এক রাতে জোড়া বিপর্যয়ে তছনছ আপার সুবনসিরি ও দিবাং ভ্যালিতে ৫ম গ্রেনেডিয়ার এর দুটি সেনা আশ্রয়স্থল ভাসিয়ে নিয়ে গেল পাহাড়ি নদী
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ইটানগর ১৫ আগষ্টঃ প্রকৃতির রোষে এক রাতে লন্ডভন্ড উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্ত রাজ্য অরুণাচল প্রদেশ। একদিকে পাহাড়ি ঢালে ভয়াবহ ভূমিধস, অন্যদিকে আচমকা ফুঁসে ওঠা পাহাড়ি নদীর হড়পা বান এই জোড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন চারজন কর্মী, আর জলের তোড়ে ভেসে গিয়ে নিখোঁজ ভারতীয় সেনার পাঁচজন বীর জওয়ান। শোকের ছায়া নেমে এসেছে সেনা ছাউনি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মনে।
ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার সন্ধ্যায়। টানা ও মুষলধারায় বৃষ্টির জেরে অরুণাচল প্রদেশের দুটি ভিন্ন জেলা আপার সুবনসিরি এবং দিবাং ভ্যালিতে নেমে আসে এই মর্মান্তিক বিপর্যয়। শনিবার সকালে ইটানগরের স্টেট ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার সূত্রে খবরটি প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্যজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়।

পাসু পানি ক্যাম্পে হড়পা বান: নিখোঁজ ৫ জওয়ান
দিবাং ভ্যালি জেলার পাসু পানি সেনা ক্যাম্পে তখন স্বাভাবিক ছন্দেই কাজ চলছিল। কিন্তু শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রবল বর্ষণে আচমকাই রুদ্ররূপ ধারণ করে স্থানীয় পাহাড়ি নদী। মুহূর্তে পাহাড় থেকে নেমে আসা তীব্র হড়পা বানের (Flash Flood) জলের তোড়ে ভেসে যায় ৫ম গ্রেনেডিয়ার এর দুটি সেনা শেল্টার।
সেনা সূত্রে জানানো হয়েছে, হড়পা বানের প্রবল স্রোতে মোট সাতজন জওয়ান ভেসে গিয়েছিলেন। পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক ভয়াবহতা সামলে অত্যন্ত তৎপরতার সাথে দু’জনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, জলের তোড়ে তলিয়ে যান বাকি পাঁচজন। নিখোঁজ জওয়ানরা হলেন, হাবিলদার উপেন্দর, জওয়ান কুন্দন, জওয়ান বিনোদ, জওয়ান আদিত্য, জওয়ান সামুন্ডা
নিখোঁজ সেনাকর্মীদের সন্ধানে ইতিমধ্যেই চিরুনি তল্লাশি শুরু হয়েছে। ৫ম গ্রেনেডিয়ারের দুটি বিশেষ উদ্ধারকারী দল ইতিমধ্যই ঘটনাস্থলে নেমেছে। তাছাড়াও উদ্ধারকাজে গতি আনতে যুক্ত হয়েছে, ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ এর ৫৮তম ব্যাটালিয়ন, জেনারেল রিজার্ভ ইঞ্জিনিয়ার ফোর্সের ৬২ রোড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি, অরুণাচল প্রদেশ পুলিশ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল। দুর্গম পাহাড়ি পথ ও বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও উদ্ধারকাজ থামেনি। উপরন্তু, পাসিঘাট থেকে স্টেট ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স এর একটি বিশেষজ্ঞ দল দ্রুত আনিনির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে।
আপার সুবনসিরিতে ধস: মাটির নিচে চাপা পড়ে মর্মান্তিক মৃত্যু ৪ শ্রমিকের
অন্যদিকের দৃশ্যপট আরও নির্মম। একই সময়ে আপার সুবনসিরি জেলার কেওজারিং-বায়াচিং সংযোগস্থলে সড়ক নির্মাণের কাজ চলছিল। পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরির সেই ‘কাটিং সাইটে’ বৃষ্টির জলে আলগা হয়ে আসা বিশাল ধস ও কাদা-মাটির স্তূপ আচমকাই ঝরঝর করে ভেঙে পড়ে কর্মরত শ্রমিকদের ওপর। কাদা ও পাথরের নিচে চাপা পড়েন একাধিক শ্রমিক। জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আধিকারিক জানিয়েছেন, এই ধসের ঘটনায় চারজনের নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে।
মৃতদের পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তাঁরা হলেন, তাডু বাকি, তাজি রাই, মার্কোশ বাসুমাতারি, বাবুল আলি উদ্ধারকারীদের আপ্রাণ চেষ্টায় ইতিমধ্যেই বাবুল আলির নিথর দেহ কাদার নিচ থেকে বের করে আনা হয়েছে। বাকি মৃতদেহগুলি উদ্ধারে ও ধসের নিচে আর কেউ আটকে রয়েছেন কিনা তা নিশ্চিত করতে অভিযান জারি রয়েছে। ঘটনাস্থলে তৎক্ষণাৎ মোতায়েন করা হয়েছে নাচো থানার পুলিশ কর্মীদের। দুর্গম এলাকা হওয়ায় দাপোরিজো থেকে ফায়ার অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সার্ভিসেস এবং এসডিআরএফ-এর বিশেষ উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছাচ্ছে।
দুর্যোগে থমথমে অরুণাচল, হাই অ্যালার্ট জারি
পরপর দুটি ভয়াবহ ঘটনায় পুরো অরুণাচল প্রদেশে শোক ও উদ্বেগের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। পাহাড়ি নদীগুলির জলস্তর বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে এবং বিভিন্ন স্থানে রাস্তাঘাট ধসে গিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের তরফে দুই জেলাতেই উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
আবহাওয়া দফতর সূত্রে আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় উদ্ধারকাজে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হলেও, নিখোঁজ সেনাকর্মী ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের অক্ষত অবস্থায় খুঁজে পেতে সেনার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দিনরাত এক করে লড়ছে রাজ্য ও কেন্দ্র যৌথ উদ্ধারকারী দল।





