বিশ্ববিদ্যালয় জন্ম নেওয়ার আগেই মিলল ডিগ্রি! শিলচর পুরনিগমে চাঞ্চল্যকর ভুয়ো শংসাপত্র কাণ্ড
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৪ নভেম্বরঃ শিলচর পুর নিগমের নবগঠিত বোর্ডে বসার আগেই চরম শংসাপত্র কেলেঙ্কারী ও ভুয়ো ডিগ্রির কালিমায় ঢেকে গেল পুর-রাজনীতি। পুর নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী একাধিক কাউন্সিলরের শিক্ষাগত যোগ্যতার আসল সত্যতা ও ডিগ্রির বৈধতা নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন শহরের সচেতন নাগরিক সমাজ, বিশিষ্ট আইনজীবী ও শিক্ষাবিদরা।
আগামী ৫ নভেম্বর নির্ধারিত শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের শুভ মুহূর্ত ঘনিয়ে এলেও, এই কলঙ্কিত শংসাপত্রধারী প্রার্থীদের শপথ রুখতে মঙ্গলবার বরাক উপত্যকার প্রাণকেন্দ্র শিলচরে এক অভূতপূর্ব গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। বিতর্কিত ও অভিযুক্ত কাউন্সিলরদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের শপথগ্রহণ প্রক্রিয়া অবিলম্বে স্থগিত রাখার দাবিতে জেলাশাসকের দরজায় বিক্ষোভ প্রদর্শন ও অবস্থান ধর্ণা দেন ক্ষুব্ধ নাগরিকরা।
মঙ্গলবার সকাল ১১টা নাগাদ শিলচরের ডিএসএ ময়দান থেকে এক সুবিশাল ও সুসংগঠিত প্রতিবাদী র্যালি বের হয়। ভুয়ো ডিগ্রিধারী জনপ্রতিনিধি দূর হটো, শিক্ষাব্যবস্থার আমানত ধ্বংস করা চলবে না, এমন নানা স্লোগানে মুখরিত হয়ে র্যালিটি শহরের একাধিক প্রধান প্রধান সড়ক পরিক্রমা করে। ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র-যুব ও সর্বস্তরের সচেতন মানুষের এই পদযাত্রা শেষে কাছাড়ের জেলাশাসকের কার্যালয়ের সামনে এসে জড়ো হয় এবং সেখানেই প্রাঙ্গণে আন্দোলনকারীরা এক দীর্ঘ ধর্ণায় বসেন। পরবর্তীতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ডঃ হিমন্ত বিশ্ব শর্মার উদ্দেশ্যে জেলাশাসকের মাধ্যমে একটি চরমপত্র তথা বিস্তারিত স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৮ সালেই স্নাতক! শিলচরে গর্জে উঠল সুশীল সমাজ ও আইনজীবীরা
আন্দোলনকারীদের তোলা বিস্ফোরক অভিযোগ অনুযায়ী, নিগমের অন্তত ১২ থেকে ১৩ জন নবনির্বাচিত কাউন্সিলরের দাখিল করা শিক্ষাগত যোগ্যতার শংসাপত্রে মারাত্মক সব গরমিল ও গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র পর্যালোচনার পর এই তথ্য সামনে এসেছে বলে দাবি করা হয়। অভিযোগের এক চাঞ্চল্যকর ও হাস্যকর নজির তুলে ধরে প্রতিবাদী নাগরিকরা জানান, সরকারি নথি অনুযায়ী ‘সিকিম ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০২২ সালে।
অথচ পুর নিগমের বিভিন্ন ওয়ার্ডের বিজয়ী প্রার্থী মনোনয়নপত্রের সাথে দেওয়া হলফনামায় বুক ফুলিয়ে দাবি করেছেন, তিনি নাকি ওই সিকিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ২০১৮ সালে স্নাতক পাশ করেছেন! অর্থাৎ যে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মই হয়নি, সেখান থেকে চার বছর আগেই ডিগ্রি লাভ করেছেন পুর প্রতিনিধি! এহেন অবিশ্বাস্য ও অসংলগ্ন তথ্য প্রশাসনের নজর এড়ালো কীভাবে, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সকলে। আন্দোলনকারীদের স্পষ্ট অভিযোগ, মনোনয়ন দাখিলের সময় থেকেই রিটার্নিং অফিসার ও প্রশাসনের কাছে বারংবার কড়া লিখিত আপত্তি জানানো হলেও, অদৃশ্য কোনো প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক চাপে সেইসব অভিযোগের কোনো তদন্তই করা হয়নি।
ধর্ণাস্থলে উপস্থিত বিশিষ্ট নাগরিক প্রসেনজিৎ দেব, নামজাদা আইনজীবী সৌমিত্র চৌধুরী এবং প্রবীণ শিক্ষাবিদ বুদ্ধদেব চৌধুরী এক যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে গর্জে ওঠেন। তাঁরা অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান, একাধিক বিজয়ী প্রার্থীর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই জাল শংসাপত্র ও প্রতারণার অভিযোগে আদালতে ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এই অবস্থায় তাঁদের পুর প্রতিনিধি হিসেবে শপথ নিতে দেওয়া মানে ‘আসাম মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন অ্যাক্ট, ২০২২’ এর নিয়ম ও আইনি বাধ্যবাধকতাকে সরাসরি বুড়ো আঙুল দেখানো।
ডিএসএ ময়দান থেকে ডিসি অফিস পর্যন্ত ধর্ণা-মিছিল, ৫ নভেম্বরের অনুষ্ঠান স্থগিতের দাবিতে মুখ্যমন্ত্রীকে স্মারকলিপি সুশীল সমাজের
আইনজীবী সৌমিত্র চৌধুরী বলেন, যে জনপ্রতিনিধিরা সাধারণ মানুষের ভোটে জিতে শহরের অভিভাবক হতে যাচ্ছেন, তাঁদের নিজেদের যোগ্যতার ভিত্তিটাই যদি জালিয়াতি ও প্রতারণার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তাঁরা কীভাবে একটি শহরের আইনকানুন বা প্রশাসন পরিচালনা করবেন? আদালতের বিচার শেষ না হওয়া এবং নথির সত্যতা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসন কিছুতেই এই অযোগ্য প্রার্থীদের শপথ পাঠ করাতে পারে না।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, এই লড়াই বা আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, আদর্শ কিংবা ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়। এটি শিলচরের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আপামর জনগণের আস্থা রক্ষা করার এবং ভুয়া ডিগ্রির সাহায্যে জনপ্রতিনিধি হওয়ার ঘৃণ্য প্রবণতা রোধ করার এক পবিত্র আইনি লড়াই। শিক্ষাবিদদের মতে, ভূয়ো শংসাপত্র দিয়ে পুর বোর্ডে প্রবেশ করা কেবল অনৈতিকই নয়, বরং এটি যোগ্য ও শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের মুখে এক সোজাসাপ্টা তামাচা।
যদি আগামী ৫ নভেম্বরের আগে এই অভিযুক্ত কাউন্সিলরদের বিরুদ্ধে কড়া তদন্ত শুরু না হয় এবং তাঁদের শপথগ্রহণ প্রক্রিয়া আটকে না দেওয়া হয়, তবে শপথগ্রহণের দিনই শিলচর শহরজুড়ে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এক নজিরবিহীন ও সম্মিলিত প্রতিবাদ কর্মসূচির রূপ দেওয়া হবে। প্রয়োজনে আদালত ও বৃহত্তর গণ-আন্দোলনের পথ বেছে নেওয়া হবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। শিলচরের সাধারণ মানুষের এখন একটাই প্রশ্ন, কাছাড় জেলা প্রশাসন ও রাজ্য সরকার কি ভুয়ো শংসাপত্রধারীদের আড়াল করবে, নাকি আইনের সঠিক প্রয়োগ ঘটিয়ে শিলচর পুর নিগমকে এক স্বচ্ছ ও কলঙ্কমুক্ত




