দিনের আলোয় শিলচর আদালত প্রাঙ্গণে দুঃসাহসিক চুরি!

চুরি যাওয়া মোটরসাইকেলের মালিক আইনজীবী জয়প্রকাশ জানান, প্রতিদিনের মতো তিনি আদালতের নতুন ভবনের নিচে নির্দিষ্ট পার্কিং এলাকায় নিজের মোটরসাইকেলটি লক করে আদালতের কাজে যান। ওই স্থানেই নিয়মিত বহু আইনজীবী ও মামলাকারী তাঁদের যানবাহন রেখে থাকেন। আদালতের কাজ শেষে ফিরে এসে তিনি দেখেন, মোটরসাইকেলটি আর সেখানে নেই। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, গাড়ির মূল চাবি তাঁর কাছেই ছিল।

অর্থাৎ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে লক অবস্থাতেই মোটরসাইকেলটি চুরি করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই তিনি সংশ্লিষ্ট থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পাশাপাশি বিষয়টি শিলচর বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির নজরেও আনা হয়েছে। আইনজীবী জয়প্রকাশ আশা প্রকাশ করেন, প্রশাসন ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের গ্রেপ্তার করবে এবং তাঁর মোটরসাইকেল উদ্ধার করবে।

তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আদালত চত্বরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আদালত প্রাঙ্গণে স্থাপিত অধিকাংশ সিসিটিভি ক্যামেরা দীর্ঘদিন ধরে বিকল। যদি সেগুলি সচল থাকত, তাহলে চুরির পুরো ঘটনাই ক্যামেরায় ধরা পড়ার সম্ভাবনা ছিল এবং তদন্ত অনেক সহজ হতো। অথচ একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে নজরদারি ব্যবস্থা এত দীর্ঘ সময় ধরে অচল থাকলেও তা মেরামতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।

আইনজীবীদের একাংশের বক্তব্য, আদালত এমন একটি স্থান, যেখানে প্রতিদিন বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষ, আইনজীবী, বিচার বিভাগীয় কর্মী ও বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা যাতায়াত করেন। এমন একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর না থাকে, তাহলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁদের মতে, আদালত চত্বরে প্রবেশ ও বের হওয়া ব্যক্তিদের পর্যাপ্ত নজরদারি, কার্যকর সিসিটিভি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, আদালত প্রাঙ্গণের মতো নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকা থেকে দিনের বেলায় একটি লক করা মোটরসাইকেল কীভাবে উধাও হয়ে গেল? নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি কি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে? যদি সিসিটিভি দীর্ঘদিন ধরে বিকল ছিল, তবে তা মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আদালত চত্বরে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি বহুদিন ধরেই উঠছিল। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। এই ঘটনাকে তাঁরা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না; বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করছেন।

ঘটনার সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রশ্ন ছিল, যদি এই চুরির ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি গ্রেপ্তার হন, তবে তাঁর পক্ষে কি আদালতের আইনজীবীরাই মামলা লড়বেন? উপস্থিত কয়েকজন আইনজীবী স্পষ্টভাবে জানান, এটি সম্পূর্ণ তাঁদের ব্যক্তিগত মত হলেও, এমন ঘটনার অভিযুক্তের পক্ষে তাঁরা মামলা পরিচালনা করতে আগ্রহী নন। এদিকে সচেতন মহলের দাবি, শুধু চুরি হওয়া মোটরসাইকেল উদ্ধার করাই যথেষ্ট নয়।

আদালত চত্বরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামগ্রিক পর্যালোচনা, বিকল সিসিটিভি দ্রুত মেরামত, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। পাশাপাশি সিসিটিভি দীর্ঘদিন অচল থাকার পেছনে কোনো প্রশাসনিক গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

এই ঘটনায় আদালত প্রাঙ্গণের নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ আদালত এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে মানুষ ন্যায়বিচারের আশায় আসেন। সেই স্থানেই যদি নিজের সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তবে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম নেয়। এখন সকলের নজর পুলিশের তদন্তে। চুরি যাওয়া মোটরসাইকেল কত দ্রুত উদ্ধার হয়, অভিযুক্তদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা যায় কি না এবং আদালত চত্বরে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ঘাটতি দূর করতে প্রশাসন কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Related Posts

নিমন্ত্রণ করে ডেকে এনে অপমান! ৫১৩ নং কবিগুরু এলপি স্কুলে অভিভাবক হেনস্তার অভিযোগে তীব্র চাঞ্চল্য

মধ্যাহ্নভোজ, রাঁধুনির অনুপস্থিতি ও স্কুল পরিচালনায় একাধিক অনিয়মের তদন্তের দাবি বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ জুলাইঃ হাইলাকান্দি শিক্ষা খণ্ডের আওতাধীন ৫১৩ নং কবিগুরু এলপি স্কুলকে কেন্দ্র করে একের পর এক গুরুতর…

দ্বিতীয় দিনেও শ্রীভূমিতে বুলডোজার অভিযান, কান্নায় ভেঙে পড়ল একাধিক পরিবার

তিন দিনের নোটিশে উচ্ছেদ নিয়ে ক্ষোভ তুঙ্গে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ উপেক্ষার অভিযোগ বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ জুলাইঃ শ্রীভূমি শহরের ব্রজেন্দ্র রোড ও রমণী রোড এলাকায় দ্বিতীয় দিনের মতো চলা উচ্ছেদ…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *