প্রশাসনিক গাফিলতির চরম খেসারত! সময়সীমা পার হতেই পোর্টাল বন্ধের অজুহাত
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২২ আগষ্টঃ সরকার যখন ঘরের দুয়ারে সুবিধা পৌঁছে দিতে বিশেষ পদক্ষেপ নিচ্ছে, তখন স্থানীয় ব্লক ও পঞ্চায়েত স্তরের একশ্রেণীর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী ও আধিকারিকদের খামখেয়ালিপনা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে তা ভেস্তে যাচ্ছে! প্রধানমন্ত্রী আবাস প্লাস যোজনায় চা-জনগোষ্ঠীর বাদ পড়া যোগ্য পরিবারগুলির জন্য রাজ্য সরকার অতিরিক্ত সময়সীমা ধার্য করে বিশেষ জিওট্যাগিংয়ের সুযোগ করে দিলেও, কালাইন ব্লকের অন্তর্গত কালীবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতে সেই সরকারি নির্দেশকে স্রেফ বুড়ো আঙুল দেখানো হলো। স্থানীয় আধিকারিক ও পঞ্চায়েত কর্মীদের চরম গাফিলতির জেরে ওই এলাকার বহু দরিদ্র, অসহায় চা-শ্রমিক পরিবার মাথা গোঁজার পাকা ঘর পাওয়া থেকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
বাগানের রোদ-ঝড়-জল মাথায় নিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করা এই সাধারণ মানুষগুলোর অভিযোগ, সরকারি সুযোগ আসা সত্ত্বেও স্রেফ দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের অনীহা ও অবহেলার দরুন পোর্টালে তাঁদের নামই উঠল না! গ্রামীণ গৃহহীন ও কাঁচা বাড়িতে বসবাসকারী দরিদ্র পরিবারগুলিকে পাকা ঘর দেওয়ার লক্ষ্যে নির্দিষ্ট সময় অন্তর জিওট্যাগিং ও নথিপত্র যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। ২০১৮ সালে কালাইন ব্লকসহ সমগ্র বরাক উপত্যকা ও অসমে বিপুল সংখ্যক পরিবারকে এই প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়েছিল, যার মেয়াদ ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে সমাপ্ত হয়।
পরবর্তী ধাপ হিসেবে ২০২৫ সালে সরকার নতুন করে জিওট্যাগিংয়ের নির্দেশ দেয়। কালাইন ব্লকের বিভিন্ন পঞ্চায়েতে এই কাজ শুরু হলেও, দেখা যায় এক বিরাটসংখ্যক চা-জনগোষ্ঠীর যোগ্য পরিবার প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা সঠিক প্রচারের অভাবে বাদ পড়ে যান। বিষয়টি জনসমক্ষে এলে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজ্য সরকার আগস্ট মাসে বিশেষভাবে বাদ পড়া চা-জনগোষ্ঠীর পরিবারগুলির নাম অন্তর্ভুক্ত করতে বিশেষ অতিরিক্ত সময়সীমা ঘোষণা করে। কালাইন ব্লকের অন্যান্য গ্রাম পঞ্চায়েতে যখন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় বাদ পড়া পরিবারগুলির পুনরায় জিওট্যাগিং সম্পন্ন করা হয়, ঠিক তখনই এক বিপরীত ও হতাশাজনক ছবি দেখা গেল কালীবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতে।
স্থানীয় বাগান এলাকার ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিশেষ সময়সীমা চলাকালীন জিপিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত পঞ্চায়েত সচিব, জিআরএস কিংবা জিওট্যাগিংয়ের দায়িত্বে থাকা ভিআরপিরা কোনো সক্রিয় ভূমিকা নেননি। বাগান এলাকায় গিয়ে প্রচার বা বাড়ি বাড়ি ঘুরে সার্ভে করার বিষয়ে তাঁদের চরম অনীহা লক্ষ করা গেছে। অতিরিক্ত সময়সীমা পার হওয়ার পর যখন ক্ষুব্ধ চা-শ্রমিকেরা পঞ্চায়েত কার্যালয় ও ব্লক অফিসে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন, তখন আধিকারিকরা সাফ জানিয়ে দেন যে সরকারি পোর্টাল বা সাইট বন্ধ হয়ে গেছে! এখন নতুন করে আর কারও নাম তোলার কোনো সুযোগ নেই।
এক ভুক্তভোগী চা-শ্রমিক ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, সরকার আমাদের কথা ভেবে সময় বাড়াল, কিন্তু পঞ্চায়েতের বাবুদের আলসেমির জন্য আমাদের নাম পোর্টালে উঠলই না! যখন সুযোগ ছিল তখন কেউ গ্রামে এল না, আর এখন বলছেন পোর্টাল বন্ধ! এই ভাঙা কাঁচা ঘরে বৃষ্টিতে ভিজে আমাদের দিন কাটাতে হয়, এর জবাব কে দেবে? কালীবাড়ি জিপির এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় পুরো কালাইন ব্লক প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও চা-জনগোষ্ঠী সংগঠনের নেতাদের মূল প্রশ্ন, সরকার যেখানে চা-জনগোষ্ঠীর অনুন্নত পরিবারগুলির সামাজিক সুরক্ষায় বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে, সেখানে কালীবাড়ি জিপিতে সরকারি নির্দেশ কার্যকর করতে আধিকারিকরা কেন ব্যর্থ হলেন? ব্লকের অন্যান্য জিপিতে কাজ সম্পন্ন হলেও কালীবাড়ি জিপিতে কেন শিথিলতা দেখানো হলো? বিডিও বা বিভাগীয় উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা কেন সময়মতো তদারকি করলেন না? কতিপয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী ও আধিকারিকের এই চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার জন্য যেসব প্রকৃত যোগ্য পরিবার গৃহহীন থেকে গেলেন, তাঁদের এই অপূরণীয় ক্ষতির দায়ভার কে নেবে?
চা-বাগান এলাকার ভুক্তভোগী পরিবারগুলি বর্তমানে দিশেহারা। নিজেদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে তাঁরা এখন প্রশাসনের সর্বোচ্চ দরবারে ন্যায়বিচারের আশায় দিন গুনছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জেলা শাসক এবং পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি গুলির মধ্যে অন্যতম হলো, কালীবাড়ি জিপিতে জিওট্যাগিং প্রক্রিয়ায় গাফিলতির অভিযোগে জড়িত কর্মী ও সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় আধিকারিকদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত করে যথাযথ প্রশাসনিক ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
পাশাপাশি, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিবেচনা করে বিশেষ প্রশাসনিক সুপারিশের মাধ্যমে কালীবাড়ি জিপির জিওট্যাগিং প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়া যোগ্য চা-জনগোষ্ঠীর পরিবারগুলির জন্য পুনরায় জিওট্যাগিং পোর্টাল খোলার আবেদন সংশ্লিষ্ট বিশেষ প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর দাবিও জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রকৃত যোগ্য পরিবারগুলিকে পুনরায় সুযোগ দিয়ে সরকারি সুবিধার আওতায় আনার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সরকারি নির্দেশ ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেবল স্থানীয় প্রশাসনিক গাফিলতির শিকার হয়ে কালাইন ব্লকের কালীবাড়ি জিপির বহু দরিদ্র চা-শ্রমিক পরিবার আজ প্রধানমন্ত্রী আবাস প্লাস যোজনার সুফল থেকে বঞ্চিত। মাথা গোঁজার একটি পাকা ঘরের স্বপ্ন যেখানে সত্যি হওয়ার কথা ছিল, সেখানে আধিকারিকদের খামখেয়ালিপনা ও উদাসীনতায় শত শত চা-জনগোষ্ঠীর মানুষের কপালে জুটেছে কেবল অনিশ্চয়তা ও তীব্র হতাশা।
অতিরিক্ত সময়সীমা পেয়েও কেন জিওট্যাগিং সম্পূর্ণ করা হলো না এবং কেন সঠিক সময়ে হিতাধিকারীদের নাম পোর্টালে তোলা হলো না, এই প্রশ্নে এখন ফুঁসছে গোটা কালাইন ব্লক। সাধারণ চা-শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। বঞ্চিত হিতাধিকারী ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ব্লক ও জেলা প্রশাসনকে অতি দ্রুত এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে হবে।
বিশেষ বিবেচনা করে বঞ্চিত চা-শ্রমিক পরিবারগুলির জন্য পোর্টাল খুলে নতুন করে জিওট্যাগিং সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নিতে হবে। এই চরম দায়িত্বে অবহেলাকারী কর্মকর্তা ও কর্মীদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। প্রশাসন যদি অবিলম্বে এই বিষয়ে কোনো সদর্থক ও কার্যকরী পদক্ষেপ না নেয়, তবে আগামী দিনে কেবল স্মারকলিপি বা আবেদনে সীমাবদ্ধ না থেকে রাস্তা অবরোধ, ব্লক কার্যালয় ঘেরাওসহ বৃহত্তর গণ-আন্দোলনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হবেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ক্ষুব্ধ চা-শ্রমিকরা।






