যোগীরাজ্যে লিটারপ্রতি ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে গোমূত্র!
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৬ আগষ্টঃ দুধ দেওয়া বন্ধ করে দিলে যে গরুকে এতদিন অনেকে গ্রামীণ অর্থনীতির বোঝা বলে মনে করতেন, সেই গরুই এবার গ্রামের কৃষকদের আয়ের নতুন দিশা দেখাতে চলেছে। ভারতের উত্তরপ্রদেশের বুলন্দশহরে যোগী আদিত্যনাথের সরকার শুরু করেছে এক নজিরবিহীন পাইলট প্রকল্প সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে গোমূত্র কেনা।
বর্তমানে ১০ টাকা লিটার দরে সংগ্রহ করা হলেও, ভবিষ্যতে তা বাড়িয়ে ২০ টাকা করার জোর পরিকল্পনা রয়েছে রাজ্য সরকারের। সরকারের দাবি, এই প্রকল্পের ফলে রাসায়নিক সারের দিন শেষ হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি পাবে এক বিশাল আর্থিক গতি।
বুলন্দশহরের সিয়ানা তহসিলের নারসাইনা গ্রাম থেকে শুরু হয়েছে এই অভিনব উদ্যোগ। বর্তমানে ১৫টি গ্রামে একযোগে চালু হয়েছে গোমূত্র সংগ্রহের এই পাইলট প্রজেক্ট। ডা. প্রবীণের নেতৃত্বে একটি কৃষক উৎপাদক সংগঠন পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করছে। সংগৃহীত গোমূত্র নিরাপদে জমিয়ে রাখার জন্য প্রতিটি গ্রামে বসানো হয়েছে ২০০ লিটার ধারণক্ষমতার বিশালাকার বিশেষ ট্যাংক।
এখন পর্যন্ত প্রতিদিন প্রায় ৫০০ লিটার গোমূত্র সংগৃহীত হচ্ছে। আর এই বিশাল কর্মযজ্ঞে মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছেন গ্রামের নারীরা। গ্রামের প্রায় ৩০০ জন নারী সরাসরি এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। গোমূত্র সংগ্রহের কাজে তাঁদের উৎসাহিত করতে প্রতি লিটারে ২ টাকা করে কমিশন দেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু মজুরি বা কমিশনের মধ্যেই তাঁদের অংশগ্রহণ সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি।
প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক নারীকে স্থায়ী শেয়ারহোল্ডার হিসেবেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে প্রকল্পের আর্থিক সুফল থেকে তাঁরা দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবেন এবং তাঁদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দৈনিক গোমূত্র সংগ্রহ প্রায় ৫০০ লিটার, বর্তমান ক্রয়মূল্য প্রতি লিটার ১০ টাকা, প্রস্তাবিত ভবিষ্যৎ ক্রয়মূল্য প্রতি লিটার ২০ টাকা সংগ্রহকারী নারীদের কমিশন প্রতি লিটার ২ টাকা, প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত নারীরা প্রায় ৩০০ জন,
অতিরিক্ত সুবিধা অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক নারীকে স্থায়ী শেয়ারহোল্ডার করা হয়েছে। যেসব গরু আর দুধ দিতে পারে না, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেগুলোকে সামলানো বা খাওয়ানো কৃষকদের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। সরকারের দাবি, গোমূত্র বিক্রির সুযোগ তৈরি হওয়ায় এখন দুধ না দেওয়া গরুর রক্ষণাবেক্ষণ আর কঠিন থাকবে না। কৃষক সেই গরুকে লালন-পালন করেই প্রতিদিন নিশ্চিত আয় করতে পারবেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংগৃহীত গোমূত্রকে জৈব সার, প্রাকৃতিক কীটনাশক ও কৃষিকাজের নানা কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হবে। এতে একদিকে যেমন ক্ষতিকারক রাসায়নিক সারের ওপর থেকে কৃষকদের নির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে তৈরি হবে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষিব্যবস্থা।
বুলন্দশহরের এই পাইলট প্রকল্প সফল হলে খুব শীঘ্রই রাজ্যজুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ নীতি প্রণয়ন করে এটি প্রয়োগ করা হবে। তবে এই প্রকল্প ঘিরে উত্তরপ্রদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ইতিমধ্যেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সরকারের গোমূত্র সংগ্রহ প্রকল্পের তীব্র সমালোচনায় সরব হয়েছে বিরোধী সমাজবাদী পার্টি। দলের অভিযোগ, আসন্ন নির্বাচনের আগে বিশেষ তহবিল জোগাড়ের লক্ষ্যেই এমন ‘আজব ও হাস্যকর’প্রকল্পের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।
সমাজবাদী পার্টির মুখপাত্র মোহাম্মদ আজম খান বলেন, রাজ্যের গোশালাগুলোর পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয়। সেখানে গরুগুলিই যখন নিরাপদ নয়, তখন গোমূত্র সংগ্রহের মতো প্রকল্পকে সামনে রেখে রাজ্যের সার্বিক উন্নয়নের দাবি করা কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, আসন্ন নির্বাচনের জন্য বিশেষ তহবিল জোগাড় করতেই এই ধরনের আজব ও হাস্যকর কেলেঙ্কারির রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। রাজ্যের গোশালাগুলোর অবস্থা চরম বেহাল। সেখানে গরু সুরক্ষিত নয়।
গোমূত্র সংগ্রহের এই প্রকল্প দিয়ে রাজ্যের কোনো সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। সমাজবাদী পার্টির বক্তব্য, গবাদিপশুর সুরক্ষা, গোশালার পরিকাঠামো, কৃষকের স্বার্থ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির প্রকৃত সমস্যাগুলির সমাধানে গুরুত্ব না দিয়ে এমন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে তা সরকারের উন্নয়ন ভাবনার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলবে।
বিরোধীদের এই অভিযোগ অবশ্য এক ফুয়ে উড়িয়ে দিয়েছে শাসকদল বিজেপি। তোপ দেগে দলের মুখপাত্র হিরো বাজপাই বলেন, সমাজবাদী পার্টির অভ্যাসে পরিণত হয়েছে সরকারের প্রতিটি জনকল্যাণমুখী ও উন্নয়নমূলক কাজের মধ্যে গলদ খোঁজা। যে যাদব ও কৃষক সমাজকে সামনে রেখে সমাজবাদী পার্টি রাজনীতি করে, আজ এই প্রকল্পের মাধ্যমে সেই মানুষগুলোই সরাসরি লাভবান হচ্ছেন।
আর সাধারণ মানুষের এই আর্থিক উন্নতিই বিরোধীদের গায়ে জ্বালা ধরাচ্ছে। রাজনৈতিক বাকযুদ্ধে মাঠ গরম থাকলেও, বুলন্দশহরের গ্রামগুলোতে এখন অন্য হাওয়া। দুধ না দেওয়া গরুর মূত্র বিক্রি করে সংসার চালানো বা বাড়তি আয়ের পথ খুলে যাওয়াটা সাধারণ মানুষের কাছে বাস্তব স্বস্তি এনে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই পাইলট প্রকল্পের সাফল্য উত্তরপ্রদেশের কৃষিক্ষেত্রে সত্যিই কোনো স্থায়ী পরিবর্তন আনে কি না, নাকি এটি রাজনীতি আর বিতর্কের ফ্রন্টপেজেই আটকে থাকে!





