শিলচর শহরে লাইসেন্সহীন স্পা-কাণ্ডে প্রশ্নের মুখে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ ভাস্কর গুপ্তের নৈতিক অবস্থান

সম্প্রতি শিলচরের একটি অভিজাত বাণিজ্যিক ভবনে পরিচালিত দুটি স্পা-কে ঘিরে পুলিশের অভিযানের পর থেকেই শহরজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির নামও আলোচনায় উঠে আসে। যদিও তদন্তকারী সংস্থা এখনও পর্যন্ত কাউকে আদালতে দোষী সাব্যস্ত করেনি এবং তদন্ত চলমান রয়েছে, তবুও জনমনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

এই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে শিলচর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ, বিশিষ্ট চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ ভাস্কর গুপ্তের নাম। অভিযোগ অনুযায়ী, যে দুটি বাণিজ্যিক কক্ষে স্পা পরিচালিত হচ্ছিল, তার মধ্যে একটি কক্ষের মালিকানা তাঁর বা তাঁর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত। পুলিশ এখনও পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি যাতে বলা যায় যে তিনি বা তাঁর পরিবার সরাসরি ওই স্পা পরিচালনা করতেন কিংবা সেখানে চলা অভিযোগকৃত বেআইনি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তদন্তে এমন অভিযোগ উঠে এসেছে যে সংশ্লিষ্ট স্পা-টির প্রয়োজনীয় পৌর লাইসেন্স ছিল না।

এখানেই শুরু হচ্ছে জনমতের মূল বিতর্ক। একটি বাণিজ্যিক সম্পত্তির মালিক হিসেবে ভাড়াটিয়ার ব্যবসার বৈধতা যাচাই করার ন্যূনতম দায়িত্ব কি সম্পত্তির মালিকের নেই? শুধুমাত্র মাসিক ভাড়ার বিনিময়ে কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে জায়গা দিয়ে তার লাইসেন্স, অনুমোদন বা কার্যক্রম সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকা কতটা গ্রহণযোগ্য? বিশেষ করে যখন সেই সম্পত্তির মালিক একজন সরকারি মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ, তখন এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আদালতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে। কিন্তু নৈতিকতার আদালতে প্রশ্ন অনেক আগেই উঠে গেছে। সমাজের বহু বিশিষ্ট নাগরিক, অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা, চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহলের বক্তব্য, একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার কাছে শুধু আইনি নির্দোষ হওয়াই যথেষ্ট নয়, তাঁর আচরণও এমন হওয়া উচিত যাতে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা কোনোভাবেই প্রশ্নের মুখে না পড়ে।

চাকরি করার পাশাপাশি অন্যত্র বৈধ ব্যবসায় বিনিয়োগ করা বা পরিবারের সদস্যদের ব্যবসা পরিচালনা করায় কোনো আইনগত বাধা নেই। কিন্তু সেই ব্যবসা যদি পরে বিতর্ক, তদন্ত বা গুরুতর অভিযোগের কেন্দ্রে চলে আসে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নৈতিক দায় এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ সমাজ একজন সাধারণ ব্যবসায়ী ও একজন সরকারি মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষকে একই মানদণ্ডে বিচার করে না।

পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদের পর অধ্যক্ষ ও তাঁর স্ত্রীকে বেরিয়ে আসার সময় সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা এড়াতে মুখ ঢেকে দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে দেখা যায়। সেই দৃশ্য ইতোমধ্যেই জনমনে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে রয়েছেন। অনেকের মতে, যদি তাঁর কাছে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা থাকে, তাহলে সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে স্পষ্ট বক্তব্য রাখাই অধিক মর্যাদাপূর্ণ হতো। নীরবতা বা ক্যামেরা এড়িয়ে যাওয়া নানা জল্পনা-কল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে।

বিশেষ তাৎপর্যের বিষয় হলো, ঘটনাটি সামনে এসেছে এমন এক সময়ে, যখন চিকিৎসক সমাজ তাঁদের পেশার প্রতি শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতার প্রতীক হিসেবে ডক্টর্স ডে পালন করছিল। সেই দিনই একটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষকে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে দেখা এবং পরে সংবাদমাধ্যম এড়িয়ে যাওয়ার দৃশ্য চিকিৎসক সমাজের একটি বড় অংশকেও অস্বস্তিতে ফেলেছে বলে সচেতন মহলের অভিমত।

তবে এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য কোনোভাবেই কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা নয়। আদালতের আগে গণমাধ্যমের বিচারেরও কোনো স্থান নেই। আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলা যায়, তদন্ত সম্পূর্ণ হওয়ার আগে কাউকে দোষী বলা যেমন অন্যায়, তেমনি গুরুতর অভিযোগের মুখে থেকেও জনজবাবদিহির প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়াও সমানভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

সচেতন নাগরিকদের একাংশের মতে, তদন্ত শেষ হয়ে সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত ডাঃ ভাস্কর গুপ্তের নৈতিক দায়িত্ব হওয়া উচিত শিলচর মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানো বা অন্তত ছুটিতে যাওয়া। এতে তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠবে না এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিও অক্ষুণ্ণ থাকবে। অন্যদিকে, সরকার যদি পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সেটিও অস্বাভাবিক হবে না বলে মত প্রকাশ করছেন অনেকে।

সবশেষে জনসাধারণের প্রত্যাশা একটাই, সত্য উদঘাটিত হোক, দোষী হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং নির্দোষ হলে সম্মানের সঙ্গে সেই সত্যও প্রকাশ্যে আসুক। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত নৈতিক জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং জনবিশ্বাস রক্ষার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্বশীল আচরণই সময়ের দাবি। কারণ একটি মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি শুধু তাঁর নিজের নয়, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্মান, চিকিৎসা শিক্ষা এবং সমগ্র চিকিৎসক সমাজের বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। 

Related Posts

Is Cachar’s Sewa Setu Under the Grip of a Syndicate? General Citizens Allegedly Harassed by Middlemen at the Registration Office (PFC)

Allegations of Collusion Against PFC Staff as Victims Claim Transparency Has Been Replaced by Harassment Barak Bani Digital Desk,Silchar,19 July : The Assam Government introduced the Sewa Setu platform and…

Allegations of Money Collection in the Name of Hailakandi District Social Welfare Department Spark Concern

Complaint Filed at Katakhal Police Outpost Over Alleged Fraud of ₹90,500 from Several Anganwadi Workers Barak Bani Digital Desk, Hailakandi, July 8, 2026: A serious controversy has emerged surrounding the…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *