ভুয়ো ডিগ্রি কাণ্ড: শিলচরের ৫ কাউন্সিলরের বিচারে বসছে আদালত! আদালতেই কি ডুববে কাউন্সিলরদের তরী?
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১৬ অক্টোবরঃ গণতন্ত্রের উৎসবে ভোটের রায় প্রকাশের পর যেখানে আবির খেলা, মিষ্টি মুখ এবং উন্নয়নমূলক প্রতিশ্রুতি পূরণের তোড়জোড় চলার কথা ছিল, বরাক উপত্যকার প্রাণকেন্দ্র শিলচরে আজ সেখানে বইছে তীব্র রাজনৈতিক ঝড় ও আতঙ্কের হিমশীতল হাওয়া।
মিষ্টিমুখের পরেই আইনি ঝড়ের মুখে শিলচর পুরনিগম, পাঁচের পর আরও পাঁচজন আসার অপেক্ষায়
শিলচর পৌরনিগম নির্বাচনে বিপুল সমর্থন নিয়ে বিজয়ী হয়ে যেসব প্রার্থী কাউন্সিলরের চেয়ারে বসতে চলেছিলেন, আজ তাঁদের সেই জয়ের আনন্দই হঠাৎ করে বিষাদে পরিণত হয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা ও শংসাপত্রের সত্যতা নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর, অকাট্য ও অভূতপূর্ব অভিযোগে শিলচর পুরনিগমের পাঁচ নবনির্বাচিত কাউন্সিলরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন ঘোর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়েছে।
ভোটে জিতলেও আইনি বেড়াজালে আটকে পড়া তাঁদের এই জয় কি শেষ পর্যন্ত টিকবে? নাকি জাল ডিগ্রির কালিঝুল মেখে ক্ষমতার অলিন্দ থেকে চিরতরে বিদায় নিতে হবে? মামলাকারীদের জোরালো পদক্ষেপ দেখে শহরের চা-চক্র থেকে শুরু করে প্রশাসনিক মহলে এখন এই একটাই বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, আদালতেই কি ডুববে এই বিতর্কিত কাউন্সিলরদের নৌকা?
সাংবাদিক সম্মেলনে মহা-বিস্ফোরণ: জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর সব নথি পেশ
গত বুধবার (১৫ অক্টোবর) বিকেল ঠিক ৪টায় শিলচরের ঐতিহাসিক পেনশনার্স ভবনে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে মামলার দুই অভিজ্ঞ ও লড়াকু আইনজীবী সৌমেন চৌধুরী এবং প্রসেনজিৎ দেব এক বিস্ফোরক দাবি তুলে ধরেন। তাঁদের অভিযোগ, যে সমস্ত বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় কিংবা উচ্চশিক্ষার বোর্ড থেকে পাস করার নথিপত্র (Certificate & Marksheet) অভিযুক্ত কাউন্সিলররা মনোনয়নপত্রের সাথে জমা দিয়েছেন, তার একটি বড় অংশই সম্পূর্ণ ভুয়ো, মনগড়া কিংবা অস্তিত্বহীন!
নির্বাচন বাতিলের পাশাপাশি ফৌজদারি ব্যবস্থার আর্জি, একযোগে ১০টি ওয়ার্ডে উপ-নির্বাচনের মেঘ?
যাঁদের নির্বাচনী জয়কে আইনগতভাবে অবৈধ ঘোষণা করার আর্জি জানিয়ে সরাসরি আদালতে ইলেকশন পিটিশন দায়ের করা হয়েছে, সেই বিতর্কিত পাঁচ কাউন্সিলর হলেন, ১৪ নম্বর ওয়ার্ড: প্রতীক্ষা দেব, ১৫ নম্বর ওয়ার্ড: পাপলি কর্মকার, ১৬ নম্বর ওয়ার্ড: মিয়া খান, ৬ নম্বর ওয়ার্ড: কাঞ্চন দেব, ৮ নম্বর ওয়ার্ড: মোহিতোষ মণ্ডল।
আসাম মিউজিসিপ্যাল কর্পোরেশন আইন ও সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী বিধির অধীনে দায়ের করা এই মামলায় শুধু বিজয়ী প্রার্থীদেরই নয়, বরং সমগ্র নির্বাচন ব্যবস্থার উচ্চপদস্থ কর্তাদেরও বিবাদী করা হয়েছে। বিবাদীদের তালিকায় রয়েছেন, অসম রাজ্য নির্বাচন কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার, কাছাড়ের জেলা রিটার্নিং অফিসার, সংশ্লিষ্ট সহকারী রিটার্নিং অফিসার, পৌর প্রশাসন অধিকর্তা, শিলচর পুরনিগমের কমিশনার সংশ্লিষ্ট ৫ জন নির্বাচিত বিতর্কিত প্রার্থী। বুধবারই আদালত চত্বরে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মামলাগুলো আনুষ্ঠানিক নথিভুক্ত করা হয়েছে, যা এই বিতর্ককে আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গেল।
আইনজীবীর তীক্ষ্ণ প্রশ্ন! তামিল ভাষার শংসাপত্র! কাউন্সিলর মহোদয় কি দুটি তামিল বাক্য বলতে পারবেন?
সাংবাদিক সম্মেলনে আইনজীবী সৌমেন চৌধুরী নথি হাতে নিয়ে যেভাবে একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন, তা শুনলে চমকে যেতে হয়। তাঁর সোজা দাবি, ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত কাউন্সিলর প্রতীক্ষা দেব যে স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেছেন বলে সরকারি হলফনামায় উল্লেখ করেছেন, সেই নামে কোনো বিদ্যালয়ের বাস্তব অস্তিত্ব বা সন্ধান তাঁরা বহু খোঁজাখুঁজি করেও পাননি!
অন্যদিকে, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কাঞ্চন দেবের নথিপত্র সংক্রান্ত অসঙ্গতি নিয়ে আরও এক চরম হাস্যকর ও চাঞ্চল্যকর সত্য সামনে আনেন আইনজীবী। কাঞ্চন দেব দাবি করেছেন যে তিনি তামিলনাড়ুতে পড়াশোনা করেছেন এবং তাঁর শিক্ষাগত নথিতে ‘এমআইএল’ হিসেবে তামিল বিষয় উল্লেখ রয়েছে। এই অবিশ্বাস্য দাবির প্রেক্ষিতে আইনজীবী সৌমেন চৌধুরী সাংবাদিকদের সামনেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, সাংবাদিকদের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, আপনারা দয়া করে সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলর কাঞ্চন দেব মহাশয়কে মাইকের সামনে তামিল ভাষায় অন্তত কয়েকটি সহজ বাক্য বলতে বলুন! তবেই দুধের দুধ আর জলের জল পরিষ্কার হয়ে যাবে।
১৪ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থীর স্কুলের কোনো অস্তিত্বই নেই! চাঞ্চল্যকর সব তথ্য তুলে ধরলেন আইনজীবীরা
আইনজীবীদের স্পষ্ট বক্তব্য, অভিযুক্ত কাউন্সিলররা আদালত বা সমাজের সামনে নিজেদের জমা দেওয়া নথির অকাট্য সত্যতা কোনো অবস্থাতেই প্রমাণ করতে পারবেন না। এই চরম অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ সামনে আসার পর সাধারণ মানুষের আঙুল এখন সরাসরি নির্বাচন পরিচালনাকারী আধিকারিকদের দিকে। মনোনয়নপত্র স্কুটিনি বা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য যখন একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়, তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকরা কী করছিলেন?
শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত নথিগুলো কি কেবল ওপর ওপর চোখ বুলিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল? কোনো অজানা অদৃশ্য চাপ কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই কি যাচাইকরণের প্রক্রিয়ায় এই চোখ ধাঁধানো অন্ধত্ব? যদি সামান্য একটি সাধারণ নথিতে ভুল থাকলে একজন আমজনতার আবেদন বাতিল হতে পারে, তবে জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে এই বিশাল জালিয়াতি কেন আধিকারিকদের চোখে ধরা পড়ল না? আইনজীবী সৌমেন চৌধুরীর স্পষ্ট প্রশ্ন, “নির্বাচন কমিশন কীভাবে এই ধরনের সুস্পষ্ট ভুয়া সার্টিফিকেটে সরকারি সিলমোহর দিল?” এই প্রশ্নটি এখন গোটা শিলচর শহরের প্রশাসনের বিশ্বস্ততাকে বড়সড় ঝাঁকুনি দিয়েছে।
ভোট শেষ হলেও শেষ হয়নি লড়াই, বাতিল হতে পারে জয়ের বৈধতা, শপথে ঝুলছে আইনি তরবারি
এই মামলার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ও নাটকীয় মোড় হলো, মামলাকারীরা আদালতে কেবল নির্বাচন বাতিল বা পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েই ক্ষান্ত হননি; মামলার চূড়ান্ত নিস্পতি না হওয়া পর্যন্ত এই ৫ জন কাউন্সিলর যাতে শপথ গ্রহণ করতে না পারেন, সেই বিষয়ে কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞার আর্জি জানিয়েছেন। এর অর্থ দাঁড়ায়, ভোটে জয়ী হয়ে ব্যানার-পোস্টার লাগালেও সরকারি পদে বসে ক্ষমতা ভোগ করার যে স্বপ্ন তাঁরা দেখছিলেন, আইনি স্থগিতাদেশ এলে তা শুরুতেই ধুলিসাৎ হয়ে যাবে। আইনজীবী সৌমেন চৌধুরী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মামলায় অভিযুক্তদের জালিয়াতি প্রমাণিত হলে তাঁদের জনপ্রতিনিধিত্বের পদ তো বাতিল হবেই, পাশাপাশি প্রতারণা ও জাল নথি তৈরির অপরাধে ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে জেল-জরিমানাও হতে পারে।
শিলচরের সুশীল সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের ক্ষোভ: দাবানলের মতো ছড়াচ্ছে অসন্তোষ
ভোটের লড়াই সাধারণ ইভিএম মেশিনের বোতাম টিপেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু শিলচর পৌরনিগমের ক্ষেত্রে এই জালিয়াতি রাজনীতির নোংরা মুখটিকে আমজনতার সামনে উন্মোচিত করে দিয়েছে। মামলাকারীরা ইতিমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, এই ৫ জনের পর আরও অন্তত ৫ জন নির্বাচিত কাউন্সিলরের নথিপত্র স্ক্যান করা হচ্ছে এবং খুব শীঘ্রই তাঁদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ইলেকশন পিটিশন দাখিল হতে চলেছে।
যেখানে শিক্ষার সনদই নকল, সেখানে উন্নয়ন কতটা খাঁটি? পুরনিগমের ভবিষ্যৎ নিয়ে ঘোর শঙ্কা
শিলচরের সচেতন নাগরিক ও বুদ্ধিজীবী মহলের মতে, একজন জনপ্রতিনিধি হওয়ার প্রাথমিক শর্তই হলো সততা ও নৈতিকতা। যারা নিজেদের শিক্ষার প্রমাণপত্র তৈরিতেই জালিয়াতির আশ্রয় নেয়, তারা কীভাবে একটি ওয়ার্ডের উন্নয়ন, জনসেবা এবং সরকারি কোটি কোটি টাকার বরাদ্দের তদারকি করবে?
শিলচরের মানুষ আজ লজ্জিত ও ক্ষুব্ধ। রাজনীতির লড়াই এখন আদালত কক্ষে রূপান্তরিত হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আদালত প্রাঙ্গণে মামলাকারীরা তাঁদের আনা অভিযোগের পক্ষে কী কী অকাট্য প্রমাণ পেশ করেন এবং মহামান্য আদালত এই ভুয়ো ডিগ্রিধারী কাউন্সিলরদের বিরুদ্ধে কী কঠোর ঐতিহাসিক রায় প্রদান করে!





