বৈকুণ্ঠপুরে পাহাড় কেটে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে অবাধে চলছে মাটি বোঝাই ভারী ডাম্পার ও ট্রাকের রমরমা বাণিজ্য
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৯ আগষ্টঃ আইন যেখানে পাহারাদার, ঠিক তার চোখের সামনেই যখন আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অপরাধের রামরাজত্ব চলে, তখন সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার নিয়েই প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়। কাছাড় জেলার কালাইন এলাকায় ঠিক এই পৈশাচিক ও লজ্জাজনক বাস্তবতাই এখন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বন বিভাগের আঞ্চলিক কার্যালয়টির সীমানা প্রাচীরের ঠিক পাশ দিয়ে, তাদের খাস নাকের ডগা দিয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যার অন্ধকার নামতেই চলছে অবৈধ লাল মাটি পাচারের এক রমরমা মহোৎসব। পাহাড় খেকো বালি-মাটি মাফিয়া সিন্ডিকেটের এই বেপরোয়া তাণ্ডব এবং বন দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী ও আধিকারিকদের এই পাথরচাপা নীরবতা নিয়ে এখন গোটা কাছাড়জুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনার ঝড়। রক্ষকই কি তবে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে? এই প্রশ্নই এখন কালাইনের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের মুখে মুখে ঘুরছে।

অনুসন্ধানে ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত চাঞ্চল্যকর তথ্যে জানা গেছে, কালাইনের বৈকুণ্ঠপুর এলাকাটি বর্তমানে ভূমি মাফিয়াদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে, কিংবা বলা ভালো প্রশাসনের আর্শীবাদপুষ্ট হয়ে সেখানে দিনের পর দিন নির্বিচারে চলছে পাহাড় কাটার অদম্য ধ্বংসলীলা। সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে বুম মেশিন ও জেসিবি বসিয়ে প্রতিদিন লোভের বশে তুলে নেওয়া হচ্ছে প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ, লাল মাটি।
পাহাড়ের বাস্তুতন্ত্রকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে এই মাটি লুট করার পর তা বোঝাই করা হচ্ছে ভারী ডাম্পার ও ট্রাকগুলিতে। এরপর সন্ধ্যার মুখ থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত দস্যুর মতো সেই গাড়িগুলি ছুটে চলেছে কালাইন ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বিভিন্ন অবৈধ ইটের ভাটা ও ব্যক্তিগত ভরাটের কাজে। প্রশাসনের চরম উদাসীনতায় চোখের পলকে সবুজ পাহাড় আজ ধূসর টিলায় রূপান্তরিত হতে বসেছে।
এই গোটা অবৈধ কারবারের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও অপরাধমূলক দিকটি হলো এর যাতায়াতের রুট। যে কাঁচা বা পাকা রাস্তা দিয়ে এই মাটি বোঝাই ভারী ঘাতক ডাম্পারগুলি প্রতিদিন দর্পভরে চলাচল করছে, ঠিক তার পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে কালাইন বন বিভাগের মূল কার্যালয়। সচেতন মহলের প্রশ্ন, দিনমজুর থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারী যখন দূর থেকেই পাহাড় মাফিয়াদের এই তাণ্ডব দেখতে পাচ্ছে, তখন বন দপ্তরের খাকি উর্দিধারী পাহারাদার ও বন কর্মীরা কি অন্ধ? নাকি এই অন্ধত্ব সম্পূর্ণ কৃত্রিম?
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন দপ্তরের এই রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা কোনো সাধারণ প্রশাসনিক গাফিলতি নয়; এর নেপথ্যে রয়েছে খাকি উর্দি, রাজনৈতিক মদতপুষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং ভূমি মাফিয়া সিন্ডিকেটের এক দুর্ভেদ্য ও লাভজনক আঁতাত।
অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের মাসোহারা বা উৎকোচের বিনিময়ে বন দপ্তরের অসাধু কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইশারাতেই এই পাহাড় খেকো চক্র দিনের পর দিন নির্ভয়ে তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করে চলেছে। বনের পশুপাখি ও প্রকৃতি রক্ষার দায়িত্ব যাদের কাঁধে অর্পিত, আজ তারাই যদি পেছনের দরজা দিয়ে এই ধ্বংসলীলাকে মদত জোগায়, তবে সাধারণ মানুষ কার কাছে বিচার পাবে?
প্রকৃতির ওপর এই অন্ধ ও নির্বিচার অত্যাচারের খেসারত যে গোটা কালাইনবাসীকে খুব শীঘ্রই রক্ত দিয়ে চোকাতে হবে, তা বলাই বাহুল্য। বৈকুণ্ঠপুর ও সংলগ্ন এলাকার প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি যেভাবে প্রতিদিন ভেঙে চুরমার করা হচ্ছে, তাতে আগামী বর্ষায় এই অঞ্চলে ভয়াবহ পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা এবং বিস্তীর্ণ জনবসতি প্লাবিত হওয়ার চরম আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বৃষ্টির জল ধরে রাখার প্রাকৃতিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় এলাকার ভূগর্ভস্থ জলের স্তরও দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। অথচ পরিবেশ ধ্বংসের এই মহোৎসব বন্ধ করতে বন বিভাগের পক্ষ থেকে ন্যূনতম কোনো আইনি পদক্ষেপ বা নজরদারি আজও চোখে পড়েনি। যেন এক গভীর ঘুম বা কোনো অদৃশ্য মহাজনের নির্দেশে তারা হাত গুটিয়ে বসে রয়েছে।
বন বিভাগের কার্যালয়ের সামনে দিয়ে চলা এই বেআইনি লাল মাটি পাচার ও পাহাড় ধ্বংসের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ফোরণের উপক্রম হয়েছে। স্থানীয় নাগরিক সমাজ, পরিবেশপ্রেমী সংগঠন এবং বুদ্ধিজীবী মহল একযোগে দাবি তুলেছেন, অবিলম্বে এই অবৈধ মাটি পাচার চিরতরে বন্ধ করতে হবে। শুধু তাই নয়, এর নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী মাফিয়া চক্র এবং তাদের আড়াল করা কালাইন বন দপ্তরের অসাধু কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় ও ফৌজদারি তদন্ত শুরু করতে হবে।
সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রক যদি এখনই এই জঘন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর বুলডোজার নীতি গ্রহণ না করে, তবে আগামী দিনে কালাইনের সবুজ মানচিত্র চিরকালের মতো মুছে যেতে সময় লাগবে না। কালাইনের সাধারণ মানুষ এখন তাকিয়ে রয়েছে জেলা প্রশাসন ও রাজ্য সরকারের ওপর মহলের দিকে তারা কি এই মাফিয়া রাজের বিরুদ্ধে কোনো দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেবে, নাকি এইভাবেই প্রকৃতির বুক চিরে তিল তিল করে ধ্বংস হতে থাকবে উপত্যকার প্রাণকেন্দ্র?




