চাকরি নেই, বাড়ছে শুধু অপেক্ষার তালিকা, আত্মনির্ভর প্রকল্পের দাবি সত্ত্বেও বেকারত্ব নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ১আগষ্ট, ২০২৬: একদিকে সরকারি মঞ্চে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং আত্মনির্ভরতার নানা সাফল্যের দাবি; অন্যদিকে সরকারি পরিসংখ্যানই তুলে ধরছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। অসমে বেকার সমস্যা এখন আর কেবল একটি সামাজিক সংকট নয়, বরং অর্থনীতি, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। রাজ্যের কর্মসংস্থান দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নিবন্ধিত বেকার ও চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ লক্ষ ৪৩ হাজার ৭৩২ জনে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এদের মধ্যে ১৫ লক্ষ ৩০ হাজার ৭১৪ জনই শিক্ষিত, আর মাত্র ১৩ হাজার ১৮ জন অশিক্ষিত।
চলতি বছরের মাত্র ছয় মাসেই ৩ লক্ষ ৫৫ হাজার ৭৪১ জন নতুন চাকরিপ্রার্থী কর্মসংস্থান বিনিময় কেন্দ্রে নিজেদের নাম নিবন্ধন করেছেন। এই পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও বিপুল সংখ্যক যুবক-যুবতী কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে অনিশ্চয়তা, হতাশা ও সামাজিক চাপ।
সম্প্রতি সমাপ্ত অসম বিধানসভা অধিবেশনে দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোগিতা দপ্তরের মন্ত্রী বিশ্বজিৎ দৈমারী এই তথ্য তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত বেকারদের মধ্যে ৬,২৪,৮৭৭ জন স্নাতক, ১,১৬,১৫৯ জন স্নাতকোত্তর, ৬৫,৭৪৭ জন কারিগরি স্নাতক এবং ৬২,৫৮১ জন কারিগরি ডিপ্লোমাধারী। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত বিপুল সংখ্যক যুবকও কর্মসংস্থানের বাইরে রয়েছেন।

জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। কামরূপ মহানগরে সর্বাধিক ১,২২,৮৫১ জন চাকরিপ্রার্থী নিবন্ধিত। এরপর রয়েছে বরপেটা (৯১,৩১২), নলবাড়ি (৭৪,৯০২), উত্তর লখিমপুর (৬৮,৬১৩), শিলচর (৬৫,৩৬৮), যোরহাট (৬০,৪০৭), নগাঁও (৫৫,৭১৩), শিবসাগর (৫৪,০৯০), ধুবড়ি (৫৩,৫২০), ডিব্রুগড় (৪৬,৪২৮) এবং গোলাঘাট (৪৬,০০৫)। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়, হাজার হাজার পরিবারের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি।
অন্যদিকে সরকার দাবি করছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য একাধিক প্রকল্প ইতিমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে। শিল্প, বাণিজ্য ও গণউদ্যোগ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী সরকারি ব্যবস্থায় বর্তমানে ৭৫৮ জন কর্মরত, যার মধ্যে ১৬৪ জন গেজেটেড এবং ৬২৫ জন নন-গেজেটেড কর্মচারী। পাশাপাশি MSME খাতে ৯৪ লক্ষেরও বেশি কর্মসংস্থানের এবং বৃহৎ শিল্পে ৩২ হাজার ২২৮ জনের কর্মসংস্থানের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।
সরকারের অন্যতম উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প ‘মুখ্যমন্ত্রীর আত্মনির্ভর অসম অভিযান’-এর মাধ্যমে হাজার হাজার যুবককে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ২৫,২৭৭ জনকে এক লক্ষ টাকা করে অনুদান দেওয়া হয় এবং সরকার জানিয়েছে, তাঁদের মধ্যে ২১,৩০১ জন উদ্যোগ শুরু করেছেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১২,৯৭৬ জন সুদমুক্ত ঋণ পেয়েছেন। আবার আত্মনির্ভর অসম অভিযান ২.০-এর অধীনে ৭৪,৬৯৪ জনকে প্রথম কিস্তিতে ৭৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া পিএমএফএমই, পিএমইজিপি এবং পিএম বিশ্বকর্মা প্রকল্পের আওতায় ক্ষুদ্র শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, স্বনিয়োজিত উদ্যোগ এবং ঐতিহ্যবাহী কারিগরদের সহায়তার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পিএমইজিপি-এর মাধ্যমে ১০,৬৫৮টি নতুন উদ্যোগ গড়ে উঠেছে এবং ৯৮,৪৪০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। অন্যদিকে PM বিশ্বকর্মা প্রকল্পের আওতায় ৬৫,৬৩৮ জনকে বিনামূল্যে সরঞ্জাম এবং ১৪,৫০১ জনকে ১৩২ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়েছে।
তবে এখানেই উঠছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যদি এত বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়ে থাকে, যদি এত প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়ে থাকে, তাহলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা কেন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে? চলতি বছরের মাত্র ছয় মাসেই কেন সাড়ে তিন লক্ষেরও বেশি নতুন যুবক চাকরির আশায় কর্মসংস্থান দপ্তরে নাম নথিভুক্ত করতে বাধ্য হলেন? সরকারি প্রকল্পের বাস্তব সুফল কতটা স্থায়ী কর্মসংস্থানে রূপ নিচ্ছে, তা নিয়েও নানা মহলে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষুদ্র অনুদান বা স্বল্প পরিসরের স্বনিয়োজিত প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা বৃহৎ আকারের কর্মসংস্থানের বিকল্প হতে পারে না। শিল্পায়ন, উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণ, তথ্যপ্রযুক্তি, পর্যটন, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যাপক প্রসার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষিত বেকারত্ব কমানো কঠিন।
রাজ্যে বর্তমানে ১৫০টি আইটিআই-তে ৫৯টি ট্রেডে কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে এন্টারপ্রেনারশিপ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম, ডিস্ট্রিক্টস অ্যাজ এক্সপোর্ট হাবস, ওয়ান ডিস্ট্রিক্ট ওয়ান প্রোডাক্ট এবং ‘মুখ্যমন্ত্রীর জীবন প্রেরণা’-র মতো উদ্যোগ চালু হয়েছে। ২০২৫ সালের স্নাতকদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি বা স্বনিয়োজিত হওয়ার জন্য এক বছর ধরে প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা অনুদান দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, কেবল প্রশিক্ষণ, অনুদান বা ঋণ বিতরণ করলেই কর্মসংস্থানের সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো প্রশিক্ষিত যুবকদের জন্য পর্যাপ্ত ও টেকসই চাকরির বাজার তৈরি করা। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগ, বৃহৎ শিল্প স্থাপন এবং দক্ষ মানবসম্পদকে কাজে লাগানোর মতো নীতি বাস্তবায়ন জরুরি।
সরকারের বিভিন্ন কর্মসংস্থানমুখী উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু সরকারি পরিসংখ্যানই যখন দেখাচ্ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, তখন স্পষ্ট যে বর্তমান উদ্যোগগুলির পাশাপাশি আরও কার্যকর, দীর্ঘমেয়াদি এবং ফলপ্রসূ কর্মসংস্থান নীতির প্রয়োজন রয়েছে। কারণ চাকরির অপেক্ষায় থাকা এই ১৫ লক্ষেরও বেশি যুবকের কাছে পরিসংখ্যান নয়, সবচেয়ে বড় চাহিদা একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক কর্মসংস্থান।






