বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৯ মেঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গরু নতুন কোনো বিষয় নয়। বহু বছর ধরেই গো-মাংস, কুরবানী, গো-রক্ষা, ধর্মীয় আবেগ এবং ভোটের অঙ্ক সব মিলিয়ে গরুকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক আলাদা রাজনৈতিক অর্থনীতি। কিন্তু রাজনীতির ইতিহাসে এমনও সময় আসে, যখন যে অস্ত্র দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেই অস্ত্রই ফিরে এসে নিজের গলায় ফাঁস হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলার বর্তমান পরিস্থিতি যেন ঠিক তেমনই এক রাজনৈতিক উলটপুরাণ। এতদিন ধরে রাজনীতির মঞ্চে একটাই প্রচার জোরালোভাবে চালানো হয়েছে, মুসলমান মানেই গো-মাংসের চাহিদা, কুরবানী মানেই গরুর বাজারে উন্মাদনা। সেই ধারণাকেই সামনে রেখে একদিকে ধর্মীয় মেরুকরণ, অন্যদিকে ভোটের অঙ্ক দুই-ই কষা হয়েছে বছরের পর বছর। কিন্তু বাস্তবের মাটিতে এবার দেখা যাচ্ছে এক সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র।
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন গরুর হাটে এখন অদ্ভুত পরিস্থিতি। যে সময়টায় কুরবানীর বাজার জমজমাট থাকার কথা, সেই সময়েই বহু মুসলিম ক্রেতা প্রকাশ্যে গরু কেনা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ প্রকাশ্যে বলছেন, গরু নিয়ে যদি এত রাজনীতি হয়, তাহলে আমরা গরু কিনব না। কেউ আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও করে আবেদন করছেন, এবার কুরবানীতে গরু নয়, অন্য পশু কুরবানী দিন। এই ঘটনাকে শুধুমাত্র ধর্মীয় সিদ্ধান্ত বলে দেখলে ভুল হবে।
এর মধ্যে রয়েছে প্রবল রাজনৈতিক বার্তা। এতদিন যে সম্প্রদায়কে গো-মাংস ইস্যুতে প্রতিনিয়ত কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে, তারাই এবার ‘গো-বর্জন’এর পথ বেছে নিয়ে রাজনৈতিক দাবার ছকটাই ওলটপালট করে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে বাংলার গোপালক ও ডেইরি ব্যবসায়ীদের মধ্যে। পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে গরু পালন। হাজার হাজার পরিবার ব্যাংক ঋণ নিয়ে গরু কিনেছেন, খামার গড়েছেন, বছরের পর বছর ধরে পশু লালন-পালন করেছেন। তাদের বড় ভরসা থাকে কুরবানীর মরশুম। এই সময় গরুর দাম বাড়ে, বিক্রি হয় ভালো, ঋণের কিস্তি মেটানো যায়, সংসারও কিছুটা স্বস্তি পায়।
কিন্তু এবার সেই বাজারেই ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হাটে গরু আছে, কিন্তু ক্রেতা নেই। কোটি কোটি টাকার গবাদি পশু দাঁড়িয়ে আছে বিক্রির অপেক্ষায়। আর সেই কারণেই ক্ষোভ জমছে গোপালকদের মধ্যে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই ক্ষোভ এখন আর মুসলিমদের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকছে না। উল্টে বহু গোপালক সরাসরি সরকারের দিকেই আঙুল তুলছেন।
তাদের বক্তব্য পরিষ্কার যদি গরু নিয়ে এত কড়াকড়ি হয়, যদি কুরবানী নিয়ে এত চাপ তৈরি করা হয়, তাহলে আমাদের ব্যবসা চলবে কীভাবে? গ্রামের পর গ্রাম জুড়ে এখন অনেক গোপালকই বলছেন, ধর্মীয় আবেগের রাজনীতি করে বাস্তব অর্থনীতিকে ধ্বংস করা হচ্ছে। কেউ কেউ কটাক্ষ করে বলছেন, সরকার যদি এতই গো-প্রেমী হয়, তাহলে সরকারই সব গরু কিনে রাখুক।
এই পরিস্থিতি রাজনীতির জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর। কারণ এতদিন গরুকে কেন্দ্র করে যে মেরুকরণ রাজনীতি তৈরি করা হয়েছিল, সেখানে ‘হিন্দু বনাম মুসলিম’বিভাজনটাই ছিল মূল চালিকা শক্তি। কিন্তু এখন সমীকরণ বদলে যাচ্ছে। মুসলিমরা গরু কেনা থেকে সরে দাঁড়ালে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়ছেন বহু হিন্দু গোপালক ও ব্যবসায়ী। অর্থাৎ, যে ইস্যু দিয়ে হিন্দু ভোটকে একত্র করার চেষ্টা হয়েছিল, সেই ইস্যুই এখন হিন্দুদের একাংশের অর্থনৈতিক ক্ষোভ তৈরি করছে। আর এখানেই রাজনৈতিক বিপদ সবচেয়ে বেশি।
কারণ ধর্মীয় আবেগ দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে, কিন্তু পেটের প্রশ্ন আরও বড়। একজন গোপালকের কাছে তার ব্যাংক ঋণ, সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা এসবই বাস্তব। সেখানে রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে চিরকাল পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায় না।
এদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন এক প্রবণতাও চোখে পড়ছে। বহু মুসলিম যুবক এখন উল্টে গরুকে “জাতীয় পশু”ঘোষণার দাবিও তুলছেন। কেউ কেউ স্থানীয়ভাবে “গো-রক্ষা বাহিনী”তৈরির কথাও বলছেন, যাতে গরুকে কেন্দ্র করে কোনো সংঘাত বা অশান্তি না হয়। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অত্যন্ত কৌশলী অবস্থান। কারণ এতদিন যে অভিযোগ ছিল মুসলিমরা গরুর শত্রু, এখন সেই ধারণাকেই উল্টে দেওয়া হচ্ছে।
ফলে শাসক দলের অবস্থাও ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। একদিকে গো-রাজনীতির আবেগকে পুরোপুরি অস্বীকার করা সম্ভব নয়, অন্যদিকে গোপালকদের আর্থিক ক্ষোভও উপেক্ষা করা কঠিন। এই পরিস্থিতি অনেকটা সেই প্রবাদবাক্যের মতো সাপের ছুঁচো গেলা, না গিলতে পারছে, না উগরাতে পারছে।
রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলায় এবার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা শুধু ধর্মীয় বা সামাজিক নয়, এটি এক গভীর অর্থনৈতিক সংকেতও। কারণ গরুকে কেন্দ্র করে যে বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, সেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা দুই পক্ষের সম্পর্ক ভেঙে গেলে তার প্রভাব বহু দূর পর্যন্ত যাবে। এখন প্রশ্ন একটাই এই সংকটের রাজনৈতিক সমাধান কী?
শাসক দল কি আবার আগের মতো আবেগের রাজনীতিতেই ভরসা রাখবে? নাকি বাস্তব অর্থনীতির চাপে নরম অবস্থান নিতে বাধ্য হবে? কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ধর্মীয় মেরুকরণ দিয়ে ভোট পাওয়া গেলেও অর্থনৈতিক ক্ষোভকে দীর্ঘদিন চেপে রাখা যায় না। আর বাংলার বর্তমান “গো-বুমেরাং”পরিস্থিতি হয়তো সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।





