বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৬ আগষ্টঃ প্রকৃতির নির্মম আঘাত নাকি প্রশাসনিক উদাসীনতা কোনটি বেশি দায়ী? বর্ষার মরশুম পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু হওয়ার আগেই, মাত্র এক পশলা ভারী বৃষ্টিতেই ফের চেনা কঙ্কালসার রূপ বেরিয়ে পড়ল পূর্ব কাছাড় জেলার সম-জেলা ধলাইয়ের। টানা কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পূর্ব ধলাই এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখন এক বিশাল জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। চারদিকে শুধু থইথেই জল আর হাহাকার।
বন্যার তোড়ে তলিয়ে গেছে এলাকার শিক্ষার আলো ছড়ানো ১২৯৩ নং জীবন গ্রাম নিম্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়। একই সঙ্গে জলবন্দি হয়ে পড়েছে অন্তত ১৫টি অসহায় পরিবার। নিরাপদ আশ্রয়, একফোঁটা বিশুদ্ধ পানীয় জল আর দু-মুঠো শুকনো খাবারের জন্য এখন চলছে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার চরম সংগ্রাম।
সরেজমিনে এলাকা ঘুরে দেখা গেল এক মর্মান্তিক দৃশ্য। বানের জল ঘরের উঠোন পেরিয়ে ঢুকে পড়েছে শোওয়ার ঘরে। কোথাও হাঁটু জল, কোথাও বা কোমরসমান জল। আসবাবপত্র, পরনের জামাকাপড় থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আর চাল-ডালের বস্তা বাঁচাকে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন দুর্গতরা। ঘরে জল ঢুকে সব শেষ করে দিয়েছে। দু-দিন ধরে ঘরে উনুন জ্বলেনি।
ছোট ছোট বাচ্চাদের কী খেতে দেব বুঝতে পারছি না। আমরা জলবন্দি, কিন্তু দেখার কেউ নেই। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন ছোট ছোট শিশু, গর্ভবতী নারী এবং বয়োবৃদ্ধরা। পানীয় জলের টিউবওয়েলগুলো বানের জলে তলিয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে মারাত্মক পানীয় জলসংকট। নোংরা ও দূষিত জল ব্যবহার করায় ছড়াতে শুরু করেছে জলবাহিত রোগের আতঙ্ক।
বন্যার থাবা থেকে রেহাই পায়নি শিক্ষার প্রাঙ্গণও। ১২৯৩ নং জীবন গ্রাম নিম্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু করে খেলার মাঠ সবটাই এখন জলের নিচে। ফলে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পাঠদান ব্যবস্থা। বন্যার কারণে বিদ্যালয়ের আসবাবপত্র ও সরকারি নথিপত্র নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। শিশুদের সুরক্ষা এবং ভবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন অভিভাবকরা। স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রতিবছর যদি এভাবেই বিদ্যালয় প্লাবিত হয়, তবে গ্রামীণ শিশুদের ভবিষ্যতের দায়িত্ব কে নেবে?
রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় পূর্ব ধলাই এখন মূল ভূখণ্ড থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপে পরিণত হয়েছে। হাট-বাজার বন্ধ, জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাওয়া তো দূরের কথা, ঘর থেকে বেরোনোই এখন জীবনপণ লড়াই। চরম বাধ্য হয়ে অনেককে কোমরসমান বিষাক্ত জল পার হয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। কোনো জরুরি স্বাস্থ্য সংকট দেখা দিলে যে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা ভেবেই শিউরে উঠছেন স্থানীয়রা।
ক্ষোভ আর হাহাকারে ফেটে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নিজেদের চরম দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে স্থানীয় বাসিন্দা গৈরমনি রায়, মমিতা রায় ও দিপু রায় ক্ষোভের সঙ্গে জানান, প্রতিটি নির্বাচনের আগে নেতারা বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেন। ড্রেন হবে, বাঁধ তৈরি হবে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ হবে। কিন্তু নির্বাচন পার হলেই সব হাওয়া! প্রতি বছর একই নাটকের পুনরাবৃত্তি ঘটে।
আমরা আর কতদিন এই নরকযন্ত্রণা সহ্য করব? এলাকাবাসীর অভিযোগ, এটি কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে চলা অবহেলা এবং নিকাশি ব্যবস্থার চরম অব্যবস্থাপনার এক কৃত্রিম ফসল। স্থায়ী কোনো বন্যা প্রতিরোধ প্রকল্প না থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দিন দিন পাহাড়প্রমাণ হয়ে উঠছে।
পরিস্থিতি দিন দিন হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। দুর্গত ১৫টি পরিবার এবং সমগ্র পূর্ব ধলাইয়ের বাসিন্দারা প্রশাসনের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন, অবিলম্বে শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য, এবং ত্রিপল পৌঁছে দেওয়া হোক। দ্রুত বিশুদ্ধ পানীয় জল, জল বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং মেডিকেল ক্যাম্পের ব্যবস্থা করতে হবে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা পুনর্নির্মাণ ও বাঁধ সংস্কারের মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ঘরবাড়ি মেরামত এবং কৃষিকাজের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।
আজ ধলাইয়ের শিশুরা অনাহারে, বৃদ্ধরা অনিরাপদ, আর সাধারণ মানুষের একমাত্র মাথার ওপরের ছাদটি বানের জলে ভাসছে। এটি কেবল ধলাইয়ের ১৫টি পরিবারের সংকট নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। কাগজে-কলমে উন্নয়নের নানা প্রকল্প আঁকা হলেও, বাস্তব চিত্রটি যে কতটা কঙ্কালসার তা পূর্ব ধলাইয়ের এই প্লাবন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
সাময়িক দু-এক কেজির ত্রাণ বা শুকনো চিঁড়ে-গুড় দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অবিলম্বে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় প্রশাসনিক উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ বন্টনের পাশাপাশি প্রয়োজন একটি স্থায়ী মাস্টারপ্ল্যান। প্রকৃতির এই নির্মম আঘাতে দিশেহারা মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে আজ সমাজসেবী সংস্থা এবং প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপই পারে তাদের নতুন করে বাঁচার আলো দেখাতে।






