উৎসবের রাতে দিল্লির সিআর পার্কে লাঠি হাতে সিআরপিএফ! টার্গেট কি বাঙালিরা?

আম আদমি পার্টির অভিযোগ, দিল্লিতে বাঙালি সম্প্রদায়ের পুজো উদযাপনে বাধা দিচ্ছে পুলিশ। যদিও সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে দিল্লি পুলিশ। তাদের দাবি, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী শব্দদূষণ সংক্রান্ত নিয়ম কার্যকর করতেই পদক্ষেপ। লেখক-সাংবাদিক পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা তাঁর এক্স হ্যান্ডলে একটি ভিডিয়ো পোস্ট করার পরেই বিষয়টি সামনে আসে। সেখানে দক্ষিণ দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কের বি-ব্লক দুর্গাপুজো মণ্ডপের বাইরে প্রচুর পুলিশ ও সিআরপিএফ জওয়ানকে দেখা যায়।

উৎসবের আলোয় ঝলমলে আনন্দময় রাত নিমেষেই রূপ নিল এক ভীতিপ্রদ ও রণক্ষেত্রের দৃশ্যে! দিল্লির ‘মিনি কলকাতা’ খ্যাত চিত্তরঞ্জন পার্ক বা সিআর পার্কের দুর্গাপুজোয় দিল্লি পুলিশ ও সশস্ত্র আধা-সামরিক বাহিনীর অতর্কিত হানা এবং সাধারণ দর্শনার্থীদের ওপর হেনস্থার অভিযোগে এই মুহূর্তে উত্তাল দেশের রাজধানী। মধ্যরাতে লাঠি হাতে জওয়ানদের মণ্ডপে ঢুকে পড়ার দৃশ্য এবং জোর করে উৎসবের আনন্দ থামিয়ে দেওয়ার এই নজিরবিহীন ঘটনা কেবল দিল্লির বাঙালি সমাজকেই নয়, সারা দেশের সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষকে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করেছে। উৎসবের মরশুমে রাজধানীর বুকে বাঙালির সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবে এমন প্রশাসনিক আগ্রাসনকে কেন্দ্র করে এখন তুঙ্গে উঠেছে রাজনৈতিক তরজা।

ঘটনার সূত্রপাত শনিবার গভীর রাতে। সিআর পার্কের বি ব্লকের পুজো মণ্ডপ তখন জমজমাট। শারদোৎসবের আনন্দে মেতে থাকা শিশু, মহিলা ও প্রবীণরা পরিবারের সঙ্গে মণ্ডপে প্রতিমা দর্শন করছিলেন। অভিযোগ, ঠিক সেই সময়ই রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ প্রায় কুড়ি জন সশস্ত্র সিআরপিএফ জওয়ান ও দিল্লি পুলিশের একটি বিশাল দল আচমকাই লাঠি হাতে সারিবদ্ধভাবে মণ্ডপ চত্বরে ঢুকে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, পুজোর আনন্দঘন পরিবেশকে নিমেষেই এক ত্রাসের রাজত্বে পরিণত করা হয়। মাইকের শব্দ বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি মণ্ডপের লাইট ও সাউন্ডের বৈদ্যুতিক সংযোগ কেটে দেওয়া হয়। উৎসবের আমেজে মণ্ডপে উপস্থিত সাধারণ মানুষকে জোর করে বাইরে বের করে দেওয়ার চেষ্টা চালায় বাহিনী। রাত এগারোটার কড়া সময়সীমার যুক্তি দেখিয়ে গোটা সিআর পার্ক চত্বরে সাইরেন বাজিয়ে পুলিশি টহল চালানো হয়। বাঙালির প্রাণের উৎসবের ভরা রাতে এমন দৃশ্য দিল্লির বুকে অত্যন্ত অভাবনীয় ও ভীতিকর বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

এই নজিরবিহীন ঘটনার প্রতিবাদ প্রথম জোরালোভাবে প্রকাশ্যে আনেন বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক পরঞ্জয় গুহ ঠাকুরতা। সিআর পার্কের বি ব্লকের মণ্ডপের বাইরের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে তিনি স্থানীয় অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ধরের উদ্ধৃতি দিয়ে এই প্রশাসনিক বর্বরতার তীব্র নিন্দা জানান।

পুজো কমিটির সদস্যরা মণ্ডপে এই অপ্রত্যাশিত ও বেআইনি অনুপ্রবেশের জোরালো প্রতিবাদ জানালেও পুলিশি জবরদস্তির মুখে তাঁদের অসহায় হয়ে পড়তে হয়। উৎসবপ্রেমী নাগরিকদের প্রশ্ন, যে শহরে রাতভর নাইটলাইফ এবং চব্বিশ ঘণ্টা দোকান খোলা রাখার কথা বলা হয়, যেখানে রামলীলার উৎসব মধ্যরাত পেরিয়েও অবাধে চলতে পারে, সেখানে বাঙালি সম্প্রদায়ের সর্বজনীন দুর্গোৎসবে ঘড়ি ধরে এই ডেমোক্লিসের তরবারি ঝুলিয়ে দেওয়া হলো কেন? পুলিশের এই আগ্রাসী ভূমিকার জেরে মণ্ডপে যেকোনো মুহূর্তে পদপিষ্ট হওয়ার মতো ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারত বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিকরা।

সিআর পার্কের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিল্লির রাজনৈতিক পারদ চড়েছে চরমে। আপের দিল্লি সভাপতি তথা ওই এলাকার প্রাক্তন বিধায়ক সৌরভ ভরদ্বাজ সরাসরি উপ-রাজ্যপালকে ট্যাগ করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি অভিযোগ তুলেছেন, দিল্লির অন্যতম ভদ্র, শিক্ষিত ও শান্তপ্রিয় বাঙালি সমাজকে পরিকল্পিতভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে। সৌরভ ভরদ্বাজের প্রশ্ন, রাজধানীর অন্যান্য উৎসবে যেখানে নিয়মের শিথিলতা দেখা যায়, সেখানে বাঙালির পুজো এগারোটাতেই বন্ধ করার এই বিমাতৃসুলভ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আচরণ কার ইশারায় হচ্ছে?

অন্যদিকে, সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে দায় সেরেছে দিল্লি পুলিশ। ডিসিপি (সাউথ দিল্লি) এক বিবৃতি জারি করে দাবি করেছেন যে, পুজো পণ্ড করার কোনো অভিপ্রায় তাঁদের ছিল না; বরং আদালতের শব্দদূষণ সংক্রান্ত কঠোর নির্দেশিকা কার্যকর করতেই তারা সেখানে গিয়েছিলে। পুলিশের দাবি, বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও উদ্যোক্তারা নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে উচ্চস্বরে সাউন্ড সিস্টেম বাজাচ্ছিলেন। আইনশৃঙ্খলার স্বার্থেই তাদের এই পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।

পুলিশের সাফাই যতই দেওয়া হোক না কেন, উৎসবের রাতে দিল্লির বুকে বাঙালির প্রাণের উৎসবে সিআরপিএফের লাঠি উঁচিয়ে ঢোকার ছবি যে গভীর এক মানসিক ক্ষত তৈরি করে দিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। রাজধানী দিল্লির বুকে সাংস্কৃতিক বৈষম্য ও প্রশাসনিক ঔদ্ধত্যের এই নজির আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতিতে এক বিরাট বিতর্কের জন্ম দিতে চলেছে। শারদোৎসবের আনন্দে যখন ভাসছে দেশ, ঠিক সেই সময়েই সিআর পার্কের এই ঘটনা বুঝিয়ে দিল, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের স্বাধীনতা আজও কতটা সংঘাতের মুখে দাঁড়িয়ে!

Related Posts

যন্তর মন্তর বিক্ষোভ-কাণ্ডে তিহাড়ের কারাগার থেকে মুক্ত ককরোচ জনতা পার্টির দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ২১ অক্টোবরঃ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের নিষেধাজ্ঞা ও কড়া পুলিশি নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে দিল্লির যন্তর মন্তরে নজিরবিহীন প্রতিবাদ প্রদর্শনের জেরে দিল্লির তিহাড় জেলে দীর্ঘ বন্দিদশার অবসান ঘটল। ভোট…

শিলচর শহরের অম্বিকাপট্টিতে মহানবমীর রাতে সাংবাদিক রাহুল দেবের ওপর প্রাণঘাতী হামলা, দুষ্কৃতিকারীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবিতে সোচ্চার প্রেস ক্লাব ও সচেতন সমাজ

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ২১ অক্টোবরঃ আলো ঝলমলে আলোয় সাজানো শহর, ঢাকের বাদ্য আর আবালবৃদ্ধবণিতার কলকাকলিতে মুখরিত শারদোৎসবের আনন্দোচ্ছল প্রহর। ঠিক সেই আবহেই মহানবমীর উৎসবমুখর রাতে শিলচরের হৃদপিণ্ড বলে পরিচিত…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *