প্রায় ৩ কোটি কোটি টাকার স্ক্র্যাপ চুরির অভিযোগ, এখনও পর্যন্ত গ্রেফতার ১৭, তদন্তে একের পর এক নতুন নাম
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ৩ আগষ্টঃ ছত্তীসগড়ের ভিলাই স্টিল প্ল্যান্ট এ কথিত কোটি কোটি টাকার লোহা চুরির মামলায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন নতুন তথ্য। প্রথমে যেটিকে সাধারণ স্ক্র্যাপ চুরির ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছিল, তদন্তকারীদের দাবি, তা ধীরে ধীরে একটি সুসংগঠিত ও বহুস্তরীয় চক্রের রূপ নিচ্ছে। এই মামলায় ইতিমধ্যেই প্ল্যান্টের দুই শীর্ষ আধিকারিক গ্রেফতার হয়েছেন। এবার গ্রেফতার হলেন বিজেপির এক স্থানীয় নেতা। ঘটনার পরপরই দলও তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়ে তাঁকে ছয় বছরের জন্য বহিষ্কার করেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, বৈশালী নগর বিধানসভা এলাকার বিজেপি মণ্ডল কমিটির কোষাধ্যক্ষ ভাস্কর মুদালিয়ারের সঙ্গে লোহা পরিবহণে ব্যবহৃত কয়েকটি ট্রাকের যোগসূত্রের অভিযোগ উঠে আসে। সেই সূত্র ধরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং পরে গ্রেফতার করা হয়। যদিও তদন্ত এখনও চলছে এবং আদালতে অভিযোগের বিচার বাকি। ভাস্কর মুদালিয়ারের গ্রেফতারের পর ভারতীয় জনতা পার্টি দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ভিলাই জেলা বিজেপি সভাপতি পুরুষোত্তম দেওয়াঙ্গন ঘোষণা করেন, তদন্তের গুরুত্ব বিবেচনা করে এবং দলের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে ভাস্কর মুদালিয়ারকে প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে ছয় বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে।

তবে এই ঘটনায় নতুন বিতর্কও তৈরি হয়েছে। দুর্গ পুলিশ এর আগে গ্রেফতার হওয়া ১৬ অভিযুক্তের ছবি, ভিডিও এবং প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলেও, ভাস্কর মুদালিয়ারের ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। এই ভিন্ন আচরণের কারণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও পুলিশ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও ব্যাখ্যা দেয়নি। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, এটি কেবল বিচ্ছিন্ন চুরির ঘটনা নয়। অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে প্ল্যান্ট থেকে লৌহজাত সামগ্রী বাইরে পাচার করা হতো। তদন্তে উঠে এসেছে, প্ল্যান্ট থেকে বের হওয়া ফ্লু ডাস্টের সঙ্গে লৌহ স্ক্র্যাপ মিশিয়ে তা বাইরে পাঠানো হতো। পরে নির্দিষ্ট জায়গায় স্ক্র্যাপ আলাদা করে মজুত ও বিক্রির ব্যবস্থা করা হতো।
পুলিশের মতে, এই পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে চললেও তা নজর এড়িয়ে যায়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এত বড় পরিসরে এমন কর্মকাণ্ড কীভাবে বছরের পর বছর অদৃশ্য রইল? নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নজরদারি এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে কোনও ঘাটতি ছিল কি না, তা নিয়েও তদন্ত চলছে। গত ২৬ মে ২০২৬ পুরনো ভিলাই থানার পুলিশ আকলোরডিহ খদানপাড়া এলাকার একে ট্রেডার্স এবং হাতখোজ এলাকার একটি প্লটে অভিযান চালায়। সেখানে একাধিক হাইভা, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনে ফ্লু ডাস্টের সঙ্গে লোহার প্লেট, বিম ও কাটিং সামগ্রী উদ্ধার হয়।
পুলিশ জানায়, অভিযানে প্রায় ২৫০ টন লৌহ স্ক্র্যাপ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এছাড়া স্ক্র্যাপ পরিবহণে ব্যবহৃত ট্রাক, জেসিবি, হাইড্রা এবং অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতিও জব্দ করা হয়। উদ্ধার হওয়া সামগ্রী ও যানবাহনের মোট মূল্য প্রায় ৩ কোটি ২২ লক্ষ বলে পুলিশের প্রাথমিক অনুমান। এই মামলায় ইতিমধ্যেই ভিলাই স্টিল প্ল্যান্টের তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার হিমাংশু ভূষণ মালিক এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার মনোজ কুমার দেওয়াঙ্গনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ, তাঁরা কথিতভাবে চক্রটির কার্যকলাপে সহায়তা করেছিলেন। তবে এই অভিযোগের বিচার এখনও আদালতে হয়নি এবং অভিযুক্তরা আইন অনুযায়ী আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রাখেন।
ঘটনার প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনী এর নিরাপত্তা ব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অভিযোগ, নিরাপত্তায় গাফিলতির কারণে সাতজন সিআইএসএফ জওয়ানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। যদিও এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত সিআইএসএফের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি। ভিলাই স্টিল প্ল্যান্ট দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্পাত উৎপাদন কেন্দ্র। এমন একটি কৌশলগত শিল্প প্রতিষ্ঠানে কথিতভাবে দীর্ঘদিন ধরে লোহা পাচারের অভিযোগ সামনে আসায় শিল্প নিরাপত্তা, প্রশাসনিক নজরদারি এবং অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, মামলার পরিধি এখনও বাড়ছে এবং নতুন তথ্য সামনে আসছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরা যায় না। আদালতের রায়ের পরই অভিযুক্তদের দায় বা নির্দোষিতা আইনগতভাবে নির্ধারিত হবে। তবুও এই ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানে সম্পদ সুরক্ষা, নজরদারি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে। এখন সবার নজর তদন্তের অগ্রগতি এবং আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।





