ইপিএফও-র ১,৮১৬ কোটি বিনিয়োগে জালিয়াতির অভিযোগ
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ৩ আগষ্টঃ দেশের অন্যতম বৃহৎ অবসরভাতা তহবিল কর্মচারী ভবিষ্যনিধি সংস্থা (ইপিএসও)-র হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগকে ঘিরে সামনে এসেছে বড় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। ইপিএফও-র ১,৮১৬.২২ কোটি টাকার বিনিয়োগে কথিত জালিয়াতির অভিযোগে রিলায়েন্স ক্যাপিটাল লিমিটেড, সংস্থার প্রাক্তন চেয়ারম্যান অনিল ডি. আম্বানি, কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় সরকারি কর্মচারী এবং অন্যান্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই)।
শনিবার (১ আগস্ট, ২০২৬) সিবিআই জানায়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রকের অধীন কর্মচারী ভবিষ্যনিধি সংস্থা (ইপিএসও)-র অভিযোগের ভিত্তিতেই এই প্রথম তথ্য প্রতিবেদন (এফআইআর) নথিভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ইপিএফও-র বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগের অর্থ সুরক্ষিত থাকার কথা থাকলেও পরবর্তীতে আর্থিক অনিয়ম, প্রতারণামূলক লেনদেন এবং তহবিল অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিবিআইয়ের নথি অনুযায়ী, তদন্তাধীন আর্থিক অনিয়মের পরিমাণ ১,৮১৬.২২ কোটি। এর মধ্যে মূল বিনিয়োগের পরিমাণ ১,০০৭.৫৫ কোটি, আর সুদ সহ দায়বদ্ধতার পরিমাণ ৮০৮.৬৭ কোটি।
এই মামলায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, প্রতারণা, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ এবং অপরাধমূলক অসদাচরণ সংক্রান্ত বিভিন্ন ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, বিষয়টি শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে ফেলার অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে রিলায়েন্স ক্যাপিটাল লিমিটেড সুরক্ষিত নন-কনভার্টিবল ডিবেঞ্চার ইস্যু করে। সেই ডিবেঞ্চারগুলিতে ইপিএফও চারটি পোর্টফোলিও ম্যানেজারের মাধ্যমে মোট ২,৫০০ কোটি বিনিয়োগ করে। এই পোর্টফোলিও ম্যানেজারদের মধ্যে রিলায়েন্স ক্যাপিটাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড-ও ছিল।
এই এনসিডিগুলির মেয়াদ ২০২৩ ও ২০২৪ সালে পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত দেওয়ার পরিবর্তে সংস্থার ভেতরে প্রতারণামূলক আর্থিক লেনদেন এবং তহবিল অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কারণে রিলায়েন্স ক্যাপিটাল এনসিডি রিডিম করতে ব্যর্থ হয়। এর ফলেই ইপিএফও-র বিপুল অঙ্কের অর্থ আটকে যায়।
তদন্তকারী সংস্থা জানিয়েছে, মামলায় জড়িত প্রত্যেকের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে। সরকারি কর্মচারী, বেসরকারি সংস্থার আধিকারিক কিংবা অন্য কোনও ব্যক্তি যার বিরুদ্ধে প্রমাণ মিলবে, তাঁর ভূমিকাই তদন্তের আওতায় আসবে। একই সঙ্গে কথিত অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের উৎস, অর্থের প্রকৃত ব্যবহার এবং বিনিয়োগের অর্থ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়েছে, তা অনুসন্ধান করবে সিবিআই।
এদিকে, অনিল আম্বানির মুখপাত্র এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ২০০৫ সাল থেকে ২০২১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অনিল ডি. আম্বানি রিলায়েন্স ক্যাপিটাল লিমিটেডের নন-এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ও চেয়ারম্যান ছিলেন। পরে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সংস্থার পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে একজন প্রশাসক নিয়োগ করে। মুখপাত্রের দাবি, অনিল আম্বানি তাঁর বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন এবং আইন অনুযায়ী তাঁর প্রাপ্য সব অধিকার সংরক্ষণ করে রেখেছেন। তদন্তে তিনি আইনগতভাবে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করবেন বলেও জানানো হয়েছে।
রিলায়েন্স এডিএ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছিল সিবিআই। বিভিন্ন সরকারি ব্যাঙ্ক এবং লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া এর অভিযোগের ভিত্তিতে রিলায়েন্স কমিউনিকেশনস লিমিটেড, রিলায়েন্স হোম ফাইন্যান্স লিমিটেড, রিলায়েন্স কমার্শিয়াল ফাইন্যান্স লিমিটেড এবং রিলায়েন্স টেলিকম লিমিটেড-এর বিরুদ্ধে মোট সাতটি এফআইআর নথিভুক্ত হয়েছে। সিবিআই জানিয়েছে, এই মামলাগুলির মধ্যে ইতিমধ্যে চারটি চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হয়েছে এবং সাতজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মামলাগুলির তদন্ত এখনও চলমান এবং সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে তদন্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে।
ইপিএফও দেশের কোটি কোটি চাকরিজীবীর অবসরকালীন সঞ্চয়ের অন্যতম প্রধান ভরসা। ফলে এই তহবিলের বিপুল অঙ্কের অর্থ নিয়ে ওঠা জালিয়াতির অভিযোগ শুধু একটি কর্পোরেট সংস্থার বিরুদ্ধে মামলা নয়, বরং সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এখন তদন্তে কী তথ্য সামনে আসে এবং অভিযোগের সত্যতা কতটা প্রমাণিত হয়, সেদিকেই নজর থাকবে আর্থিক মহল ও সাধারণ মানুষের।





