আইপিএল ক্রিকেটের উন্মাদনার আড়ালে কোটি টাকার জুয়ার রমরমা বাণিজ্য !
পুলিশের অভিযানে ধরা পড়ছে পুকুরের কয়েকটা ছোট মাছ, আড়ালে থেকেই কোটি টাকার কারবার চালাচ্ছে রাঘব বোয়ালরা!
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর, ২৩ মেঃ বরাক উপত্যকায় আইপিএল মরশুম এলেই একসময় যেখানে ক্রিকেটপ্রেমীদের উন্মাদনাই ছিল মূল আকর্ষণ, সেখানে এখন ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে এক ভয়ংকর অবৈধ জুয়ার সাম্রাজ্য। বিভিন্ন মহলের বিস্ফোরক অভিযোগ, আইপিএলকে কেন্দ্র করে কাছাড়-সহ গোটা বরাকজুড়ে গড়ে উঠেছে কোটি টাকার সুসংগঠিত সাট্টাবাজ চক্র, যার শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে রাজ্যের বাইরেও। সম্প্রতি কাছাড় পুলিশের তরফে কয়েকটি ছোটখাটো অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করা হলেও, প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে পুলিশের ভূমিকা নিয়েই।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, অভিযানে ধরা পড়ছে কেবল পুকুরের ছোট মাছ, অথচ আসল রাঘব বোয়ালরা আজও প্রশাসনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। পুলিশের তৎপরতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই প্রথমদিকে আত্মগোপনে চলে গিয়েছিল চক্রের মূল হোতারা। কিন্তু পরিস্থিতি কিছুটা থিতিয়ে যেতেই আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে পুরো নেটওয়ার্ক।
অভিযোগ, গত এক মাস ধরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় গোপনে নয়, কার্যত প্রকাশ্যেই চলছে ক্রিকেট জুয়ার রমরমা ব্যবসা। শহরের একাধিক হোটেল, ভাড়া বাড়ি, ফ্ল্যাট, এমনকি কিছু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকেও ব্যবহার করা হচ্ছে অবৈধ বেটিং সেন্টার হিসেবে। সন্ধ্যা নামলেই এসব জায়গায় বসছে সাট্টার আসর। আইপিএলের প্রতিটি বল, উইকেট, রান কিংবা ম্যাচের ফলাফল ঘিরে লাগছে লাখ লাখ টাকার বাজি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, গোটা চক্র এখন প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। মোবাইল অ্যাপ, টেলিগ্রাম গ্রুপ, হোয়াটসঅ্যাপ কল এবং অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে লেনদেন হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। ফলে সরাসরি নগদ লেনদেন কমে যাওয়ায় তদন্তের ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে জটিলতা। অভিযোগ উঠছে, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির আড়ালে বসেই আন্তঃরাজ্য সাট্টাবাজ চক্র গোটা নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে। স্থানীয় সচেতন মহল অভিযোগ করে বলেন, এই অবৈধ জুয়ার কারবারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যুবসমাজ। দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভে বহু তরুণ এই চক্রে জড়িয়ে পড়ছে। কেউ সর্বস্বান্ত হচ্ছে, কেউ আবার ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে মানসিক অবসাদের শিকার হচ্ছে। অনেক পরিবারেও নেমে এসেছে অশান্তি।
এদিকে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, যদি প্রশাসন সত্যিই কঠোর অবস্থান নেয়, তবে এখনও পর্যন্ত কেন মূলচক্রের হোতাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হলো না? কোথাও কি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া রয়েছে? নাকি প্রযুক্তিনির্ভর এই জুয়া সিন্ডিকেটের সামনে কার্যত অসহায় হয়ে পড়ছে তদন্তকারী সংস্থাগুলি? বরাক উপত্যকায় আইপিএল ঘিরে বেড়ে ওঠা এই অবৈধ সাট্টাবাজির জাল এখন শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তা ও যুবসমাজের ভবিষ্যতের জন্যও বড়সড় উদ্বেগ হয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষের দাবি, নামমাত্র অভিযান নয়, এবার মূলচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করুক প্রশাসন।
অভিযোগের তীর আলোচনায় এসেছে শিলচর শরৎপল্লীর জয় দেবনাথ, লক্ষীপুরের রাহুল, ৩য় লিংক রোডের সমীর দাস, রাঙ্গিরখাড়ি-হাইলাকান্দি রোড, ন্যাশনাল হাইওয়ে পয়েন্ট এবং সোনাই রোড এলাকার রুবেল, মান্না, মিটন, বাচ্চু, বাপ্পন, বাপ্টু, গৌতম, গণেশ ও রূপম সহ কয়েকজন যুবকের নাম। স্থানীয়দের দাবি, এদের মধ্যে অনেকেই নাকি দীর্ঘদিন ধরে আইপিএল বেটিং সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত এবং যুবকদের এজেন্ট বানিয়ে জাল বিস্তার করছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই অবৈধ জুয়ার নেশায় ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ছে বহু তরুণ।
সহজে টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে যুবকদের টেনে নেওয়া হচ্ছে সাট্টার অন্ধকার দুনিয়ায়। প্রথমে কয়েকশো টাকার বাজি, পরে হাজার, তারপর লক্ষ টাকার দেনা এভাবেই বহু পরিবার আজ আর্থিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মুখে। অভিযোগ, কেউ জমি বিক্রি করেছেন, কেউ ধারদেনায় জর্জরিত, আবার কেউ সংসারে অশান্তির কারণে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
শহরের এক ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ছেলেটা প্রথমে মোবাইলে খেলা দেখত। পরে বন্ধুদের মাধ্যমে বেটিংয়ে জড়িয়ে পড়ে। আজ কয়েক লক্ষ টাকার দেনা। বাড়িতে শান্তি নেই। পুলিশ সব জানে, তবু বড় মাথাদের ধরছে না। স্থানীয় সমাজকর্মীদের অভিযোগ, এই জুয়া শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি ধীরে ধীরে সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে। ক্রিকেটের আবেগকে হাতিয়ার করে যুবসমাজকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। অনলাইন বেটিং অ্যাপের মাধ্যমে রাতারাতি ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখানো হলেও বাস্তবে অধিকাংশই সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।
অভিযোগ আরও গুরুতর। পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, স্পেশাল ব্রাঞ্চ ইতিমধ্যেই জুয়ার সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যক্তির নাম ও কার্যকলাপের রিপোর্ট ঊর্ধ্বতন মহলে জমা দিয়েছে। এমনকি কারা কোথা থেকে এই চক্র পরিচালনা করছে, কারা টাকা সংগ্রহ করছে এবং কোন কোন এলাকায় নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে রয়েছে, সেসব তথ্যও নাকি পুলিশের কাছে রয়েছে। কিন্তু তারপরও বড় ধরনের অভিযান না হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে।
সাধারণ মানুষের একাংশের অভিযোগ, লোক দেখানো অভিযানে ছোটখাটো এজেন্টদের আটক করা হলেও মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, পুলিশ কি সত্যিই এই জুয়া বন্ধ করতে চায়, নাকি শুধুই দায়সারা অভিযান চালিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করছে? এদিকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যা নামলেই গোপনে সক্রিয় হয়ে উঠছে বেটিং চক্র। মোবাইল ফোনে নির্দিষ্ট কোড, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, অনলাইন পেমেন্ট ও টেলিগ্রাম চ্যানেলের মাধ্যমে চলছে কোটি টাকার লেনদেন। ম্যাচের প্রতিটি বল, ওভার, উইকেট, এমনকি রান রেট নিয়েও লাগছে বাজি। সূত্রের খবর, এই চক্রের সঙ্গে বাইরের রাজ্যের সংযোগও রয়েছে।
সচেতন মহলের বক্তব্য, এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে। কারণ এই জুয়ার নেশা শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, ধ্বংস করে দিচ্ছে গোটা পরিবারকে। ক্রিকেটপ্রেমকে পুঁজি করে বেআইনি অর্থের পাহাড় গড়ে তুলছে একদল অসাধু চক্র, আর তার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ ও যুবসমাজ। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধুমাত্র নামমাত্র অভিযান নয়, অবিলম্বে বড় আকারে অভিযান চালিয়ে মূল চক্রকে গ্রেফতার করতে হবে। একইসঙ্গে অনলাইন বেটিং অ্যাপ ও গোপন নেটওয়ার্কের উপর নজরদারি বাড়ানোর দাবিও উঠেছে। অন্যথায় আইপিএল ঘিরে এই কালো সাম্রাজ্য ভবিষ্যতে সমাজের জন্য আরও বড় বিপদ ডেকে আনবে বলেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সচেতন নাগরিকরা।





