লক্ষ্মীপুরে ভুয়া অফিসার সেজে বাড়িতে হানা! জনতার হাতে ধরা পড়ল কুখ্যাত প্রতারক

ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্তকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে এলেও, পুলিশের এই নরম মনোভাব ও লিখিত মামলা দায়ের না করার প্রবণতা নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দানা বাঁধছে। স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত চাঞ্চল্যকর বিবরণ অনুযায়ী, ধৃত সানা সিংহের বাড়ি পার্শ্ববর্তী বিন্নাকান্দি প্রথম খণ্ড গ্রামে। কিন্তু তার হাবভাব ও চালচলন ছিল এক নিখাদ পেশাদার অপরাধীর মতো। সুবেশী ও মার্জিত পোশাক পরিধান করে সে এলাকায় ঘুরে বেড়াত যাতে কেউ তাকে সহজে সন্দেহ করতে না পারে। নিজেকে এক ক্ষমতাশালী ‘সরকারি অফিসার’ হিসেবে জাহির করে সে ডাক্তারবাগান এলাকার এক অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের এক যুবকের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

অভিযোগ, সরকারি কার্য্যালয়ে আধিকারিক পদে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে সে প্রথমে ওই যুবকের সমস্ত দরকারি শিক্ষাগত ও ব্যক্তিগত নথিপত্র হোয়াটসঅ্যাপের মারফতে হাতিয়ে নেয়। এরপরই শুরু হয় ব্ল্যাকমেইলের আসল খেলা। আজ হঠাৎ করেই ওই যুবকের বাড়িতে সোজাসুজি চড়াও হয় সানা। নিজেকে প্রভাবশালী অফিসার দাবি করার পাশাপাশি পুলিশ ও প্রশাসনের খড়্গ নামানোর ভয় দেখিয়ে গরিব পরিবারটির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে বসে। দিনমজুর বা প্রান্তিক ওই পরিবারের পক্ষে এই অনৈতিক ও বেআইনি দাবি মেনে নেওয়া অসম্ভব ছিল। স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের লোকজনের সন্দেহ দানা বাঁধে এবং তারা বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবেশীদের জানান।

মুহূর্তের মধ্যে আশপাশের শত শত মানুষ একত্রিত হয়ে অভিযুক্ত সানা সিংহকে ঘিরে ফেলে এবং আটকে রাখে। এ সময় উত্তেজিত জনতা তার কাছ থেকে একটি সন্দেহজনক ডায়েরি এবং একটি পরিচয়পত্র উদ্ধার করে। জানা যায়, উদ্ধার হওয়া ওই পরিচয়পত্রটি ‘নিউ লাইফ ফাউন্ডেশন’ নামের একটি রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের, যেখানে তার নাম স্পষ্টাক্ষরে সানা সিংহ বলেই উল্লেখ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগের পরিধি এতটাই দীর্ঘ যে, সানা সিংহের এই প্রতারণা বা অপরাধপ্রবণতা আজকের নয়। এর পেছনে রয়েছে অন্ধকার এক ইতিহাস।

এলাকাবাসীর স্মৃতি হাতড়ালে বেরিয়ে আসে আরও এক শিহরিত করার মতো তথ্য, গত সদ্যসমাপ্ত দুর্গাপূজার ঠিক আগের রাতেও এই একই যুবক ডাক্তারবাগান এলাকার একটি স্থানীয় দোকানে গিয়ে হানা দিয়েছিল। সে সময়েও সে একটি নির্দিষ্ট ঠিকানা খোঁজার ছুতোয় দোকানে ঢুকেছিল। দোকানদার যখন জানান যে ওই নামে কেউ সেখানে নেই, তখন সে পকেট থেকে বিভিন্ন ভুয়া নথিপত্র বের করে নিজেকে প্রশাসনের অত্যন্ত ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হিসেবে জাহির করার চেষ্টা চালায় এবং আচমকাই টাকা দাবি করে বসে।

দোকানদার যখন তার অনৈতিক দাবি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেন, তখন সে দোকানে হুলুস্থুল কাণ্ড ও মারমুখী পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। বেগতিক বুঝে দোকানদার তাকে যখন দোকান থেকে বের করে ঝাঁপ ফেলে দেন, তখনও তার উন্মত্ততা থামেনি। আশপাশের গণ্যমান্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সামনে সে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে এবং পুলিশ ও প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে হঠাৎ পকেট থেকে একটি বন্দুক বের করে গোটা এলাকায় চরম আতঙ্ক ও ত্রাসের সৃষ্টি করে। সাধারণ মানুষ তখন জীবনভয়ে সিঁটিয়ে গিয়েছিলেন।

সৌভাগ্যবশত, সেই মুহূর্তে তার নিজের গ্রামেরই দুজন ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা ওই কুখ্যাত যুবককে চিনতে পেরে সাহসিকতার পরিচয় দেন এবং তাকে চড়-থাপ্পড় মেরে শাসন করার পাশাপাশি তার হাত থেকে ওই আগ্নেয়াস্ত্রটি কেড়ে নিয়ে দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে ফেলেন। পরবর্তীতে চাঞ্চল্যকর এই সত্য সামনে আসে যে, সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার জন্য সে যে বন্দুকটি ব্যবহার করেছিল, তা আদতে একটি ‘খেলনা বন্দুক’ ছিল! খেলনা বন্দুকের আড়ালে এই ধরনের ভয়ানক মানসিকতার অপরাধীরা কীভাবে দিনের পর দিন ঘুরে বেড়ায়, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, দুর্গাপূজার রাতের সেই ঘটনার মতো আজও সানা সিংহ চরম মাদকাসক্ত ও নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিল। উত্তেজিত জনতা যখন তাকে ঘিরে ফেলে এবং আটকে রাখে, তখন সে নিজেকে বাঁচানোর ফন্দি হিসেবে বারবার মদ খাওয়ার অজুহাতে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার ভান করতে থাকে। লক্ষীপুর পুলিশও পরবর্তীতে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানিয়েছে যে, প্রাথমিক তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে যে যুবকটি তীব্র মাদকাসক্তির আয়েশেই এমন জঘন্য ক কাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে। কিন্তু ডাক্তারবাগান এলাকার সচেতন নাগরিকদের মূল ক্ষোভ অন্য জায়গায়।

পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে যুবকটিকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে থানায় আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো লিখিত মামলা দায়ের করা হয়নি বলে অভিযোগ। এলাকার বুদ্ধিজীবী ও ভুক্তভোগী মানুষের সাফ কথা, পুলিশের এই নরম মনোভাব বা ঢিলেঢালা নীতি অপরাধীদের আরও বেশি উৎসাহিত করবে। পরপর দুবার একই ব্যক্তি নেশার ঘোরে জনবহুল এলাকায় মারাত্মক অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালাল,

আগ্নেয়াস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা করল, তার পরেও যদি তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে আগামী দিনে সে আরও বড় কোনো অপরাধ বা মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে। নেশার অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে বেকার যুবক-যুবতীদের স্বপ্ন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এই অপচেষ্টাকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়া যায় না।

আজকের এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল যে, কীভাবে কিছু অসাধু ও মাদকাসক্ত যুবক ভুয়া পরিচয়ের আড়ালে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাদের সর্বস্বান্ত করার চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। বেকারত্বকে হাতিয়ার করে ভুয়া চাকরির প্রলোভন দেখানো এবং পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেল করার এই ব্যাধি সমাজের ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। ডাক্তারবাগানের ভুক্তভোগী মানুষ ও সচেতন নাগরিক সমাজ একযোগে দাবি তুলেছেন যে, অবিলম্বে এই ধৃত সানা সিংহের অতীত রেকর্ড খতিয়ে দেখা হোক এবং তার নেপথ্যে অন্য কোনো বড় চক্র বা কোনো রাঘববোয়াল যুক্ত আছে কি না, তা খুঁজে বের করতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হোক।

শুধু তাই নয়, পুলিশ প্রশাসনকে সমস্ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে কঠোরতম ধারায় মামলা রুজু করে এই প্রতারককে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে। এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে এই ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে আপসহীন পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিই এখন জোরালো হয়ে উঠেছে গোটা লক্ষীপুর জুড়ে।

Related Posts

কালাইন উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভুতুড়ে কাণ্ড!

‘মিশন ৩০’-এর ত্রাস কাটাতে কালাইনে ছাঁটাইয়ের ফন্দি? ফরম ফিলাপ থেকে বঞ্চিত দুই শতাধিক পড়ুয়া! বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৪ নভেম্বরঃ পরীক্ষার ফলাফল ভালো করার মহৎ উদ্দেশ্য, নাকি নিজেদের প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঢাকতে…

ভুয়া ডিগ্রির কলঙ্ক মাথায় নিয়ে শিলচর পুরনিগমে বসার চক্রান্ত!

বিশ্ববিদ্যালয় জন্ম নেওয়ার আগেই মিলল ডিগ্রি! শিলচর পুরনিগমে চাঞ্চল্যকর ভুয়ো শংসাপত্র কাণ্ড বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৪ নভেম্বরঃ শিলচর পুর নিগমের নবগঠিত বোর্ডে বসার আগেই চরম শংসাপত্র কেলেঙ্কারী ও ভুয়ো ডিগ্রির…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *