১৮ হাজার ভোটের জয় নিয়ে এবার আইনি আতশিকাঁচের নিচে বিজেপি সাংসদ
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৬ আগষ্টঃ করিমগঞ্জ (বর্তমান শ্রীভূমি) লোকসভা কেন্দ্রের ২০২৪ সালের নির্বাচনী লড়াই কি তবে শেষ হয়েও শেষ হলো না? ইভিএম ব্যালট বাক্সের রায় ঘোষণার পর যা স্রেফ একটি রাজনৈতিক পরাজয় মনে করা হচ্ছিল, ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে তা এবার আইনের জটিল প্যাঁচ আর তীব্র রাজনৈতিক নাটকীয়তায় রূপ নিয়েছে।
করিমগঞ্জের (বর্তমান শ্রীভূমি) বিজেপি সাংসদ কৃপানাথ মাল্লার নির্বাচনী জয়কে আইনি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বিজিত কংগ্রেস প্রার্থী হাফিজ রশিদ আহমেদ চৌধুরীর দায়ের করা মামলাটি ফের গৌহাটি হাইকোর্টে পুনরুজ্জীবিত করার নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট।
সুপ্রিম কোর্টের এই আদেশের পর থেকে অসমের রাজ্য রাজনীতিতে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিজেপির টিকিটে জিতা সাংসদ কৃপানাথ মাল্লার জয়ের আইনি বৈধতা এখন ফের গৌহাটি হাইকোর্টের তীব্র বিচার বিশ্লেষণের মুখে দাঁড়িয়েছে। গত ২৪ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জে. বি. পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে. বিনোদ চন্দ্রনের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় শোনান।
উল্লেখ্য, গৌহাটি হাইকোর্ট ২০২৫ সালের ৪ এপ্রিলের একটি আদেশে প্রক্রিয়াগত কিছু সামান্য ত্রুটির কারণ দেখিয়ে কংগ্রেস প্রার্থী হাফিজ রশিদ আহমেদ চৌধুরীর নির্বাচনী আবেদনটি প্রাথমিক পৰ্যাযেই খারিজ করে দিয়েছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের সেই খারিজের আদেশ সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে দিয়ে মামলাটি পুনরায় নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেয়।
তবে সর্বোচ্চ আদালত মামলাটি ফেরানোর পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট আইনি শর্ত জুড়ে দিয়েছে। গৌহাটি হাইকোর্টকে সবার আগে পরীক্ষা করে দেখতে হবে যে, নির্বাচনী আবেদনে বর্ণিত ‘দুর্নীতিমূলক আচরণ’ (করাপ্ট ইলেক্টোরাল প্র্যাকটিসেস) সংক্রান্ত ‘ফর্ম ২৫’ যথাযথভাবে প্রত্যয়িত বা অ্যাটেস্টেড হয়েছিল কি না। সর্বোচ্চ আদালতের বেঞ্চ মূল নথিগুলো পর্যালোচনা করে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করে যে, আবেদনকারী
সম্ভবত একজন কমিশনার অব অ্যাফিডেভিটস এর সামনে নিয়ম মেনেই শপথ নিয়ে ফর্মটি জমা দিয়েছিলেন। হাইকোর্টে যদি প্রমাণ হয় যে প্রয়োজনীয় অ্যাটেস্টেশন প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছিল, তবে গৌহাটি হাইকোর্টকে নির্বাচনী দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগগুলোর মূল বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ শুনানি পরিচালনা করতে হবে।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে করিমগঞ্জ কেন্দ্র থেকে কংগ্রেস প্রার্থী হাফিজ রশিদ আহমেদ চৌধুরীকে পরাজিত করে সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন বিজেপির কৃপানাথ মাল্লা। তবে ফলাফল প্রকাশের পরপরই বিজয়ী প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে অসদুপায় ও ‘দুর্নীতিমূলক আচরণ’ এর গুরুতর অভিযোগ তুলে তাঁর জয়কে চ্যালেঞ্জ জানান কংগ্রেস প্রার্থী।
আইনি লড়াইয়ের শুরুতেই বিজেপি সাংসদ কৃপানাথ মাল্লা মামলাটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তীব্র আপত্তি তোলেন। জনপ্রতিনিধিত্ব আইন (রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অ্যাক্ট, ১৯৫১)এর নির্ধারিত বিধির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মাল্লার আইনজীবী দাবি করেন, মামলা জমা দেওয়ার পদ্ধতি, বিভিন্ন পেজের অ্যাটেস্টেশন এবং কয়েকটি পেজ অনুপস্থিত থাকার মতো একাধিক প্রক্রিয়াগত বড় ত্রুটি রয়েছে। এই কারণে মামলাটি শুরুতেই খারিজের আবেদন করেছিলেন বিজেপি সাংসদ।
কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশের ফলে বিজেপির সেই প্রাথমিক স্বস্তি সাময়িকভাবে হলেও থমকে গেল এবং মামলাটি নতুন করে বিচারের পথে হাঁটল। সুপ্রিম কোর্ট তার পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, নির্বাচনী আবেদনে ‘দুর্নীতিমূলক আচরণের’ অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর বিষয় এবং একে কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
আদালতের বক্তব্য, যদি কোনও জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে নির্বাচনী দুর্নীতি বা অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়, তবে আইন অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। কেবল জয় বাতিলই নয়, সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে সর্বোচ্চ ৬ বছর পর্যন্ত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অযোগ্য ঘোষণা করার বিধান রয়েছে।
এই কারণেই সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য, এই ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনের প্রক্রিয়াগত নিয়ম যেমন অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলা প্রয়োজন, তেমনই সামান্য কারিগরি ভুলের অজুহাতে মামলা বন্ধ করাও অনুচিত। সর্বোচ্চ আদালত জানিয়েছে, শুধুমাত্র ‘মোটামুটি নিয়ম মেনে চলা হয়েছে’ (সাবস্ট্যানশিয়াল কমপ্লায়েন্স)এমন যুক্তি দিয়ে সব ক্ষেত্রে ভুল ঢাকা না গেলেও, যদি শপথ গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কোনো ছোটখাটো ত্রুটি প্রার্থীকে বিভ্রান্ত না করে বা তথ্যের বিকৃতি না ঘটায়, তবে সেটিকে মামলার পথে চিরতরে বাধা হিসেবে দাঁড় করানো যাবে না।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর গৌহাটি হাইকোর্ট এখন সর্বাগ্রে ‘ফর্ম ২৫’ এর অ্যাটেস্টেশনের আইনি বৈধতা পরীক্ষা করবে। যদি এই প্রত্যয়ন আইনি মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়ে যায়, তবে কৃপানাথ মাল্লার জয়ের বিরুদ্ধে কংগ্রেস প্রার্থীর আনা দুর্নীতিমূলক আচরণের অভিযোগগুলোর শুনানি শুরু হবে।
এই রায়ের ফলে করিমগঞ্জের রাজনীতিতে বইছে তীব্র উত্তেজনার হাওয়া। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে কংগ্রেস ক্যাম্প যখন আইনি লড়াইয়ে নতুন অক্সিজেন পেয়ে চাঙ্গা, তখন শাসক বিজেপি শিবিরের অন্দরে তৈরি হয়েছে আইনি চিন্তার ভাঁজ। এখন দেখার বিষয়, গৌহাটি হাইকোর্টের আইনি পরীক্ষায় কি উতরে যাবেন কৃপানাথ মাল্লা, নাকি করিমগঞ্জ (বর্তমান শ্রীভূমি) লোকসভা কেন্দ্র ঘিরে তৈরি হবে নতুন কোনো রাজনৈতিক ও আইনি ইতিহাস!





