুলছে।

ভূমিকম্পের কাল্পনিক পূর্বাভাস ছড়িয়ে আতঙ্ক তৈরির ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০০৬ সালেও সুনির্দিষ্ট সময়ে প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের ভুয়া রটনায় রাজ্যজুড়ে সাধারণ মানুষের রাতে ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসার দৃশ্য দেখা গিয়েছিল। বিজ্ঞান আমাদের বলে দেবে অঞ্চলটি কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু এটি কখনো বলবে না ঠিক কোন সেকেন্ডে মাটি কেঁপে উঠবে।

তাই অযথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজবে কান না দিয়ে মূল নজর দেওয়া উচিত ‘প্রস্তুতি ও বিপর্যয় মোকাবিলা’র ওপর। ব্যক্তিগত ও সরকারি পর্যায়ে ভূমিকম্প সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা, সচেতনতা শিবির পরিচালনা করা এবং গৃহস্থালির জরুরি প্রস্তুতিই হতে পারে আগামী দিনের আসল রক্ষাকবচ।

Related Posts

লালা হাসপাতালে পরিষেবা নয় যেন নার্সের চোখরাঙানি!

যন্ত্রণায় কোঁকাচ্ছে রোগী, আড্ডায় ব্যস্ত নার্স! সরকারি হাসপাতালে এত তাড়া কিসের? নার্সের কুকথায় ক্ষুব্ধ লালাবাসী বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৮ আগষ্টঃ এটা কোনো প্রাইভেট হাসপাতাল নয়, সরকারি হাসপাতাল! এত তাড়াহুড়ো কিসের?…

ভারতের রেলস্টেশনে জলের নামে বিষ গিলছেন ট্রেনের যাত্রীরা! ওয়াটার কুলারে বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়া ই-কোলাইয়ের থাবা

হাওড়া, শিয়ালদহ ও নয়াদিল্লির কঙ্কালসার চেহারা, স্বাস্থ্যের তোয়াক্কা না করে রেলের চরম উদাসীনতা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৮ আগষ্টঃ রেল প্ল্যাটফর্মে তৃষ্ণা মেটাতে গিয়ে গ্লাসে ভরা জল যে আসলে মারণ ব্যাকটেরিয়ার…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *