১ মাসের মধ্যে ৭০০ মুসলিম মাইমাল পরিবারের সদস্যপদ ও গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৬ আগষ্টঃ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম জলভূমি শনবিলের বিশাল জলরাশি কোনোদিন তার বুক চিরে মাছ ধরা মৎস্যজীবীদের ধর্মে ধর্মে ভাগ করেনি। শতক ধরে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নামতেন এই বিলে। সেই সহাবস্থানের ঐতিহ্যে ভর করেই ১৯৭৫ সালে আজ থেকে প্রায় ৫১ বছর আগে গঠিত হয়েছিল ‘শনবিল ফিশারম্যান সমবায় সমিতি’। কিন্তু যে বিল প্রকৃতি সবাইকে সমানভাবে বিলিয়ে দিয়েছিল, সেখানে অসম সরকারের সমবায় বিভাগ যে সাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যমূলক বিভাজনের বিষবৃক্ষ রোপণ করেছিল, গৌহাটি হাইকোর্টের চাবুকে তা গুঁড়িয়ে গেল।
সম্প্রতি গৌহাটি হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতি সঞ্জয় কুমার মেধীর একক বেঞ্চ মূল রিট পিটিশন (WP(C) 5562/2018) এর এক ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন। আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, মুসলিম মাইমাল মৎস্যজীবীদের সমবায় সমিতি থেকে বহিষ্কার করা ছিল সম্পূর্ণ অন্যায়, বেআইনি এবং চরম বৈষম্যমূলক। সরকারি সেই বিতর্কিত নোটিফিকেশন বাতিল করে হাইকোর্ট অসম সরকারকে কড়া নির্দেশ দিয়েছে,
আগামী ১ মাসের মধ্যে বহিষ্কৃত সকল মুসলিম মাইমাল মৎস্যজীবীকে শনবিল ফিশারম্যান সমবায় সমিতিতে সসম্মানে পুনর্বহাল করতে হবে। তবে আদালতের এই জয় যতটা আনন্দের, তার পেছনের দীর্ঘ ইতিহাস রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা ও প্রশাসনিক কদর্যতাকে ততটাই কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।
স্থানীয় কালীবাবাড়ি বাজারে কার্যালয় থাকা এই সমবায় সমিতি গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল শনবিলের মাছ ধরা ও তার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু এক রাতে অসম সরকারের সমবায় বিভাগ এক বিতর্কিত নোটিফিকেশন জারি করে। রাতারাতি নির্দেশ দেওয়া হয়, শুধুমাত্র তফসিলি হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরাই এই সমবায় সমিতি চালাতে পারবেন।
এর সরাসরি কোপ পড়ে শনবিলের পূর্ব পারের দেওদ্বার, তুলাকোনা, ছড়ারপার, রংপুর, শিংগুয়া, ও বালির বন্দ প্রভৃতি গ্রামের প্রায় ৭০০ জন মুসলিম (মাইমাল) মৎস্যজীবীর ওপর। এক কলমের খোঁচায় সমিতির ভোটার তালিকা ও মূল রেকর্ড থেকে কেটে দেওয়া হয় তাঁদের নাম। শতাব্দী ধরে যে বিলে মাছ ধরে তাঁদের সংসার চলত, সেই বিলের ওপর মৌলিক অধিকার হারিয়ে গৃহহীন হওয়ার উপক্রম হন তাঁরা।
প্রশ্ন উঠছে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সমবায় সমিতির মতো অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কীভাবে নাগরিকের অধিকার কেড়ে নেওয়া সম্ভব হলো? ভোটের রাজনীতি আর কায়েমি স্বার্থ চরিতার্থ করতেই কি প্রশাসনিক ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করা হয়েছিল?
বহিষ্কৃত হওয়ার পর বছরের পর বছর ধরে এই নিরূপায় মৎস্যজীবীরা স্থানীয় বিধায়ক, সাংসদ ও মন্ত্রীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। কিন্তু রাজনেতাদের প্রতিশ্রুতি আর মিথ্যা আশ্বাস ছাড়া তাঁদের কপালে কিছুই জোটেনি। ভোটের বাক্সে মাইমালদের ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করা রাজনৈতিক দলগুলো শেষ পর্যন্ত মৎস্যজীবীদের এই হাহাকারে কান দেয়নি।
অবশেষে কোনো উপায় না দেখে ২০১৮ সালে অধিকার ফিরে পেতে গৌহাটি হাইকোর্টে রিট পিটিশন (WP(C) 5562/2018) দায়ের করেন ভুক্তভোগীরা। এর মধ্যেই মুসলিম সদস্যদের নাম বাদ দিয়ে তড়িঘড়ি করে সমিতির ‘বোর্ড অফ ডিরেক্টরস’ গঠনের নির্বাচন ডাকার চক্রান্ত শুরু হয়। সেই চক্রান্ত রুখতে ২০২০ সালে অপর একটি রিট পিটিশন (WP(C) 544/2020) দায়ের করা হলে আদালত চূড়ান্ত মামলা নিষ্পত্তির আগে নির্বাচন বন্ধের অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করে। ২০২০ সাল থেকে আজ অবধি সেই কারণে বন্ধ রয়েছে সমিতির নির্বাচন।
হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতি সঞ্জয় কুমার মেধী তাঁর চূড়ান্ত রায়ে অসম সরকারের অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেন। সরকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেওয়ার পর এখন হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে সমবায় বিভাগ কাজ শুরু করেছে। এই দীর্ঘ ও জটিল আইনি লড়াইয়ে মুসলিম মাইমাল সম্প্রদায়ের পক্ষে জোরদার ও বলিষ্ঠ সওয়াল করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রহিম তালুকদার।
তাঁর যুক্তিপূর্ণ ও ধারালো আইনি লড়াইয়ের ফলেই আজ ৭০০ পরিবার তাদের জীবন-জীবিকার অধিকার ফিরে পেতে চলেছে। রায়ের পর দেওদ্বার, তুলাকোনা, ছড়ারপারসহ সমগ্র শনবিল অঞ্চলে খুশির লহর বয়ে যাচ্ছে, এবং ভুক্তভোগী মৎস্যজীবীরা তাঁদের আইনজীবী রহিম তালুকদারকে অশেষ সাধুবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
হাইকোর্টের এই নির্দেশ নিঃসন্দেহে আইনের শাসনের বড় জয়। তবে কেবল সমবায় সমিতিতে নাম পুনর্বহাল করলেই কি দীর্ঘ বছরগুলোর অর্থনৈতিক ক্ষতি ও মানসিক নির্যাতনের অবসান ঘটবে? প্রশাসনের যে আধিকারিকরা সংবিধান লঙ্ঘন করে এই বৈষম্যমূলক নোটিফিকেশন জারি করেছিলেন, তাঁদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা উচিত।
একই সঙ্গে যে সমস্ত নেতারা মৎস্যজীবীদের এই সংকটকে ঝুলিয়ে রেখে রাজনৈতিক ফায়দা তুলেছেন, তাঁদের বিচারও জনগণের আদালতে হওয়া প্রয়োজন। শনবিলের জলধারা প্রমাণ করে দিল, রাজনীতি মানুষকে ভাগ করতে চাইলেও, আইনের ন্যায়বিচার শেষ পর্যন্ত মানুষের অধিকারকে ফিরিয়ে দেয়। এবার দেখার, অসম সরকার আদালতের বেঁধে দেওয়া ১ মাসের সময়সীমার মধ্যে কতটা দ্রুততার সাথে এই আদেশ বাস্তবায়ন করে।





