বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৯ আগষ্টঃ রাজনীতি আর বিতর্কে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা শিলচরের বাতাসে এখন নতুন এক চাঞ্চল্যকর অধ্যায়। দীর্ঘ ২০ ঘণ্টা পুলিশি হেফাজতে কাটানোর পর অবশেষে সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুললেন প্রসেনজিৎ দেব। শুক্রবার শিলচরের একটি অভিজাত হোটেলে এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগকে স্রেফ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
তবে তাঁর এই সাফাই ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র কাটাছেঁড়া ও সমালোচনার ঝড়। বিরোধীদের প্রশ্ন, আর্থিক প্রতারণা বা আইনি ঝামেলাকে কি কেবল রাজনৈতিক রং চড়িয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে? নাকি সত্যিই এর নেপথ্যে রয়েছে কোনো গভীর রাজনৈতিক অভিসন্ধি?
সাংবাদিক সম্মেলনে শুরুতেই ক্ষোভ উগরে দিয়ে প্রসেনজিৎ দেব দাবি করেন, তাঁকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে ও সুপরিকল্পিত কায়দায় প্রায় ২০ ঘণ্টা পুলিশি হেফাজতে আটকে রাখা হয়েছিল। তাঁর সোজা সাপটা প্রশ্ন, কেন তাঁকে এত দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখা হলো? কাদের ইশারায় এই হেনস্তা?
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, আমাকে প্রায় ২০ ঘণ্টা হেফাজতে রাখা হয়েছিল। কেন? আমার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র চলছে এবং আমাকে বদনাম করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁর মতে, তাঁর ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবকে খর্ব করতেই প্রতিপক্ষরা এই হীন চক্রান্তের জাল বুনেছে।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট কারণও খাড়া করার চেষ্টা করেছেন প্রসেনজিৎ দেব। তাঁর বিস্ফোরক অভিযোগ, অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়টি বন্ধ করে দেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে একটি সুসংগঠিত ও গভীর ষড়যন্ত্র। তিনি দাবি করেন, এই স্পর্শকাতর ও জনস্বার্থের বিষয়টি যখন তিনি প্রথম জনসমক্ষে নিয়ে আসেন এবং এর প্রতিবাদে সোচ্চার হন,
ঠিক তার পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে এই বহুমুখী ষড়যন্ত্রের চাকা ঘুরতে শুরু করে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সত্যকে সামনে আনার জন্যই তাঁকে আজ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বলি হতে হচ্ছে। বিদ্যালয় বন্ধের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে মানুষের নজর ঘোরাতেই তাঁর বিরুদ্ধে এই অপপ্রচার ও আইনি পদক্ষেপের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে বলে তাঁর জোরালো দাবি।
তবে শুধু রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব আওড়িয়েই ক্ষান্ত থাকেননি প্রসেনজিৎ দেব। তাঁর বিরুদ্ধে যে অর্থ সংক্রান্ত গুরুতর মামলা বা অভিযোগ দায়ী, সে বিষয়েও মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। সমস্ত অভিযোগ ও গুঞ্জনকে একপাশে সরিয়ে রেখে তিনি প্রকাশ্যে আশ্বাস দিয়েছেন যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তাঁর পাওনা টাকা সুনির্দিষ্টভাবে ফেরত দেওয়া হবে এবং এই নিয়ে অহেতুক কোনো সমস্যা বা জটিলতা তৈরি হবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের জল অনেক দূর গড়ানোর ফলেই সম্ভবত তিনি কিছুটা সুর নরম করতে বাধ্য হয়েছেন এবং জল মাপার চেষ্টা করছেন। আইনি গ্যাঁড়াকলে ফেঁসে যাওয়ার ভয়েই কি এই বিলম্বিত বোধোদয়, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো সমীকরণ রয়েছে, তা নিয়েও শহরজুড়ে চলছে নানা জল্পনা।
শুক্রবার শিলচরের ওই সাংবাদিক সম্মেলনে প্রসেনজিৎ দেব সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হন এবং নিজের মতো করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সচেতন নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যেভাবে আইনি ও আর্থিক জটিলতাকে সরাসরি ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রাজনৈতিক মহলে দেখা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগের।
কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা আইনি লড়াইয়ের জোরালো দলিল পেশ না করে কেবল রাজনৈতিক ভিকটিম কার্ড খেলার এই রাজনীতি কতদূর টিকবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০ ঘণ্টা পুলিশি হেফাজতের ধকল কাটিয়ে প্রসেনজিৎ দেব নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালালেও, শিলচরের রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর এই সাফাই যে বিতর্ক থামানোর বদলে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।




