৭.৮ শতাংশ জিডিপি গ্রোথের নেপথ্যে কি তবে শুধুই ফাঁকা আওয়াজ?

এই পরিসংখ্যানকে হাতিয়ার করে একদিকে যখন শাসক শিবির শুরু করেছে প্রবল রাজনৈতিক বাদানুবাদ ও উৎসবের আমেজ, ঠিক উলটো দিকে শেয়ার বাজার কিন্তু লাল নিশান নিয়ে ধুঁকছে এবং দেশের সাধারণ মানুষের পকেট কার্যত ফাঁকা। পরিসংখ্যানের ঝিলমিল মোড়কে ঢাকা এই অর্থনীতির আসল কঙ্কালসার চিত্র, নেপথ্যের অনুপুঙ্খ সত্যি এবং রাজনীতির ময়দানে চলা তীব্র তরজা খতিয়ে দেখলে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ও উদ্বেগজনক চিত্রই সামনে আসে।

বিশ্বজুড়ে চলা যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ভূ-রাজনৈতিক সংকটের বাজারেও ভারতের অর্থনীতি হঠাৎ এতটা চাঙ্গা দেখানোর নেপথ্যে মূলত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ কাজ করেছে। অর্থনীতির বিশ্লেষকদের মতে, এই সাময়িক বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে কয়েকটি কারিগরি ও সাময়িক অনুঘটক, ২০২৪-এর ডিসেম্বর থেকে ২০২৫-এর ডিসেম্বরের মধ্যে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ১২৫ বেসিস পয়েন্ট রেট কমানোর ফলে ঋণ কিছুটা সস্তা হয়। এর জেরে বাজারে সাময়িকভাবে ধড়াধড় কেনাকাটা ও বিনিয়োগের প্রবণতা শুরু হয়েছিল।

করের হার কিছুটা কমায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সামান্য বাড়ে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে মার্কিন ট্যারিফ হটার পর ভারতের রপ্তানি হঠাৎ সাময়িক চাঙ্গা হয়ে ওঠে। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইন ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় কারখানার মালিকরা কাঁচামাল ও উৎপাদন আগেই অতিরিক্ত পরিমাণে জমিয়ে ফেলেছিলেন। এই অতিরিক্ত গুদামজাতকরণ এবং পাইপলাইন স্টক জিডিপি-কে এই নির্দিষ্ট ত্রৈমাসিকে কৃত্রিমভাবে ফুলিয়ে তুলতে সাহায্য করেছে।

ধ্রুপদী অর্থনীতি বা কেতাবি থিয়োরি অনুযায়ী জিডিপি বাড়লে বাজার চনমনে ও তেজি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না, যার পেছনে রয়েছে একাধিক অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত কারণ, জিডিপির ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধির একটি বড় অংশ আসছে সরকারের ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার বা পরিকাঠামোগত খাতে খরচের হাত ধরে। কিন্তু শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত মাঝারি ও ছোট কোম্পানিগুলোর ত্রৈমাসিক মার্জিন বা নিট মুনাফা সেই হারে না বাড়লে বাজার চনমনে হতে পারে না।

অর্থনীতিতে এই ধরনের কৃত্রিম গতি থাকলে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ে। ফলে আরবিআই যদি আবার সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হয়, তবে বাজারে লিকুইডিটি বা নগদ প্রবাহ কমে যাবে, যার direct impact পড়বে শেয়ার বাজারে। পাশাপাশি, মিডল ইস্টের যুদ্ধ ও ক্রুড অয়েলের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কায় বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় বাজার থেকে দেদার টাকা তুলে নিচ্ছেন, যার ফলে সেনসেক্স ও নিফটির কোমর ভেঙে পড়ছে।

কাগজে-কলমে জিডিপির অঙ্ক যতই ৭.৮ শতাংশ হোক না কেন, রিটেল ইনফ্লেশন বা সাধারণ মানুষের পকেটের প্রকৃত হিসেব সম্পূর্ণ আলাদা। জুলাই মাসে খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি ৫.৪ শতাংশে ফুঁসলেও, সার্ভিস সেক্টরের ইনফ্লেশন মাত্র ২.৫ শতাংশের ঘরে আটকে থাকায় সামগ্রিক হেডলাইন ইনফ্লেশন ফিগারটি কৃত্রিমভাবে ৪ শতাংশের আশেপাশে দেখানো সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ, আইটি বা সার্ভিস খাতের কম ইনফ্লেশনের সুবাদে ওভারঅল ডেটা কম দেখালেও সাধারণ মধ্যবিত্তের কিচেন বাজেটে ঠিকই আগুন জ্বলছে।

ভারতের এই পুরো অর্থনৈতিক মডেলটি মূলত আইটি সেক্টর, সফটওয়্যার রপ্তানি এবং বিদেশ থেকে আসা রেমিটেন্সের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখান থেকে আসা ডলার আমাদের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতিকে ঢেকে রাখে। কিন্তু পুরো অর্থনীতি বা শেয়ার বাজার যদি কেবল টিসিএস, ইনফোসিস বা এইচসিএলের মতো হাতেগোনা কয়েকটি হেভিওয়েট আইটি স্টকের খুঁটির ওপর ভর করে থাকে, তবে তা এক বিরাট বিপদের লক্ষণ।

আন্তর্জাতিক বাজারে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের আগ্রাসন বা মার্কিন মুলুকে সামান্য অর্থনৈতিক মন্দা নামলেই এই আইটি রমরমা এক নিমেষে থমকে যাবে এবং এই তথাকথিত ‘গোল্ডিলক্স জোন’-এর বেলুন চুপসে যাবে। পাশাপাশি, নমিনাল জিডিপি সেই অনুপাতে না বাড়ায় সরকারের মার্কেট থেকে টাকা তোলার ক্ষমতা ও ফিসকাল ডেফিসিট টার্গেট সামলানোও ভীষণভাবে কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

অর্থনীতির এই ফাঁকা দৌড়ের খতিয়ানের মধ্যেই শুরু হয়েছে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে তুমুল তরজা। প্রথম ত্রৈমাসিকের ৭.৮ শতাংশ জিডিপি গ্রোথকে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে সোশাল মিডিয়ায় সোজা বিরোধী শিবিরের ক্যাম্পেইনকে নিশানা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

কিরগিজস্তান থেকে পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় মোদী সাফ ভাষায় বলেছেন, দেশের একদল মানুষ হতাশার অন্ধকারে ডুবে থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে চারদিকে ‘ঝুঠ কি গুঞ্জ’ ছড়িয়ে দেশের অগ্রগতিকে আড়াল করতে চাইছেন। একই সঙ্গে তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে কড়া বার্তা দিয়ে বলেছেন যে, অপ্রয়োজনীয় বিদেশি ট্যুর, বিদেশে ডেস্টিনেশন ওয়েডিং বা অতিরিক্ত সোনা কেনা বন্ধ করতে হবে এবং সকলের মূল মন্ত্র হওয়া উচিত ‘ওয়েড ইন ইন্ডিয়া’।

অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর এই দাবিকে সম্পূর্ণ খারিজ করে তীব্র কটাক্ষ হেনেছেন কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ। তাঁর মতে, জিডিপির এই সংখ্যাটা আদতে কোনো প্রকৃত গ্রোথ নয়, বরং এটি একটি ‘গ্রেটলি ডিসটরটেড পিকচার’ বা চরম বিকৃত ছবি। পবন খেরা সহ অন্যান্য বিরোধী নেতাদেরও সোজা প্রশ্ন, জিডিপি যদি সত্যিই এত বাড়ে, তবে সাধারণ মানুষের পকেটে স্থায়ী চাকরি নেই কেন? দেশের ৮৫ কোটি মানুষকে এখনও কেন বিনামূল্যে রেশনের ওপর বেঁচে থাকতে হচ্ছে? বেকারত্ব ও ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির জ্বালা মেটানোর কোনো কার্যকর নামগন্ধ নেই কেন?

খাতায় কলমে জিডিপির এই ৭.৮ শতাংশ গ্রোথ দেখতে যতই চোখ ধাঁধানো বা চকচকে লাগুক না কেন, এর তলার অর্থনৈতিক ভিত পুরোপুরি ফোপরা। কাঁচামাল জমিয়ে রাখা আর সার্ভিস সেক্টরের সাময়িক বৃদ্ধির ওপর ভর করে তৈরি এই অর্থনীতির বেলুন যেকোনো মুহূর্তে ফুটো হতে পারে, যার সরাসরি মার এসে পড়বে সাধারণ মানুষের পিঠে। রাজনৈতিক ময়দানে যতই ‘ঝুট কি গুঞ্জ’-এর বয়ান তৈরি করে সাফল্যের ঢাক পেটানো হোক না কেন, আমজনতার জীবনের গনগনে বাস্তবের আঁচের সঙ্গে তার ন্যূনতম মিল নেই।

Related Posts

পুজোর আনন্দ মুহূর্তে পরিণত হল মৃত্যুমিছিলে! চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে ১৭ জনের মৃত্যুর খবর

বৃষ্টির মধ্যে মণ্ডপে উপচে পড়া ভিড়, পিছন থেকে ধাক্কা, তার পরই হুড়োহুড়ি! বহু আহতের অবস্থা সংকটজনক, মৃতের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ অক্টোবরঃ পুজোর আনন্দ, আলোর ঝলকানি আর…

২০২৩ সালেই কি শুরু হয়েছিল ‘নির্বাচনী নিয়ন্ত্রণের’ আসল খেলা?

বিরোধীদের ঘুম ভাঙতে দেরি, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন ঘিরে প্রশ্নের মুখে গণতন্ত্রের নিরপেক্ষতা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ অক্টোবরঃ ভারতের গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং অবাধ ও…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *