উগ্র আঞ্চলিকতাবাদে ধ্বংসের মুখে মেঘালয়ের পর্যটন! অ-খাসি ও পর্যটকদের ওপর হামলায় চরম ক্ষোভ
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২২ আগষ্টঃ পাহাড়ঘেরা শান্ত শহর শিলংয়ে উগ্র প্রাদেশিকতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদী মানসিকতার নজিরবিহীন তাণ্ডবে স্তম্ভিত সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারত! পাঁচ দফা দাবির আড়ালে ‘খাসি স্টুডেন্ট ইউনিয়ন’ এর অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি, অ-খাসি বাসিন্দাদের ওপর সঙ্ঘবদ্ধ আক্রমণ এবং বিশ্ববরেণ্য মহাপুরুষ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মূর্তি ভাঙচুর ও স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তিতে আঘাতের ন্যক্কারজনক ঘটনার বিরুদ্ধে এবার তীব্র ক্ষোভ উগরে দিল সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সামাজিক সংগঠন ‘বাংলা সাহিত্য সভা, অসম’।
এক বিবৃতিতে সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে উগ্রতা ও বাঙালি, অসমীয়াসহ অ-খাসি জনগোষ্ঠীর ওপর ধারাবাহিক নির্যাতন কোনোভাবেই আর সহ্য করা হবে না। মেঘালয় সরকার যদি কঠোর হাতে এই তাণ্ডব দমন না করে, তবে আগামী দিনে এর মারাত্মক খেসারত দিতে হবে রাজ্যটির অর্থনীতি ও সামাজিক সহাবস্থানকে।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ড. প্রশান্ত চক্রবর্তী এই ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এক কড়া বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। তিনি ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, আমরা এই বর্বরতার নিন্দার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না! কারা এরা? কিছুদিন পরপর কীভাবে এরা অরাজকতা সৃষ্টি করে অ-খাসি মানুষের ওপর হামলা চালানোর দুঃসাহস পায়? এরা কি ভুলে যাচ্ছে যে শিলং ও মেঘালয় ভারতেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গরাজ্য?”
সংগঠনের পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক সত্য স্মরণ করিয়ে দিয়ে ড. চক্রবর্তী প্রশ্ন তোলেন, আধুনিক শিলং শহর ও এখানকার সভ্যতা গড়ে তুলতে বাঙালি ও অসমীয়া সমাজের বিশিষ্ট গুণীজনদের অবদান কতটা গভীর, তা কি এই তথাকথিত ছাত্রনেতারা জানে? ১৯৩৮ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু যদি শিলঙে এসে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে গোপীনাথ বরদলৈর নেতৃত্বে সরকার গঠনে সহায়তা না করতেন, তবে আজ শিলংয়ের রাজনৈতিক পরিচয় কোথায় গিয়ে ঠেকত, তা কল্পনা করাও কঠিন! বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে স্বামী বিবেকানন্দের মতো মহান দিব্যপুরুষদের পদধূলিতে ধন্য হয়েছে শিলংয়ের মাটি সেই পবিত্র ভূমিতে দাঁড়িয়ে মনীষীদের মূর্তিতে হাত দেওয়া চরম কুশিক্ষার পরিচয়।
বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, কিছু উগ্র খাসি ছাত্র-যুবদের এই হীন মানসিকতা নতুন নয়। অতীতেও বারবার অ-খাসি ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। অথচ মেঘালয় রাজ্যের অর্থনীতির প্রধান মেরুদণ্ডই হলো পর্যটন শিল্প। ড. প্রশান্ত চক্রবর্তী কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দেশের অন্য প্রান্তের মানুষ যদি নিরাপত্তার অভাবে মেঘালয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, তবে রাজ্যটির অর্থনীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
মেঘালয়বাসী যেন ভুলে না যান যে, ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগের প্রধান ফটকই হলো অসমের খানাপাড়া ও জোড়াবাট। সেই পথে যদি একবার অসমের সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অর্থনৈতিক অবরোধ, পর্যটন কিংবা পণ্য পরিবহণ স্তব্ধ করে দেন, তবে উগ্রপন্থীদের পরিণতি কী হবে, তা ভেবে দেখা উচিত!
পার্বত্য রাজ্যগুলির জন্য প্রচলিত সংবিধানের বিশেষ আইনের অপব্যবহার ও বৈষম্যমূলক মানসিকতার কঠোর সমালোচনা করেছে ‘বাংলা সাহিত্য সভা, অসম’। সংগঠনের নেতারা জানান, অ-খাসিরা মেঘালয়ে জমি কিনতে পারেন না—সংরক্ষণের খাতিরে এই আইন মানা হলেও, মেঘালয়ের খাসি বা অন্যান্য জনজাতির নাগরিকরা কীভাবে গুয়াহাটি, কলকাতা, দিল্লি, বেঙ্গালুরুর মতো মেগাসিটিতে অনায়াসে বিঘার পর বিঘা জমি ও দামি ফ্ল্যাট কিনছেন? নিজ দেশে এই চরম বৈষম্য কেন থাকবে, তা নিয়েও মৌলিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
সংগঠনের সভাপতি মেঘালয়ে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের নীরবতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কেন পুলিশ ও প্রশাসন কঠোর হাতে এই দুষ্কৃতীদের দমন করছে না? অ-খাসি স্থায়ী বাসিন্দাদের পাশাপাশি রাজ্যটিতে ঘুরতে যাওয়া নিরীহ পর্যটকদের ওপর মাঝেমধ্যেই হামলা চালানো হচ্ছে, যা কোনো সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না।
তিনি উল্লেখ করেন, এটি কেবল মেঘালয়ে সীমাবদ্ধ নয়, পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের নানা প্রান্তে এক শ্রেণীর দুষ্টচক্র পরিকল্পিতভাবে বাঙালি মনীষীদের কটূক্তি ও অসম্মান করে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চক্রান্ত চালাচ্ছে। বাংলা সাহিত্য সভা, অসম’ এর পক্ষ থেকে অসম, মেঘালয়সহ গোটা দেশের শান্তিপ্রিয় ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকদের একজোট হয়ে এই নিকৃষ্ট মানসিকতার বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যম ও রাজপথে গণতান্ত্রিকভাবে সরব হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।






