বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ স্বাধীনতার দীর্ঘ সাড়ে সাত দশক পরেও বরাক উপত্যকার বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে আজও মানুষের মৌলিক অধিকার ও বেঁচে থাকার ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাগুলি অধরা রয়ে গেছে। হাইলাকান্দি জেলার মোহনপুর পার্ট-IV এলাকার সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত বঞ্চনা ও দীর্ঘদিনের না পাওয়ার যন্ত্রণা অবশেষে জোরালোভাবে আছড়ে পড়ল প্রশাসনের দরবারে।
এলাকার স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর বেহাল দশা এবং সর্বগ্রাসী বন্যার কবল থেকে জীবন-জীবিকা রক্ষার স্থায়ী দাবিতে ড. শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী ট্রাস্ট এর উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের শীর্ষ আধিকারিকদের নিকট পৃথক দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। এই যুগান্তকারী পদক্ষেপে নতুন করে আশার আলো দেখছেন এলাকার অবহেলিত গ্রামবাসী।
মোহনপুর পার্ট-IV এলাকার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসা পরিষেবা আজও কতটা ভঙ্গুর, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। সামান্য জ্বর-জারি বা প্রসূতি মায়ের জরুরি চিকিৎসার জন্য মাইলকে মাইল পাড়ি দিয়ে জেলা সদরে ছুটতে হয় এই অঞ্চলের মানুষকে। এই চরম চিকিৎসাগত বঞ্চনার অবসান ঘটাতে ড. শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী ট্রাস্টের একটি প্রতিনিধিদল হাইলাকান্দির স্বাস্থ্য পরিষেবার কর্ণধার, জয়েন্ট ডিরেক্টর অফ হেলথ সার্ভিস ড. এম. আই. বারভুইয়া-র সঙ্গে সাক্ষাত করেন এবং তাঁর হাতে একটি জোরালো স্মারকলিপি তুলে দেন।
স্মারকলিপিতে স্পষ্টভাবে দাবি জানানো হয়েছে যে, মোহনপুর পার্ট-IV এলাকার সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা সহজলভ্য করার লক্ষ্যে অবিলম্বে একটি নতুন ‘হেলথ সাব-সেন্টার’ অনুমোদন ও স্থাপন করা হোক। স্মারকলিপি গ্রহণের পর স্বাস্থ্য দপ্তরের যুগ্ম নির্দেশক বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেন। তিনি ট্রাস্টের প্রতিনিধিদের আশ্বস্ত করে জানান যে, সরকারি নির্ধারিত নিয়ম ও প্রক্রিয়ার আওতায় বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দ্রুত উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট উচ্চতর দপ্তরের নিকট প্রস্তাব পাঠিয়ে দেবেন।
চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি মোহনপুর পার্ট-IV এলাকার মানুষের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিধ্বংসী বন্যা। প্রতি বছর বর্ষার মরশুমে উত্তাল নদীর জলরাশি গ্রাস করতে উদ্যত হয় এই জনপদটিকে। এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের দাবিতে ট্রাস্টের পক্ষ থেকে ফ্লাড কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্টের চিফ ইঞ্জিনিয়ার এর কাছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
দাবিপত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উত্তর মোহনপুর জুনিয়র বেসিক স্কুল থেকে শ্রী জলিল চৌধুরীর বাড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত ফ্লাড কন্ট্রোল এমব্যাঙ্কমেন্ট (এন্ড বান্ড)বা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটির বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত বিপজ্জনক। বাঁধের বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এলাকার শত শত বসতবাড়ি, হাজার হাজার বিঘা উর্বর কৃষিজমি, যোগাযোগ রক্ষাকারী রাস্তাঘাট এবং কোমলমতি শিশুদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আজ চরম ঝুঁকির মুখে। সাময়িক জোড়াতালি দিয়ে এই বাঁধ রক্ষা করা অসম্ভব, তাই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সমাধান।
ট্রাস্টের এই সার্থক ও জোরালো প্রচেষ্টার সামনে নতি স্বীকার করে চিফ ইঞ্জিনিয়ার মহোদয় অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে সমস্ত বিবরণ শোনেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, আসন্ন দুর্গাপূজার উৎসবের ঠিক পরেই দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রবীণ আধিকারিক এবং বিশেষজ্ঞ টেকনিক্যাল টিমকে সঙ্গে নিয়ে তিনি নিজে সরেজমিনে মোহনপুরের ওই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করবেন। স্থানীয় গ্রামবাসীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনার পরেই প্রয়োজনীয় ও দ্রুততম সময়ে স্থায়ী মেরামতের কাজ শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
ড. শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী ট্রাস্টের পক্ষ থেকে এক প্রেস বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, মোহনপুর তথা সমগ্র হাইলাকান্দি জেলার সাধারণ মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্য, জীবনের নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে আপস করা হবে না। প্রশাসনের দ্বারে কড়া নেড়ে মানুষের নায্য অধিকার ছিনিয়ে আনার এই লড়াই ভবিষ্যতেও অবিরাম গতিতে চালিয়ে যাবে ট্রাস্ট।
এখন দেখার বিষয়, স্বাস্থ্য দপ্তর ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের কর্তাব্যক্তিরা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়ানোর পরিবর্তে কতটা দ্রুত বাস্তবে এই জনহিতকর কাজগুলি রূপায়ণ করেন। বরাক উপত্যকার মানচিত্রে এই অবহেলিত জনপদের ভাগ্যের চাকা কবে ঘোরে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে মোহনপুরবাসী।





