জীবন বাঁচানোর ব্রত আজ কর্পোরেটের খাঁচায় বন্দি! হাসপাতালের মুনাফার চাকায় পিষে মরছে মেধাবী তরুণ চিকিৎসকদের ভবিষ্যৎ!

কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর মুনাফালোভী আগ্রাসন এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল বাণিজ্যিকীকরণের জেরে আজ চিকিৎসকরা আর জীবনরক্ষাকারী নিবেদিতপ্রাণ প্রাণ বাঁচানোর কারিগর নন, তাঁরা আজ পরিণত হয়েছেন নামমাত্র বেতনে খাটানো কর্পোরেট কেরানিতে যাঁদের কাজ মোটে দুটি: ইনস্যুরেন্সের জটিল কাগজপত্র পূরণ করা আর রোগীর লম্বা কেস শিট লিখে যাওয়া। মাসে মোটে ৩৫ হাজার টাকার বিনিময়ে মেধাবী তরুণ চিকিৎসকদের যৌবনকে বিনামূল্যে বা জলের দরে শোষণের এই অমানবিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আজ গর্জে উঠেছে দেশের ছাত্রসমাজ, অভিভাবক মহল ও সচেতন নাগরিকরা।

একসময় যে ডিগ্রির পেছনে পড়ার জন্য দিনরাত এক করে তিল তিল করে মেধা নিংড়ে দিত পড়ুয়ারা, আজ সেই এমবিবিএস ডিগ্রিধারীদের করুণ পরিণতি দেখে শিউরে উঠতে হয়। দিনের পর দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম, রাত জাগা ডিউটি এবং বিপুল আর্থিক বিনিয়োগের পর যখন একজন তরুণ চিকিৎসক পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন, তখন কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁদের।

ভুক্তভোগী তরুণ ডাক্তারা ক্ষোভ ব্যক্ত করে বলেন, আজকের দিনে কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর কাছে চিকিৎসকের মেধা বা দক্ষতার কোনো মূল্য নেই। তাদের চাই এমন সস্তা শ্রমশক্তি, যারা দিনে বারো-চৌদ্দ ঘণ্টা খাটবে কিন্তু টু শব্দ করবে না। ইনস্যুরেন্স কোম্পানির শর্ত পূরণ আর অফুরন্ত ফাইল ওয়ার্ক বা কেস শিট লেখার জন্যই কি আমরা সাড়ে পাঁচ বছর ধরে ডাক্তারি পড়েছিলাম? বড় বড় প্রাইভেট হাসপাতালের লোভনীয় বিজ্ঞাপনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্ধ শোষণের শিকার হয়ে আজ তরুণ চিকিৎসকদের চোখে জল, আর মনে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ।

অসমের বরাক উপত্যকা থেকে শুরু করে দেশের মেট্রো সিটিগুলির চিকিৎসা মহলে এখন একটাই আলোচনা কীভাবে সুসংগঠিতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে ডাক্তারদের মর্যাদা। এমবিবিএস পাশ করার পর রেসিডেন্ট ডক্টর বা জুনিয়র ডাক্তারদের মাসিক বেতন আজ এমন জায়গায় নামিয়ে আনা হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ অফিসের জুনিয়র ক্লার্কের বেতনের চেয়েও লজ্জাজনকভাবে কম।

মাসে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা বেতনের বিনিময়ে ২৪ ঘণ্টার রোটেশন ডিউটি, রোগীদের পরিবারের ক্ষোভের মুখে পড়া, আর অন্যদিকে হাসপাতালের ম্যানেজমেন্টের পেপারওয়ার্কের টার্গেট পূরণ, সবমিলিয়ে চিকিৎসকদের যৌবন ও মানসিক স্বাস্থ্যকে আজ নিয়মতান্ত্রিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসাবিদ্যা আজ আর মানবসেবা বা সম্মানের জায়গা নয়, এটি এখন কর্পোরেট পুঁজির মুনাফা তোলার এক মুনাফামুখী কারখানা।

প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী নিট পরীক্ষার জাঁতাকলে পিষে গিয়ে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। অভিভাবকরা নিজেদের জীবনের সমস্ত সঞ্চয়, প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা কিংবা চড়া সুদে লোন নিয়ে সন্তানকে কোচিং সেন্টারে পাঠান। এই আশা নিয়ে যে, একবার এমবিবিএস ডিগ্রিটা হাতে চলে এলে পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হয়ে যাবে।

কিন্তু আজকের এই নির্মম বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সেই অভিভাবকরা আজ সর্বস্বান্ত। ঋণগ্রস্ত পরিবার আর কর্মহীন বা কম বেতনে শোষিত ডক্টরেট সন্তাদের দিকে তাকিয়ে আজ হাহাকার করা ছাড়া তাঁদের আর কোনো উপায় নেই। অভিভাবক মহলের সোজা প্রশ্ন, এই নরককুণ্ডে ঠেলে দেওয়ার জন্যই কি আমাদের সন্তানদের রাতের পর রাত জাগিয়ে পড়াশোনা করিয়েছিলাম? সরকার এবং নীতি নির্ধারকরা যদি এই রূঢ় সত্যের মুখোমুখি না হন, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই দেশ মেধাবী চিকিৎসকদের তীব্র সংকটে পড়তে বাধ্য।

বিশেষজ্ঞ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, তরুণ চিকিৎসকদের এই লাগাতার শোষণ কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনকেই ধ্বংস করছে না, বরং তা পরোক্ষভাবে দেশের গোটা স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে এক মারাত্মক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যখন একজন চিকিৎসকের মানসিক ও শারীরিক শক্তি কেবল কাগজের ফাইল গোছাতে আর ইনস্যুরেন্সের অনুমোদন করাতে শেষ হয়ে যায়, তখন সাধারণ রোগীদের সঠিক চিকিৎসা হওয়া তো অসম্ভব বটেই, বরং তা রোগীর জীবনের পক্ষেও চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সময় এসেছে চোখ খোলার। ১৮ বছর বয়সি কোমলমতি ছেলেমেয়েদের আর অলীক স্বপ্ন দেখিয়ে বিভ্রান্ত করবেন না। কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর এই আধুনিক দাসপ্রথা ও শোষণের বিরুদ্ধে আজ সময় এসেছে সোচ্চার হওয়ার। মেধাকে সম্মান জানাতে এবং চিকিৎসা পেশার পবিত্রতা রক্ষা করতে যদি এখনই রুখে দাঁড়ানো না যায়, তবে আগামী দিনে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ এক কর্পোরেট মাফিয়াদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়বে, এটাই আজ ভুক্তভোগী সমাজ ও সচেতন মহলের একযোগে তোলা সবচেয়ে জোরালো ও গুরুতর অভিযোগ।

Related Posts

কালাইন কো-অপারেটিভে প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনা (পিএমজিকেএওয়াই) চাল পরিবহণে কোটি টাকার ঘাপলা!

বিল হচ্ছে রামনগরের নামে, চাল আসছে বদরপুর এফসিআই থেকে! গাড়িপ্রতি ২,৩০০ টাকার ভুয়া বিল বানিয়ে পকেটস্থ! বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৮ অক্টোবরঃ সরকারি সমবায় ব্যবস্থায় কি শেষপর্যন্ত দুর্নীতির ঘুণ ধরেছে? কালাইন…

মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কাছাড়ের লক্ষ্মীপুরের বুকে দিব্যি চলছে অবৈধ লটারির রমরমা জুয়ার আসর

আদালতের নিষেধাজ্ঞা শিকেয় তুলে রমরমা! লক্ষ্মীপুরে লটারির নামে কোটি টাকা হাতিয়ে চম্পট প্রতারক চক্র বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক 28 অক্টোবরঃ মহামান্য আদালত এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার স্পষ্ট ফরমান রাজ্যে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *