স্কুলে যাওয়ার পথে নাবালিকাকে হয়রানির অভিযোগ ঘটনার জেরে এলাকাজুড়ে ক্ষোভ, তদন্তে পুলিশ
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, শিলচর ২৩ মেঃ কাছাড় জেলার কাটিগড়া সমষ্টির বরইতলী গ্রামে এক অষ্টম শ্রেণির নাবালিকা স্কুলছাত্রীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া অশালীন আচরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে স্কুলে যাতায়াতের পথে এক পঞ্চাশোর্ধ ব্যক্তি ওই নাবালিকাকে কুপ্রস্তাব, অশ্লীল ইঙ্গিত ও মানসিকভাবে হেনস্তা করে আসছিল। অবশেষে বৃহস্পতিবার সকালে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রকাশ্যেই ছাত্রীর হাত ধরে টানাটানি করে এবং তাকে কুপ্রস্তাব দেয়।
ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের নয়, গোটা সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। অভিযুক্ত ইছাক আলীকে পুলিশ আটক করলেও, এই ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, স্কুলে যাওয়া নাবালিকা মেয়েরাও কি আজ আর নিরাপদ নয়? দিনের আলোয়, গ্রামের রাস্তায়, প্রকাশ্যে এমন দুঃসাহস যদি কেউ দেখাতে পারে, তবে প্রশাসনের নজরদারি ও সামাজিক প্রতিরোধ কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে, তা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বরইতলী গ্রামের ওই ছাত্রী প্রতিদিনের মতো স্কুলে যাতায়াত করত। কিন্তু অনেকদিন ধরেই তার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল অভিযুক্ত ব্যক্তি। অভিযোগ, সুযোগ পেলেই সে অশ্লীল মন্তব্য করত, কুপ্রস্তাব দিত, এমনকি নোংরা ইঙ্গিতের মাধ্যমে নাবালিকার মানসিক শান্তি নষ্ট করছিল। ভয়, লজ্জা ও সামাজিক অপমানের আশঙ্কায় এতদিন বিষয়টি পরিবারকে জানাতে পারেনি ছাত্রীটি। অথচ ভিতরে ভিতরে সে আতঙ্কে ভেঙে পড়ছিল। পরিবারের এক সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটা ছোট মেয়ে প্রতিদিন ভয় নিয়ে স্কুলে যাবে, এটা কি সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায়? যদি আজ সে প্রতিবাদ না করত, তাহলে আগামী দিনে আরও বড় বিপদ ঘটতে পারত।
অভিযোগ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে নির্জন রাস্তায় একা পেয়ে অভিযুক্ত আচমকা ছাত্রীর হাত চেপে ধরে টানাটানি শুরু করে। এরপর তাকে কুপ্রস্তাব দেয়। আচমকা এমন ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ে ছাত্রীটি। প্রাণপণে নিজেকে ছাড়িয়ে কোনোরকমে সেখান থেকে পালিয়ে স্কুলে পৌঁছায় সে। কিন্তু মানসিক ধাক্কা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে স্কুলেই অসুস্থ হয়ে পড়ে নাবালিকা। পরে জ্ঞান ফিরলে কান্নায় ভেঙে পড়ে শিক্ষকদের সামনে পুরো ঘটনার কথা খুলে বলে।
বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মেয়েটি অত্যন্ত আতঙ্কিত অবস্থায় ছিল। বারবার কাঁদছিল। আমরা বুঝতে পারছিলাম, ঘটনাটি তার মনে গভীর আঘাত দিয়েছে। এরপর দ্রুত বিষয়টি ছাত্রীর পরিবারকে জানানো হয়। ঘটনার খবর পেয়ে নাবালিকার মামা জয়দীপ পাল (পাপাই) লক্ষ্মীপুর জিপির ওয়ার্ড সদস্যার প্রতিনিধি ও সমাজসেবী সুমিত পালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অভিযোগের গুরুত্ব বুঝে তাঁরা দ্রুত ছাত্রীর বাড়িতে পৌঁছে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ঘটনার বিস্তারিত জানেন।
পরবর্তীতে বিষয়টি কাটিগড়ার বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরোকায়স্থের নজরে আনা হলে তিনি দ্রুত প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করেন বলে জানা গেছে। সূত্রের দাবি, বিধায়কের হস্তক্ষেপের পরই পুলিশ প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। শিলচরের পুলিশ সুপার ও কাটিগড়ার সার্কেল অফিসার যাত্রা কান্ত কর্মকারকে বিষয়টি জানানো হলে কালাইন থানার পুলিশ তৎপরতা শুরু করে। তবে এখানেই উঠছে আরেকটি বড় প্রশ্ন।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, প্রশাসন যদি আগে থেকেই এলাকায় উত্যক্তকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিত, তাহলে হয়তো এই ঘটনা ঘটত না। তাঁদের বক্তব্য, গ্রামের রাস্তাঘাটে নাবালিকাদের উত্যক্ত করার প্রবণতা নতুন নয়। বহু ক্ষেত্রেই পরিবারগুলি সামাজিক চাপে মুখ খুলতে পারে না। সেই সুযোগ নিয়েই সমাজবিরোধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এক স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, আজ যদি মেয়েটা সাহস করে না বলত, তাহলে কাল আরও বড় অপরাধ ঘটতে পারত। এসব লোককে শুধু গ্রেফতার করলেই হবে না, এমন শাস্তি দিতে হবে যাতে আর কেউ এমন নোংরা সাহস না দেখায়।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই বরইতলী এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের আসার আগেই অভিযুক্ত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরে গ্রামবাসী ও পুলিশের যৌথ তল্লাশিতে তাকে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিকে প্রথমে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নাবালিকার পরিবারের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
পুরো ঘটনার তদন্ত চলছে এবং আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এদিকে, সমাজের সচেতন মহল এই ঘটনাকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখতে নারাজ। তাঁদের মতে, এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের ভয়াবহ নগ্নদৃশ্য। যেখানে স্কুলপড়ুয়া মেয়েরাও রাস্তাঘাটে নিরাপদ নয়, সেখানে নারী নিরাপত্তা নিয়ে বড় বড় ভাষণ কেবল কাগুজে বুলি ছাড়া কিছুই নয়।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা এক সমাজকর্মী বলেন, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, মেয়েটি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছিল অথচ ভয়ে কাউকে বলতে পারেনি। এটা প্রমাণ করে পরিবার ও সমাজে এখনো সেই নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়নি, যেখানে শিশুরা নির্ভয়ে নিজের কষ্ট বলতে পারে। জয়দীপ পাল ও সুমিত পাল প্রশাসনের কাছে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, এই ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার এবং কঠোর শাস্তি না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়বে। ঘটনার পর থেকে গোটা এলাকায় আতঙ্কের পাশাপাশি ক্ষোভও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
অভিভাবকদের দাবি, স্কুলপড়ুয়া ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পুলিশি নজরদারি, সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং কঠোর সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নইলে আজ বরইতলী, কাল অন্য কোথাও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। সমাজের বিবেকবান মানুষের প্রশ্ন এখন একটাই, আর কতদিন নাবালিকাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদাসীন থাকবে প্রশাসন ও সমাজ? কবে বন্ধ হবে পথেঘাটে মেয়েদের উপর এই নোংরা মানসিক নির্যাতন? শুধু গ্রেফতার নয়, প্রয়োজন কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সামাজিক প্রতিরোধের শক্ত ভিত গড়ে তোলা। নইলে আগামী প্রজন্মের মেয়েরা ভয় নিয়েই বড় হবে, আর সমাজ ধীরে ধীরে হারাবে তার মানবিক মুখ।





