অনিয়ন্ত্রিত ইলেক্ট্রিক অটো, ই-রিকশা, বেআইনি পার্কিং ও ভাঙা রাস্তায় নাজেহাল শহরবাসী
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৮ মেঃ বরাক উপত্যকার প্রাণকেন্দ্র, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান শহর শিলচর আজ এক ভয়াবহ নগর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। একসময় যে শহরকে বরাকের প্রবেশদ্বার বলা হতো, সেই শহর এখন পরিণত হয়েছে যানজট, ধুলাবালি, খানাখন্দ আর অব্যবস্থাপনার এক জীবন্ত দুঃস্বপ্নে। প্রতিদিন সকালে ঘর থেকে বের হওয়া মানেই এখন নাগরিকদের জন্য এক অনিশ্চিত যুদ্ধ, কখন কোথায় রাস্তার গর্তে গাড়ি বিকল হবে, কখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে থাকতে হবে, কিংবা কখন দুর্ঘটনার শিকার হতে হবে, কেউ জানেন না।
শহরের প্রধান সড়কগুলো বর্তমানে এতটাই বেহাল যে, সাধারণ মানুষ ক্ষোভে বলছেন, এ যেন রাস্তা নয়, মৃত্যুফাঁদ। সেন্ট্রাল রোড, প্রেমতলা, তারাপুর, রাঙ্গিরখাড়ি, নাজিরপট্টি, লিঙ্ক রোড, মেহেরপুর, জানিগঞ্জ, অম্বিকাপট্টি, হাসপাতাল রোড, সোনাই রোড, রাঙ্গিরখাড়ি, শিলচর মেডিক্যাল কলেজ রোড, সদরঘাট সহ শহরের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একই চিত্র। কোথাও পিচ উঠে গিয়ে পাথর বেরিয়ে পড়েছে, কোথাও বড় বড় গর্তে বৃষ্টির জল জমে তৈরি হয়েছে ছোট ছোট পুকুর। দিনের বেলায় ধুলোবালির দাপট, আর বর্ষায় কাদাজল এই দুইয়ের মাঝখানে নাকাল হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
বিশেষ করে দুই চাকার যানবাহন চালক এবং ই-রিকশা, ইলেক্ট্রিক অটোর যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। সামান্য অসাবধান হলেই গর্তে চাকা পড়ে দুর্ঘটনা ঘটছে। শহরের বহু বাসিন্দার অভিযোগ, গত কয়েক মাসে ছোট-বড় দুর্ঘটনার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অথচ প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থায়ী সমাধানের বদলে চলছে শুধুই দায়সারা মেরামতির কাজ। কোথাও ইটের টুকরো ফেলে, কোথাও রাবিশ ঢেলে সাময়িকভাবে গর্ত ভরাট করা হচ্ছে, যা প্রথম বৃষ্টিতেই আবার ধুয়ে যাচ্ছে।

শিলচরের ট্রাফিক পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেও সময় লাগছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অফিস টাইমে রাঙ্গিরখাড়ি পয়েন্ট, প্রেমতলা, দেবদূত পয়েন্ট, তারাপুর রেলগেট, নাজিরপট্টি, হাসপাতাল রোড, সোনাই রোড, শিলচর মেডিক্যাল কলেজ রোড, সদরঘাট এবং মেহেরপুর এলাকায় যানজট ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। সকাল ৮টা ৩০ মিনিট থেকে ২টা পর্যন্ত এবং বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শহরের বহু এলাকা কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
রাস্তার দুই পাশে যত্রতত্র বেআইনি পার্কিং, ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকান, নিয়ন্ত্রণহীন ই-রিকশা এবং ইলেক্ট্রিক অটো ট্রাফিক নিয়ম অমান্য করার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। বিশেষ করে ই-রিকশা, ইলেক্ট্রিক অটোর সংখ্যা শহরে এতটাই বেড়েছে যে, অনেক সময় মনে হয় রাস্তার চেয়ে গাড়ির সংখ্যাই বেশি। নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড বা রুটের তোয়াক্কা না করে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করানোর ফলে পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে।
শহরের ব্যবসায়ী মহলের একাংশের অভিযোগ, বড় বড় দোকানপাট নিজেদের পার্কিং ব্যবস্থা না রেখেই ব্যবসা চালাচ্ছে। ফলে ক্রেতারা বাধ্য হয়ে রাস্তার ওপর গাড়ি দাঁড় করাচ্ছেন। এতে রাস্তার অর্ধেক জায়গা দখল হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, ফুটপাত দখল হয়ে থাকায় পথচারীদের রাস্তা দিয়েই হাঁটতে হচ্ছে, যা যানজটকে আরও তীব্র করে তুলছে।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে জরুরি পরিষেবার ক্ষেত্রে। শিলচর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে যাওয়ার পথে হাইলাকান্দি রোড, রাঙ্গিরখাড়ি বা মেহেরপুর এলাকায় বহু সময় অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘক্ষণ আটকে পড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, এমন বহু ঘটনা ঘটেছে যেখানে মুমূর্ষু রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি শুধুমাত্র ট্রাফিক জ্যামের কারণে। একজন ক্ষুব্ধ নাগরিক বলেন, শহরের রাস্তার অবস্থা এখন এমন হয়েছে যে, কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে পৌঁছানোই একটা বড় যুদ্ধ।

অ্যাম্বুলেন্স সাইরেন বাজিয়েও রাস্তা পায় না। এটা কি কোনো সভ্য শহরের চিত্র হতে পারে? স্কুলপড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের অবস্থাও করুণ। অনেক সময় সময়মতো স্কুলে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। কর্মজীবী মানুষদের অফিস টাইম নষ্ট হচ্ছে, ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন, রোগীরা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, সব মিলিয়ে নাগরিক জীবন কার্যত বিপর্যস্ত।
শহরবাসীর অভিযোগ, প্রশাসন, পূর্ত বিভাগ এবং পুরনিগম বছরের পর বছর ধরে শুধুই আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের আগে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। কোটি কোটি টাকা বরাদ্দের কথা শোনা গেলেও শহরের রাস্তার চেহারা দেখে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, সেই টাকা কোথায় গেল? নাগরিকদের একাংশের দাবি, রাস্তা নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং ঠিকাদারি ব্যবস্থার দুর্নীতির কারণেই কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে।
ড্রেনেজ ব্যবস্থার চরম দুর্বলতার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই জল জমে রাস্তার পিচ উঠে যাচ্ছে। উপরন্তু, বিভিন্ন বিভাগের খোঁড়াখুঁড়ির পর রাস্তা আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয় না। শিলচরের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরে এখনও আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি। বহু গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ না থাকায় যানজট নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, দিনের বেলাতেও ভারী ট্রাক ও লরি শহরে ঢুকে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।
শহরের সচেতন নাগরিক ক্ষোভ ব্যক্ত করে বলেন, শহরের বর্তমান সড়ক পরিকাঠামো বহু আগেই অপ্রতুল হয়ে পড়েছে। কিন্তু নতুন বাইপাস, বিকল্প সড়ক বা মাল্টিলেভেল পার্কিংয়ের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এখনও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। ফলে প্রতিদিনের চাপ বহন করতে গিয়ে শহরের রাস্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থা কার্যত ধসে পড়ছে। শিলচরকে আধুনিক ও উন্নত শহর হিসেবে গড়ে তোলার নানা দাবি মাঝেমধ্যেই শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে শহরের বর্তমান অবস্থা দেখে সাধারণ মানুষের কটাক্ষ করে বলেন, স্মার্ট সিটির স্বপ্ন দেখানোর আগে অন্তত চলাচলের মতো রাস্তা দিন।
প্রশাসনের উদাসীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে আজ শিলচরবাসী এক প্রকার নরক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। শহরের মানুষ এখন আর আশ্বাস শুনতে চান না, তারা চান কার্যকর পদক্ষেপ। অবিলম্বে ভাঙাচোরা রাস্তা সংস্কার, ইলেক্ট্রিক অটো, দ্বীযান বাহন, ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি, বেআইনি পার্কিং উচ্ছেদ, ফুটপাত দখলমুক্তকরণ এবং আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু না হলে অদূর ভবিষ্যতে শিলচর শহর সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়বে বলেই আশঙ্কা করছেন নাগরিকরা। এখন প্রশ্ন একটাই, প্রশাসন কি এবারও নির্লিপ্ত দর্শকের ভূমিকায় থাকবে, নাকি সত্যিই শিলচরবাসীকে এই দুর্বিষহ নাগরিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে কঠোর ও কার্যকর উদ্যোগ নেবে? সময়ই তার উত্তর দেবে।





