চা-পানির টাকা না দেওয়ায় নবজাতকের মৃত্যু? শিলচর সিভিল হাসপাতালকে ঘিরে চাঞ্চল্য

ঘটনাটি সামনে আসতেই সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার মানবিকতা, জবাবদিহি এবং দুর্নীতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এই সমস্ত অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি। পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, বড়খলা এলাকার চান্দপুর চতুর্থ খণ্ডের বাসিন্দা শরিফ উদ্দিন বড়ভূইয়া গত ২০ জুন রাতে তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী তাজিমা বেগম বড়ভূইয়াকে শিলচর সিভিল হাসপাতালে ভর্তি করেন।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেদিন রাত প্রায় ৮টার দিকে তাজিমা একটি সুস্থ পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। পরিবারের দাবি, নবজাতক সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল এবং জন্মের সময় কোনো গুরুতর জটিলতার কথা চিকিৎসকেরা জানাননি। অভিযোগ, সন্তান জন্মের আনন্দ স্থায়ী হওয়ার আগেই শুরু হয় অর্থ দাবির পর্ব। শরিফ উদ্দিনের দাবি, হাসপাতালের কয়েকজন নার্স চা-পানির খরচের কথা বলে অর্থ দাবি করেন। প্রথমে তিনি ৫০০ টাকা দিতে চাইলে তা গ্রহণ করা হয়নি।

পরে আরও ২০০ টাকা যোগ করেও লাভ হয়নি। শেষ পর্যন্ত ১,৫০০ টাকা দেওয়ার চেষ্টা করলেও অভিযোগ অনুযায়ী তা ফিরিয়ে দিয়ে বলা হয়, অন্য সবাই ৩,০০০ টাকা করে দেয়, আপনাকেও দিতে হবে। শরিফ উদ্দিনের বক্তব্য, তিনি দিনমজুর পরিবারের মানুষ। সংসারের অভাব-অনটনের মধ্যেই চিকিৎসার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। সেই অবস্থায় ৩,০০০ টাকা দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আর সেই কারণেই অভিযোগ অনুযায়ী হাসপাতালের কিছু কর্মীর আচরণ হঠাৎ বদলে যায়। পরিবারের দাবি, অর্থ দিতে না পারার পর থেকেই তাদের প্রতি অবহেলা ও বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু হয়।

চিকিৎসার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হচ্ছিল না। বারবার জানতে চাইলেও সন্তোষজনক উত্তর মেলেনি। ২২ জুন মা ও নবজাতককে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি বলে অভিযোগ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো, নবজাতককে পরিবারের কাছ থেকে আলাদা করে হাসপাতালের তত্ত্বাবধানে রাখা হয় এবং পরিবারের সদস্যদের শিশুটিকে দেখতে পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। একজন মা তার সদ্যোজাত সন্তানকে দেখতে চাইছেন, বাবা বারবার অনুরোধ করছেন, কিন্তু তবুও তাদের সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।

যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে তা শুধু চিকিৎসা-নৈতিকতার নয়, মানবিকতারও চরম লঙ্ঘন। পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, ২৩ জুন হঠাৎ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অচেতন অবস্থায় শিশুটিকে পরিবারের হাতে তুলে দিয়ে দ্রুত শিলচর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। পরিবারের সদস্যরা কোনো সময় নষ্ট না করে শিশুটিকে সেখানে নিয়ে যান। কিন্তু মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানান, শিশুটি আগেই মারা গেছে।

একটি সুস্থ শিশুর জন্ম থেকে কয়েক দিনের মধ্যে মৃত্যুর এই ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই অসংখ্য প্রশ্ন উঠছে। যদি শিশুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়ে থাকে, তবে তার কারণ কী ছিল? পরিবারের সদস্যদের কেন সময়মতো জানানো হলো না? কেন শিশুটিকে দেখতে দেওয়া হয়নি? চিকিৎসার প্রতিটি ধাপের নথি কি সংরক্ষিত রয়েছে? হাসপাতালের নবজাতক পরিচর্যা প্রোটোকল যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের মাধ্যমেই সামনে আসতে পারে। ঘটনার এখানেই শেষ নয়।

পরিবারের অভিযোগ, নবজাতকের মৃত্যুর দুদিন পর এক এএনএম কর্মী, অপর্ণা নামে পরিচিত, তাজিমা বেগমের বাড়িতে গিয়ে তাকে পুনরায় শিলচর সিভিল হাসপাতালে যাওয়ার জন্য চাপ দেন। এমনকি বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শনও করা হয় বলে অভিযোগ। পরে ফোন করে জানানো হয়, পরদিন দলবল নিয়ে বাড়িতে আসা হবে। কিন্তু সারাদিন অপেক্ষা করেও কেউ আসেননি বলে দাবি পরিবারের। এই অভিযোগও তদন্তসাপেক্ষ এবং সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।

শরিফ উদ্দিন বড়ভূইয়া, তার স্ত্রী তাজিমা বেগম বড়ভূইয়া এবং শরিফের বোন লিলি বেগম মজুমদার সংবাদমাধ্যমের সামনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে অভিযোগ করেন, অর্থের অভাবে তারা শুধু অপমানিতই হননি, শেষ পর্যন্ত তাদের সন্তানকেও হারাতে হয়েছে। তারা দাবি করেন, যদি যথাসময়ে সঠিক চিকিৎসা এবং মানবিক আচরণ পেতেন, তাহলে হয়তো আজ তাদের সন্তান বেঁচে থাকত। এই ঘটনায় তারা বড়খলার বিধায়ক, জেলা কমিশনার এবং রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন জানিয়ে নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় বা উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি করেছেন।  

পাশাপাশি, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী পরিবার। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে কোনো দরিদ্র ও অসহায় পরিবারকে এমন পরিস্থিতির শিকার হতে না হয়, সেজন্য সরকারি হাসপাতালগুলিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার আবেদনও জানানো হয়েছে। সরকারি হাসপাতাল সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের শেষ ভরসাস্থল। আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে অসংখ্য মানুষ বেসরকারি হাসপাতালের পরিবর্তে সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার ওপরই নির্ভরশীল।

সেই হাসপাতালেই যদি ঘুষ দাবি, কর্তব্যে অবহেলা, অনিয়ম বা বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ সামনে আসে, তাহলে তা শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগের বিষয় নয়; বরং সমগ্র সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। এমন পরিস্থিতিতে ঘটনার নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলিতে রোগীবান্ধব, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক পরিষেবা নিশ্চিত করার দাবিও জোরালো হয়ে উঠেছে।

Related Posts

নিমন্ত্রণ করে ডেকে এনে অপমান! ৫১৩ নং কবিগুরু এলপি স্কুলে অভিভাবক হেনস্তার অভিযোগে তীব্র চাঞ্চল্য

মধ্যাহ্নভোজ, রাঁধুনির অনুপস্থিতি ও স্কুল পরিচালনায় একাধিক অনিয়মের তদন্তের দাবি বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ জুলাইঃ হাইলাকান্দি শিক্ষা খণ্ডের আওতাধীন ৫১৩ নং কবিগুরু এলপি স্কুলকে কেন্দ্র করে একের পর এক গুরুতর…

দ্বিতীয় দিনেও শ্রীভূমিতে বুলডোজার অভিযান, কান্নায় ভেঙে পড়ল একাধিক পরিবার

তিন দিনের নোটিশে উচ্ছেদ নিয়ে ক্ষোভ তুঙ্গে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ উপেক্ষার অভিযোগ বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ জুলাইঃ শ্রীভূমি শহরের ব্রজেন্দ্র রোড ও রমণী রোড এলাকায় দ্বিতীয় দিনের মতো চলা উচ্ছেদ…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *