বরাকবাণী সংবাদে প্রতিবেদন প্রকাশের ১২ ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেফতার বিজেপি ওবিসি মোর্চা সভাপতি নিরুপম নাথ
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২০ মেঃ কাটিগড়া সমষ্টিতে সরকারের বিনামূল্যের বিদ্যুৎ সংযোগ প্রকল্পকে ঘিরে ওঠা উৎকোচ কাণ্ডে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গরিব ও অসহায় পরিবারের কাছ থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ পাইয়ে দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগে অবশেষে গ্রেফতার হলেন পশ্চিম কাটিগড়া এলাকার বিজেপি ওবিসি মোর্চার সভাপতি নিরুপম নাথ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বরাকবাণী সংবাদে অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যেই প্রশাসন নড়েচড়ে বসে এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে পুলিশ।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন শুধু কাটিগড়াই নয়, গোটা কাছাড় জেলার রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, গরিব মানুষের জন্য চালু হওয়া সরকারি প্রকল্প কি এখন কিছু রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তির আয়ের উৎসে পরিণত হচ্ছে? আর যদি সত্যিই অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে এর পেছনে আর কারা জড়িত রয়েছে?
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কুশিয়ারকুল এলাকার বিজেপি ওবিসি মোর্চার সভাপতি নিরুপম নাথ এবং তাঁর সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত জয় দাস। অভিযোগ অনুযায়ী, কাটিগড়া সমষ্টির কুশিয়ারকুল জিপির অন্তর্গত বিশ্বম্ভরপুর গ্রামের এক অসহায় পরিবারের কাছ থেকে বিনামূল্যের বিদ্যুৎ সংযোগ পাইয়ে দেওয়ার নামে টাকা দাবি করা হয়। ভুক্তভোগী দীপক দাস ও তাঁর স্ত্রী চঞ্চলা রানী দাসের অভিযোগ, তাঁদের সংসারের অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়ে।
অথচ সেই পরিবারকেই বিদ্যুতের আশ্বাস দিয়ে টাকা দিতে বাধ্য করা হয়। অভিযোগ, মোট ১৫০০ টাকা দাবি করা হয়েছিল। বহু কষ্টে ধারদেনা করে তাঁরা এক হাজার টাকা নিরুপম নাথের হাতে তুলে দেন। এরপর বাকি ৫০০ টাকা না দিলে মিটার বসানো হবে না বলেও জানানো হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, টাকা নেওয়ার পরও এখনও পর্যন্ত ওই পরিবারের ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ বা মিটার বসানো হয়নি।
ফলে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন এলাকাবাসী। তাঁদের বক্তব্য, যে প্রকল্প গরিব মানুষের ঘরে আলো পৌঁছে দেওয়ার জন্য, সেই প্রকল্পের নামেই যদি গরিব মানুষের রক্ত ঘাম ঝরানো টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে সেটা শুধু দুর্নীতি নয়, মানবিকতার বিরুদ্ধেও অপরাধ।
সরকারের তরফে দরিদ্র সীমারেখার নিচে বসবাসকারী অসহায় পরিবারগুলোর ঘরে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগকে সাধারণ মানুষ স্বাগত জানিয়েছিলেন। বিশেষ করে কাটিগড়া সমষ্টির বিধায়ক শ্রী কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থের উদ্যোগে বহু পরিবার দীর্ঘ অন্ধকার থেকে মুক্তি পেতে শুরু করেছিল। প্রকল্প চালুর সময় থেকেই বিধায়ক স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, কোনও ব্যক্তি বা বিভাগীয় কর্মচারী যদি বিদ্যুৎ সংযোগের নামে টাকা দাবি করে, তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাধারণ মানুষকে বারবার সতর্ক করা হয়েছিল যাতে কেউ কোনও দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর হাতে টাকা না দেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের আড়ালে কিছু রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে গরিব মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। ফলে সরকারের জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এলাকার সচেতন মানুষ গুরুতর অভিযোগ করে বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো অভিযুক্ত ব্যক্তি কোনও সাধারণ মানুষ নন, তিনি শাসকদলের এক গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনিক পদে রয়েছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে, রাজনৈতিক পরিচয় কি এখন প্রশাসনিক ভয়মুক্তির ঢাল হয়ে উঠছে? স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, পশ্চিম কাটিগড়ায় দীর্ঘদিন ধরেই এক শ্রেণির রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন।
কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে কয়লা সিন্ডিকেট, কারও বিরুদ্ধে মাটি, সুপারি, কয়লা, চুনাপাথর কিংবা পাথর ব্যবসা ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগ। যদিও এসব অভিযোগের আনুষ্ঠানিক তদন্ত এখনও হয়নি, তবুও এলাকায় এই নিয়ে চাপা ক্ষোভ বহুদিনের। অনেকের অভিযোগ, সরকারি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে যদি রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সিন্ডিকেট সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তাহলে প্রকৃত উপভোক্তারাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হবেন।
এই ঘটনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর এলাকাজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বরাকবাণী সংবাদে বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রশাসন সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত অভিযুক্ত নিরুপম নাথকে গ্রেফতার করা হয়। এতে একদিকে যেমন সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকাকে সাধুবাদ জানানো হচ্ছে, অন্যদিকে প্রশ্ন উঠছে, অভিযোগ প্রকাশ্যে না এলে কি আদৌ কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হতো?
এখন রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কাছাড় বিজেপি পশ্চিম কাটিগড়া মণ্ডল এই ঘটনায় কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে? দল কি শুধুমাত্র গ্রেফতারের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখবে, নাকি সাংগঠনিক স্তরেও কঠোর ব্যবস্থা নেবে? সাধারণ মানুষের দাবি, যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে শুধুমাত্র আইনানুগ পদক্ষেপ নয়, দলীয়ভাবেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কারণ, কোনও রাজনৈতিক কর্মী বা পদাধিকারী যদি গরিব মানুষের প্রাপ্য সরকারি সুবিধা নিয়ে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা নষ্ট করে।
বর্তমানে এলাকায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্ন হলো, এই তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ হবে? কারণ, অভিযুক্ত নিরুপম নাথকে স্থানীয়ভাবে বিধায়ক ঘনিষ্ঠ বলেই মনে করা হয়। ফলে বিরোধী মহল এবং সাধারণ মানুষের একাংশের আশঙ্কা, বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। মানুষের বক্তব্য পরিষ্কার, গরিব মানুষের কষ্টের টাকা নিয়ে কেউ যদি রাজনীতি করে, তাহলে তার কোনও রাজনৈতিক পরিচয় দেখা উচিত নয়।
দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তি হওয়া দরকার। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব সত্যিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয় কিনা, নাকি কয়েকদিনের চর্চার পর পুরো ঘটনাই ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায়। তবে আপাতত কাটিগড়ার সাধারণ মানুষের একটাই দাবি, প্রকৃত তদন্ত হোক, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক, এবং ভবিষ্যতে যেন কোনও অসহায় পরিবারকে বিনামূল্যের সরকারি প্রকল্পের জন্য আর উৎকোচ দিতে না হয়।





