ডলু মহাসড়কে  দ্রুতগতির অটোর ধাক্কায় ষাটোর্ধ্ব পূর্ণিমা সিংহের মর্মান্তিক মৃত্যু, বৃদ্ধাকে হাসপাতালে নেওয়ার নাটক করে জঙ্গলে ফেলে পালাল অটোচালক

স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গতকাল দুপুরে কালিনগর এলাকার বাসিন্দা বছর ষাটের এক প্রৌঢ়া, নাম পূর্ণিমা সিংহ, নিজের দৈনন্দিন প্রয়োজনে বাইরে বের হয়েছিলেন। সেই সময় ডলু মহাসড়কের ওপর দিয়ে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছুটে চলা একটি ঘাতক অটো সজোরে ধাক্কা মারে তাঁকে। আকস্মিক এই ধাক্কায় রাস্তার ওপরে সজোরে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন বৃদ্ধা। তাঁর শরীর থেকে অঝোরে রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।

দুর্ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে প্রত্যক্ষদর্শীরা এগিয়ে এলে ঘাতক অটোচালক এক অভূতপূর্ব নাটক ফাঁদে। সে স্থানীয় লোকজনকে জানায় যে, রক্তে ভেসে যাওয়া ওই আহত বৃদ্ধাকে সে দ্রুত চিকিৎসার জন্য স্থানীয় কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাচ্ছে। চালকের এই কথায় সরল বিশ্বাসে স্থানীয়রা তাকে সাহায্য করার সুযোগ দেন। কিন্তু মানবতার যেটুকু অবশিষ্ট ছিল, তা ওই চালকের কুৎসিত মানসিকতার কাছে হার মানে।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার নাম করে সে আহত পূর্ণিমা সিংহকে বাঁচানোর ন্যূনতম চেষ্টা তো দূরের কথা, উল্টো ময়নাঙ্গের সড়কের পার্শ্ববর্তী এক ঘন জঙ্গলে তাঁকে মৃতপ্রায় বা মৃত অবস্থায় ফেলে চম্পট দেয়। চালক ভেবেছিল, এই জঘন্য অপরাধের কথা হয়তো চিরতরে চাপা পড়ে যাবে।

দীর্ঘ সময় ধরে বৃদ্ধা বাড়ি না ফেরায় এবং তাঁর কোনো খোঁজ না মেলায় পরিবার ও প্রতিবেশীরা উদ্বেগে পড়েন। এরপর গতকাল রাতে এলাকার কিছু সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে ময়নাঙ্গের জঙ্গলের পাশে পড়ে থাকা এক দেহ। খবর চাউর হতেই কালিনগর এলাকায় দাবানলের মতো উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় জনগণ দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে চিনতে পারেন এটি নিখোঁজ পূর্ণিমা সিংহের দেহ।

সঙ্গে সঙ্গে পরিবারকে খবর দেওয়া হয়। পরিবারের লোকজন দিশেহারা অবস্থায় ঘটনাস্থলে পৌঁছে দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে উন্নত চিকিৎসার জন্য শিলচর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু সমস্ত চেষ্টার অন্ত ঘটে মর্মান্তিক সংবাদে চিকিৎসকরা বৃদ্ধাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

হাসপাতাল থেকে মৃত্যুর খবর কালিনগরে পৌঁছতেই ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় এলাকাবাসীর। অপরাধী অটোচালকের নৃশংসতা এবং প্রশাসনের নজরদারির অভাবের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে সাধারণ মানুষ। আজ দুপুর ১টা থেকে ডলু মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন এলাকাবাসী।

রাস্তার ওপর টায়ার জ্বালিয়ে এবং ব্যারিকেড তৈরি করে চলে স্লোগান। এর ফলে ডলু মহাসড়কের উভয় দিকে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। শত শত যানবাহন ও দূরপাল্লার যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে চরম দুর্ভোগের শিকার হন।

বিক্ষুব্ধ জনতার সাফ দাবি, অবিলম্বে সেই অমানবিক অটোচালককে খুঁজে বের করতে হবে এবং পুলিশ প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। যতদিন না দোষী ব্যক্তি ধরা পড়ছে, ততদিন এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা। খবর পেয়ে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে।

এই গোটা ঘটনাটি কেবল একটি পথদুর্ঘটনা নয়, এটি বর্তমান সমাজের চরম নৈতিক অবক্ষয় এবং অমানবিকতার এক নগ্ন চিত্র। একজন মুমূর্ষু বৃদ্ধাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে জঙ্গলে ফেলে আসার মতো পৈশাচিক মানসিকতা কীভাবে একজন মানুষের মধ্যে থাকতে পারে, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন তুলছে সচেতন নাগরিক সমাজ।

অন্যদিকে, ডলু মহাসড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বেপরোয়া যান চলাচল এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের বেহাল দশা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকার বুদ্ধিজীবী মহল। কালিনগরের বাতাস এখন ভারী হয়ে উঠেছে পূর্ণিমা সিংহের পরিবারের কান্নার রোল আর দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবিতে গর্জে ওঠা সাধারণ মানুষের স্লোগানে।

Related Posts

মোদি সরকারের শিক্ষা নীতিতে বিস্ফোরক প্রশ্ন মুরলী মনোহর জোশীর, সরকার নিজেরাই কেলেঙ্কারি করছে

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৯ আগষ্টঃ দেশে যখন পরীক্ষা ব্যবস্থার জালিয়াতি, একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস, কর্মসংস্থানের অভাব এবং শিক্ষার ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে সারা ভারতের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে চরম ক্ষোভ…

হিমালয়ে গলছে বরফ, মহা-জলপ্রলয়ের দ্বারপ্রান্তে ভারত-নেপাল-ভুটান, হিমালয়ের বুকে টিকটিক করছে ২২১টি টাইম বোমা, প্রলয়ংকারী জলপ্রলয়ের আশঙ্কায় কাঁপছে দক্ষিণ এশিয়া

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৯ আগষ্টঃ হিমালয়ের শুভ্র তুষারাবৃত পাহাড়ের নীরবতার নিচে ধীরে ধীরে দানা বাঁধছে এক শতাব্দীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়। বিশ্ব উষ্ণায়ন ও অব্যাহত জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় দ্রুত গলে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *