প্রাথমিকে ৬ কোটি পড়ুয়া থাকলেও উচ্চমাধ্যমিকে পৌঁছানোর আগেই স্কুলছুট ৭৩% শিক্ষার্থী, জাঁতাকলে বিশ্বমানের স্বপ্ন
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৬ আগষ্টঃ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দুই মূল স্তম্ভ, ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এনসিইআরটি) এবং সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসসি)। বিশ্বমানের শিক্ষা, পাঠ্যক্রম সংস্কার এবং স্বচ্ছ পরীক্ষা ব্যবস্থার ঢোল পেটানো হলেও, ভিতরের কঙ্কালসার চেহারাটা অবশেষে প্রকাশ্যে এল।
লোকসভায় পেশ হওয়া প্রাক্কলন কমিটির(কমিটি অন এস্টিমেটস) ২০২৬-২৭ সালের ১৮তম লোকসভার দশম প্রতিবেদনে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এমনই এক উদ্বেগজনক ছবি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং বা এনসিইআরটি-তে অনুমোদিত ২,৮৪৪টি পদের মধ্যে ১,৫৯৬টি পদই শূন্য। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানের মোট অনুমোদিত পদের অর্ধেকেরও বেশি এখনও পূরণ হয়নি।
শুধু এনসিইআরটিই নয়, দেশের স্কুলশিক্ষার অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন বা সিবিএসইতেও একই ধরনের জনবল সংকট দেখা যাচ্ছে। অনুমোদিত ২,১১৭টি পদের মধ্যে ৯৩৩টি পদ খালি রয়েছে। অর্থাৎ, প্রায় ৪৪ শতাংশ পদে কোনও স্থায়ী কর্মী নেই। সংসদীয় কমিটি অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, স্থায়ী কর্মী নিয়োগ না করে অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করছে সিবিএসসি।
অন্যদিকে, সিবিএসই পরিচালনা করে দেশের অন্যতম বৃহৎ স্কুল বোর্ড ব্যবস্থা। জাতীয় স্তরের গুরুত্বপূর্ণ বোর্ড পরীক্ষা থেকে শুরু করে অধিভুক্ত বিদ্যালয়গুলির প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয় সব ক্ষেত্রেই সিবিএসইর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটি প্রতিষ্ঠানে প্রায় অর্ধেক পদ খালি থাকা এবং একই সঙ্গে অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা সংসদীয় কমিটিও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
বিশেষ করে বোর্ড পরীক্ষার মতো সংবেদনশীল ব্যবস্থায় কর্মীদের প্রশিক্ষণ, দায়িত্ববণ্টন, গোপনীয়তা রক্ষা, প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক নজরদারির ক্ষেত্রে স্থায়ী ও দক্ষ জনবলের প্রয়োজন অত্যন্ত বেশি। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে শূন্যপদ পূরণ না করে চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকলে পরীক্ষাব্যবস্থার নিরাপত্তা ও গুণমান নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে।
প্রতিবেদনে ভারতীয় বিদ্যালয় শিক্ষার এক ভয়াবহ ড্রপ-আউট বা পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার ছবি ফুটে উঠেছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দেশের স্কুল ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৯,১১,০৩২ টি শিক্ষার্থী ৬.১৮৫ কোটি। অর্থাৎ, শিক্ষার স্তর যত উপরের দিকে যাচ্ছে, বিদ্যালয়ের সংখ্যা তত দ্রুত কমে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর।
প্রাথমিক স্তরে যেখানে প্রায় ৬.১৮৫ কোটি শিক্ষার্থী নথিভুক্ত রয়েছে, উচ্চমাধ্যমিক স্তরে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১.৬৪২ কোটিতে। দেশে যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৯,১১,০৩২টি, সেখানে উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা মাত্র ৯০,৮৬৬টি।
প্রাথমিক স্তরে ৬.১৮৫ কোটি শিক্ষার্থী নাম নথিভুক্ত করলেও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে তা একঝটকায় নেমে দাঁড়ায় মাত্র ১.৬৪২ কোটিতে! রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ৭৩ শতাংশ শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ করার আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। গ্রামীণ ও পিছিয়ে পড়া এলাকায় পর্যাপ্ত উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকাই এর প্রধান কারণ।
এই বিপুল ব্যবধান শুধু পরিসংখ্যান নয় এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি গভীর সংকট। একটি শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার জন্য কাছাকাছি এলাকায় পর্যাপ্ত উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকলে তাকে দূরের বিদ্যালয়ে যেতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে যাতায়াতের খরচ, বিদ্যালয়ের দূরত্ব, পারিবারিক আর্থিক চাপ, সামাজিক কারণ কিংবা পরিকাঠামোর অভাবের কারণে শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে পড়াশোনা থেকে ছিটকে যায়।
উচ্চমাধ্যমিক স্তরে মোট ভর্তির হার বা গ্রস এনরোলমেন্ট রেশিও (জিইআর) এর ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি রাজ্যের পারফরম্যান্স উদ্বেগজনক, বিহার মাত্র ৩৮.১% মেঘালয়, ৩৯.৭%, নাগাল্যান্ড ৩৯.৮%, মধ্যপ্রদেশ ৪৫.০%, জাতীয় শিক্ষা নীতি (এনইপি) ২০২০ তে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে, শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপির (জিডিপি)৬ শতাংশ করা হবে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার মিলিয়ে বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে মোট ব্যয়ের পরিমাণ জিডিপির মাত্র ৪.১ শতাংশ। অর্থ বরাদ্দের এই ঘাটতি সরাসরি প্রভাব ফেলছে স্কুলের পরিকাঠামোর ওপর। উদাহরণস্বরূপ, প্রযুক্তির এই যুগে দাঁড়িয়েও দেশের মাত্র ৫৮.৬ শতাংশ সরকারি বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। বাকি ৪১.৪% স্কুল এখনও ডিজিটাল শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত।
সংসদীয় কমিটির এই বিস্ফোরক রিপোর্ট আসলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপটিকে জনসমক্ষে এনে দিল। একদিকে বিশ্বগুরু হওয়ার বার্তা, অন্যদিকে দেশের মূল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার শূন্য পদ এবং কোটি কোটি ছাত্রছাত্রীর স্কুলছুট হওয়া, এই দুই বৈপরীত চিত্র সরকারের সদিচ্ছা নিয়েই বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল।
সংসদীয় কমিটি অবিলম্বে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলি নেওয়ার সুপারিশ করেছে, এনসিইআরটি ও সিবিএসসি-র সমস্ত শূন্য পদে দ্রুত স্থায়ী নিয়োগ সম্পন্ন করা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলিকে দ্রুত উচ্চমাধ্যমিক স্তরে উন্নীত করা, যাতে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া আটকানো যায়।
ডিজিটাল পরিকাঠামো জোরদার করতে সব সরকারি স্কুলে ইন্টারনেট পৌঁছানো। শিক্ষায় জিডিপির ৬% বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি কাগজ-কলমে না রেখে বাস্তবে রূপায়ণ করা। শিক্ষা কোনো করুণা নয়, নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এখন দেখার, সংসদীয় কমিটির এই চাবুকের পর কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক ঘুম ভেঙে জাগে নাকি এই রিপোর্টও অন্য আর পাঁচটা ফাইলের মতো লাল ফিতেয় চাপা পড়ে থাকে।





