শিলচরে গেরুয়া সুনামি: ৪২ ওয়ার্ডের প্রথম পুরনিগম নির্বাচনে ৩৪ আসন দখল করে ইতিহাস গড়ল এনডিএ

৪২টি ওয়ার্ডের এই মর্যাদাপূর্ণ নির্বাচনে বিরোধীদের কার্যত ধূলিসাৎ করে দিয়ে এককভাবে ৩২টি আসনেই জয়লাভ করেছে বিজেপি। আর জোটসঙ্গী অসম গণ পরিষদ (অগপ)-এর প্রাপ্ত ২টি আসন যোগ করলে এনডিএ জোটের ঝুলিতে চলে গেছে মোট ৩৪টি আসন। বরাক উপত্যকার ইতিহাসে প্রথম পুরবোর্ড গঠনে এই বিশাল সংখ্যাগরীষ্ঠতা কেবল একটি নির্বাচনী জয় নয়, বরং এক রাজনৈতিক ল্যান্ডমার্ক।

অন্যদিকে, এই প্রবল গেরুয়া ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে গেছে বরাক উপত্যকায় কংগ্রেসের ঐতিহ্যবাহী দুর্গ। মাত্র ২টি ওয়ার্ডে জয় নিশ্চিত করে কোনোমতে মান রক্ষা করেছে কাছাড় জেলা কংগ্রেস। বাকি ৬টি ওয়ার্ডে জয়লাভ করেছেন প্রভাবশালী নির্দল প্রার্থীরা, যা স্থানীয় রাজনীতিতে এক নতুন বিকল্প ধারার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে রামনগরস্থিত আইএসটিটি-তে কড়া পুলিশ ও প্রশাসনিক নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ভোট গণনা শুরু হয়। মোট সাতটি সুসজ্জিত কক্ষে বিরতিহীনভাবে চলে ভোট গণনার কাজ। প্রথম রাউন্ডের ফলাফল সামনে আসতেই পরিষ্কার হয়ে যায় কোন দিকে বইছে হাওয়া। সিংহভাগ আসনেই শুরু থেকেই অপ্রতিরোধ্য গতিতে ব্যবধান বাড়াতে শুরু করেন বিজেপি প্রার্থীরা। বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জয়ের ব্যবধান ও উল্লাসের মাত্রা দুটোই তুঙ্গে পৌঁছায়।

উল্লেখ্য, ৪২টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৯ নম্বর ও ২০ নম্বর ওয়ার্ডে নির্বাচন শুরু হওয়ার আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছিলেন বিজেপি প্রার্থীরা (যথাক্রমে বিজেন্দ্র প্রসাদ সিং ও ভক্তিসেন তালুকদার)। ফলে মঙ্গলবার বাকি ৪০টি আসনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা করা হয়। বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই ও অত্যন্ত অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়ের ঘটনা ঘটলেও সামগ্রিক ফলাফলে বিজেপির একচ্ছত্র আধিপত্যই সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

গণনা কেন্দ্র থেকে ফলাফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই উল্লাসে ফেটে পড়েন বিজেপির হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক। শহরের রাস্তাঘাট মুড়ে ফেলা হয় গেরুয়া আবিরে। দলীয় প্রতীক ও পতাকা হাতে নিয়ে সুসজ্জিত শোভাযাত্রায় মেতে ওঠেন প্রার্থীরা ও সাধারণ সমর্থকরা।

তবে এই বিশাল জয়ের আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই শিলচরবাসীর মনে এখন একটাই প্রশ্ন—নবগঠিত পুরনিগমের প্রথম ‘মেয়র’ কে হতে চলেছেন? শহরের অলিতে-গলিতে, চায়ের কাপে এবং রাজনৈতিক মহলে এখন থেকেই মেয়র পদপ্রার্থীদের নাম নিয়ে তীব্র জল্পনা ও উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে। কে বসবেন শিলচরের প্রথম নাগরিকের মর্যাদাপূর্ণ আসনে, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

শিলচর শহরকে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে ‘মিশ্র’ বা পরিবর্তনশীল মানসিকতার বলে মনে করা হতো। কিন্তু প্রথম পুরনিগম নির্বাচনের এই ফল সমস্ত পুরনো সমীকরণকে ওলটপালট করে দিয়েছে। এই একপেশে জনমতের পেছনে বেশ কিছু জোরালো কারণ কাজ করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা:

উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ও ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার: শিলচর পৌরসভাকে পুরনিগমে উন্নীত করার পর নাগরিক পরিকাঠামো—বিশেষ করে ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সুপেয় পানীয় জল সরবরাহ, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং বেহাল রাস্তাঘাটের স্থায়ী সমাধানের যে প্রতিশ্রুতি বিজেপি প্রচারের সময় দিয়েছিল, তা শহরবাসীর মন জয় করতে সম্পূর্ণ সফল হয়েছে। কেন্দ্রের ও রাজ্যের ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের সহায়তায় নগর উন্নয়নের জোয়ার আসার প্রত্যাশাই ভোটারদের রায়কে একমুখী করেছে। সংগঠনের সুদৃঢ় ভিত্তি: স্থানীয় স্তরে বিজেপির সুসংগঠিত প্রচার কৌশল, বুথভিত্তিক নেতৃত্ব এবং জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর মানসিকতা বিরোধীদের বহু পেছনে ফেলে দিয়েছে।

অন্যদিকে, এই নির্বাচনে কাছাড় জেলা কংগ্রেসের মাত্র দুটি ওয়ার্ডে জয় (৩০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ড) দলটির সাংগঠনিক দেউলিয়াত্বকেই নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। একদা বরাক উপত্যকায় কংগ্রেসের যে দুর্গ অপরাজেয় বলে মনে করা হতো, তা আজ সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শিলচরের এই ফল কংগ্রেসের জন্য কেবল একটি পরাজয় নয়, এটি একটি জাতীয় দলের গভীর সাংগঠনিক ক্ষয় ও চরম বিপর্যয়ের প্রতীক। স্থানীয় স্তরে শক্তিশালী ও ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের অভাব, অন্তর্দ্বন্দ্ব, কর্মী মহলে সমন্বয়ের মারাত্মক ঘাটতি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন নাগরিক সমস্যাগুলোকে সময়োপযোগীভাবে তুলে ধরতে না পারার মাসুল গুনতে হয়েছে দলটিকে। অন্যদিকে, ৬টি ওয়ার্ডে নির্দল প্রার্থীদের জয় প্রমাণ করে যে, অনেক এলাকার ভোটাররা প্রথাগত বিরোধীদের ওপর ভরসা না রেখে নিজেদের এলাকাভিত্তিক জনপ্রিয় প্রার্থীদেরই বেছে নিয়েছেন।

শিলচরের এই প্রথম পুরনিগম নির্বাচনের ফলাফল কেবল আগামী পাঁচ বছরের পুরবোর্ড পরিচালনার মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরাক উপত্যকার সার্বিক রাজনৈতিক সমীকরণেও এর সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। বিজেপির এই ঐতিহাসিক জয় যেমন উদযাপনের খোরাক জোগাচ্ছে, তেমনই তাদের কাঁধে চাপিয়ে দিচ্ছে পর্বতপ্রমাণ দায়িত্ব। নতুন পুরনিগমের প্রথম বোর্ড হিসেবে নাগরিক পরিষেবা প্রদান, নিকাশি ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পালনে সামান্যতম গাফিলতি দেখা দিলে এই বিশাল জনসমর্থন ক্ষোভে পরিণত হতে সময় নেবে না।

অন্যদিকে, কংগ্রেসের জন্য এটি শেষ সতর্কবার্তা। দলে যদি অবিলম্বে আমূল পরিবর্তন, নতুন ও তরুণ নেতৃত্বের উন্মেষ এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্য ফেরানো না হয়, তবে বরাক উপত্যকার রাজনীতি থেকে তাদের অস্তিত্ব চিরতরে মুছে যাওয়ার সমূহ ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। শিলচরের মাটি প্রমাণ করল, জনতা এখন উন্নয়নের পক্ষে এবং ফাঁকা প্রতিশ্রুতির দিন ফুরিয়েছে।

Related Posts

অহংকার, টিকিট-বাণিজ্য আর স্বজনপোষণের মাশুল!

নিজ গড়ে সজল আচার্যের বধ, শিলচরে কংগ্রেসের ‘রাজনৈতিক সলিল সমাধি বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১০ অক্টোবরঃ কাছাড় জেলা কংগ্রেস সভাপতি সজল আচার্য এখন মুখ লুকাবেন কোথায়? নাকি আগের মতোই আবার বুক…

ভুয়ো ডিগ্রির মুকুট পরে শিলচর পুরনিগমের মসনদে!

সার্টিফিকেট জালিয়াতির রমরমা বাজারে শিলচরের সচেতন ভোটারদের মুকুটে যুক্ত হলো লজ্জার নতুন পালক ড. নিখিল দাশ বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১০ অক্টোবরঃ ভাষার জন্য রক্তদান ও সংস্কৃতির উর্বর ভূমি, পন্ডিত-মনীষীদের জন্মস্থান…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *