রাস্তা নাকি অভিশাপ? ১৫ বছরেও ফিরল না কমরুল ইসলাম সড়কের ভাগ্য, প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ উন্নয়ন

বিগত পনেরো বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষের জীবন যেন থমকে আছে এই ভাঙাচোরা, গর্তে ভরা রাস্তার পঙ্কিলাবর্তে। ২০১০-১১ অর্থবছরে যখন সরকারি খাতায় কমরুল ইসলাম সড়কটি নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছিল, তখন লোকনাথপুর, আরজানপুর ও জয়দনপুরের বাসিন্দারা ভেবেছিলেন এবার বোধহয় দুর্ভোগ কাটার দিন এলো। কিন্তু সেই আনন্দ স্থায়ী হয়নি এক বছরও! স্থানীয় বাসিন্দাদের স্পষ্ট ও গুরুতর অভিযোগ, নির্মাণের শুরু থেকেই কাজের চরম নিম্নমান বজায় রাখা হয়েছিল।

পিডব্লিউডি দপ্তর এবং ঠিকাদারের মধ্যবর্তী অশুভ আঁতাতের ফলেই যে তৈরি হওয়ার মাত্র বারো মাসের মধ্যে রাস্তাটি ধসে পড়তে শুরু করে, তা আজ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। যে পিচ ঢালাইয়ের ওপর কোটি টাকা খরচ হলো, তা প্রথম বর্ষাতেই জলে ভেসে গেল কিসের জোরে? সেই প্রশ্নের উত্তর আজ ১৫ বছর পরও অস্পষ্ট।

বর্তমানে গোটা রাস্তা জুড়ে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। গর্ত বললে ভুল হবে, যেন একেকটি খাদ! সামান্য গাড়ি চললেই তা সেখানে আটকে বিকল হয়ে যাচ্ছে। ছোটখাটো যানবাহন চলাচল তো দূরে থাক, পায়ে হেঁটে যাওয়াই এখন এক দুঃসাহসিক অভিযান। উন্নয়নের এই কঙ্কালসার চেহারা সাধারণ মানুষের রুজি-রোজগার এবং জীবনের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিচ্ছে প্রতিদিন, কোনো গর্ভবতী নারী কিংবা আশঙ্কাজনক রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার পথটি এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার সমান।

অ্যাম্বুলেন্স আসতে চায় না, আর ঝাঁকুনিতে রোগীর অবস্থা আরও করুণ হয়ে ওঠে। প্রতিদিন এই ভাঙা পথ পেরিয়ে স্কুলে বা কলেজে যেতে গিয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের জামাকাপড় কাদা-জলে নষ্ট হয়। দুর্ঘটনার ভয় তাড়া করে বেড়ায় অভিভাবকদের। কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিয়ে যাওয়ার মতো পরিবহন মেলে না। অতিরিক্ত গাড়ি ভাড়ার কারণে নাভিশ্বাস উঠছে কৃষকদের।

সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হলো, যে দায়িত্ব ছিল সরকারের ও পিডব্লিউডি দপ্তরের, তা পালনে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। গ্রামবাসী যখন দেখেছেন জনপ্রতিনিধিদের থেকে আশ্বাস ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না, তখন নিরুপায় হয়ে নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে চাঁদা তুলেছেন। গ্রামবাসীরা নিজ উদ্যোগে বড় বড় গর্তে ইট-পাথর ও মাটি ফেলে রাস্তাটি যাতায়াতযোগ্য করার আপ্রাণ চেষ্টা চালান।

কিন্তু সরকারি দপ্তরের উদাসীনতা ও সঠিক পরিকাঠামোর অভাবে সেই অস্থায়ী মেরামত বেশিদিন টেকেনি এক পশলা বৃষ্টিতেই সব কাদা হয়ে ধুয়ে গেছে। জনপ্রতিনিধিরা ভোটের সময় বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান, কিন্তু ভোট পার হতেই এই হাজার হাজার মানুষের হাহাকার আর তাঁদের কানে পৌঁছায় না। গত ১৫টি বছর ধরে দপ্তর থেকে দপ্তরে দরখাস্ত, জনপ্রতিনিধিদের কাছে আবেদন-নিবেদন জানিয়ে ক্লান্ত তিন গ্রামের মানুষ। প্রশাসন কি তবে কোনো বড় দুর্ঘটনার অপেক্ষা করছে?

দাবি আদায় না হওয়া এবং দীর্ঘদিনের জমে থাকা পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটল সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে। এলাকার অবহেলিত জনতা আর সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেন স্থানীয় সমাজসেবী কামাল উদ্দিন লস্কর, সহিদ আহমেদ লস্কর, তইবুর রহমান লস্কর, হুরমত আলি ভূড়বইয়া, গুলঝার আহমদ লস্কর, নাছিম আহমদ ভূড়বইয়া সহ এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও শত শত গ্রামবাসী।

আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। ১৫ বছর ধরে আশ্বাস আর কথার ফুলঝুরি ছাড়া আমরা কিছুই পাইনি। যদি অনতিবিলম্বে পিডব্লিউডি দপ্তর কমরুল ইসলাম সড়কের স্থায়ী ও মানসম্মত সংস্কারকাজ শুরু না করে, তবে আগামীতে সমগ্র ধলাই জুড়ে বৃহত্তর আন্দোলনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হবো আমরা। সড়ক না শুধরালে এর খেসারত প্রশাসনকেই দিতে হবে। জনগণের এই আর্তনাদ এবং চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি কি প্রশাসনের বধির কানে পৌঁছাবে? নাকি আরও ১৫ বছর লোকনাথপুর, আরজানপুর ও জয়দনপুরের বাসিন্দাদের এই কাদা-জলের নরকযন্ত্রণাই সহ্য করে যেতে হবে? উত্তর এখন রাজ্য সরকার এবং সংশ্লিষ্ট পিডব্লিউডি বিভাগের হাতে।

Related Posts

তুঘলক ক্রিসেন্টের বাংলোয় সেই রাতের পোড়া নোটের রহস্য, তদন্তে কাঠগড়ায় বিচারপতি বর্মা

অগ্নিকাণ্ডের পর মিলেছিল বিপুল নগদ, পরে রহস্যজনকভাবে উধাও; তিন অভিযোগই সত্য বলে জানাল তদন্ত কমিটি বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১৩ আগষ্টঃ বাইরে থেকে দেখলে দিল্লির তুঘলক ক্রিসেন্টের ৩০ নম্বর সরকারি…

সাবান-বিস্কুটেও মূল্যবৃদ্ধির আঁচ, সেপ্টেম্বরে আরও চাপে মধ্যবিত্তের সংসার

কাঁচামাল ও উৎপাদন খরচের অজুহাতে দাম বাড়ানোর প্রস্তুতিতে একাধিক এফএমসিজি সংস্থা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১৩ আগষ্টঃ রান্নাঘরের গ্যাস থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধিতে এমনিতেই চাপে সাধারণ মানুষের সংসার। এর…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *