ভিডিও করায় সংবাদকর্মীর ফোন ছিনতাই ও মারমুখী তাণ্ডব, নীরব দর্শকের ভুমিকায় পুলিশ
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ২৭ অক্টোবরঃ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা যেখানে জুয়া ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বারংবার ঘোষণা করছেন, ঠিক তখনই মুখ্যমন্ত্রীর সেই স্পষ্ট নির্দেশ ও ফরমানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কাছাড় জেলার শালচাপড়ায় রমরমিয়ে চলছে অবৈধ জুয়ার আসর। শালচাপড়া আনন্দ মেলাকে কেন্দ্র করে নিয়মিত বসানো হচ্ছে ঝাণ্ডি-মুণ্ডা ও জুয়ার আখড়া। মেলাকে রূপ দেওয়া হয়েছে লক্ষ লক্ষ টাকা অবৈধ বাণিজ্যের আখড়ায়। এই জুয়ার চক্করে পড়ে প্রতিদিন সাধারণ মানুষের পকেট ফাঁকা হলেও, পকেট ভারী হচ্ছে মেলা কমিটি ও তাদের নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী মহলের।
স্থানীয় সূত্রে উঠে এসেছে এক বিস্ফোরক তথ্য। জানা গেছে, কাছাড় জেলার কাটিগড়া বিধানসভার বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থের ঘনিষ্ঠ এবং স্থানীয় শাসক দলের শালচাপড়া মণ্ডলের কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা এই অবৈধ খেলার কলকাঠি নাড়ছেন। তাদের ছত্রছায়াতেই মেলা প্রাঙ্গণে আইনকানুনকে তোয়াক্কা না করে দিন-রাত চলছে এই বেআইনি কারবার।
রবিবার সন্ধ্যায় এই অনিয়ম ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের খবর পেয়ে শালচাপড়া আনন্দ মেলায় সরেজমিনে তদন্তে যান একদল সংবাদকর্মী। মেলা প্রাঙ্গণে ঢুকে সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখে সন্দেহ হলে কাছে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে প্রকাশ্যেই চলছে ঝাণ্ডি-মুণ্ডা জুয়া। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এক সংবাদকর্মী গোপন ক্যামেরায় সেই জুয়ার দৃশ্য দৃশ্যমান করেন এবং মোবাইলে ধারণ করে রাখেন।
জুয়ার এই ভিডিও করার বিষয়টি চোখে পড়তেই মেলা কমিটির কর্মকর্তাদের রূপ পাল্টে যায়। বিধায়ক-ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মেলা কমিটির কর্তাব্যক্তিরা সাথে সাথে এসে সাংবাদিকদের ঘিরে ধরেন। এখানে কেন এসেছো?, কেন ভিডিও করছো? এ ধরনের ধমক ও উত্তপ্ত বাক্যবাণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক। পরিস্থিতি মুহূর্তে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
মেলা কমিটির সদস্যরা জোর-জুলুম করে এক সংবাদকর্মীর হাত থেকে মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেন। শুধু তাই নয়, অন্য এক সাংবাদিককে ঘেরাও করে ভিডিও ডিলিট করতে হবে, ভিডিও এখনই ডিলিট কর! বলে চড়াও হন ও চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন। একপর্যায়ে সাংবাদিকদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও ঠেলা-ধাক্কা দেওয়া হয়। মেলায় উপস্থিত সাধারণ মানুষের একাংশ এগিয়ে এসে সাংবাদিকদের রক্ষা না করলে বড় ধরনের অঘটন ঘটতে পারতো।
পুরো ঘটনাটির দৃশ্য মেলায় থাকা এক সাধারণ দর্শনার্থী নিজের মোবাইলে তুলে রাখেন, যা ইতিমধ্যেই ভাইরাল এবং প্রভাবশালী মহলের এই গুণ্ডাগিরির জলজ্যান্ত প্রমাণ হিসেবে সামনে এসেছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ ও বিতর্কিত বিষয় হলো, যখন মেলা কমিটির ক্যাডাররা সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয়ে ধাক্কাধাক্কি ও মোবাইল কেড়ে নিচ্ছিল, তখন মেলায় ডিউটিতে থাকা পুলিশকর্মীরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিলেন।
চোখের সামনে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন ও বেআইনি জুয়ার আসর চলায় সত্ত্বেও পুলিশ কোনো পদক্ষেপ তো দূরে থাক, সংবাদকর্মীদের ন্যূনতম নিরাপত্তাও দেয়নি। ঘটনার আকস্মিকতায় এক সংবাদকর্মী মেলা কমিটির কর্মকর্তাদের সরাসরি প্রশ্ন করেন, এখানে কি ঝাণ্ডি-মুণ্ডা জুয়া খেলার কোনো প্রশাসনিক অনুমতি বা পারমিশন আছে? এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সৌজন্যটুকু দেখায়নি মেলা কমিটি, উল্টে প্রশ্ন শুনেই তারা আরও বেশি আগ্রাসী হয়ে ওঠে এবং টানাটানি ও হাতাহাতি শুরু করে।
এই পুরো ঘটনা ঘিরে চরম ক্ষোভ ফুটে উঠেছে কাছাড়ের সচেতন নাগরিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে। তাদের বক্তব্য, একজন সাংবাদিকের অপরাধ কি শুধু সততার সঙ্গে তথ্য তুলে ধরা? অবৈধ জুয়ার ভিডিও করা কি অপরাধ? যেখানে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যে কোনো ধরনের জুয়া বা অসামাজিক কার্যকলাপ বরদাস্ত করবেন না বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, সেখানে পুলিশের সামনে কী করে এক শ্রেণীর রাজনৈতিক প্রভাবশালী এই বেআইনি ব্যবসা চালায়?
বুদ্ধিজীবীদের মতে, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও মেলা কমিটির মধ্যে গভীর যোগসাজশ না থাকলে এভাবে প্রকাশ্যে পুলিশের উপস্থিতিতে বেআইনি জুয়া চালানো এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা করা সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন নীরব ভূমিকা আজ পুরো পুলিশ প্রশাসনকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
শালচাপড়ার মতো একটি এলাকায় আনন্দ মেলার নামে এই রূপ জুয়ার আখড়া এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের চেষ্টার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে সর্বস্তরের মানুষ। স্থানীয় জনগণের দাবি, অনতিবিলম্বে শালচাপড়া আনন্দ মেলার এই অবৈধ ঝাণ্ডি-মুণ্ডা জুয়ার আসর বন্ধ করতে হবে।
পাশাপাশি সংবাদকর্মীদের ওপর চড়াও হওয়া বিধায়ক-ঘনিষ্ঠ ওই দুষ্কৃতীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে এবং দায়িত্বে গাফিলতি ও নীরব ভূমিকা পালনকারী পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এখন দেখার বিষয়, সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভ এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলার পর জেলা প্রশাসন ও রাজ্য পুলিশ প্রধান কী পদক্ষেপ নেন, নাকি রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে আইনি ব্যবস্থা যথারীতি নতিস্বীকার করে থাকবে!




