বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ প্রকৃতির খামখেয়ালি মেজাজ আর প্রতিবেশী রাজ্য মিজোরামের একটানা মুষলধারে বৃষ্টির জেরে বরাক উপত্যকার দক্ষিণপ্রান্তে ফের নামল সর্বনাশা বন্যার কালো ছায়া। হাইলাকান্দি জেলার লাইফলাইন খ্যাত কাটাখাল নদীর জলস্তর হঠাৎ করেই বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
বিশেষ করে মাটিজুরি, ঘারমুড়া ঘাট ও সংলগ্ন জনপদগুলিতে নদীর জল ইতিমধ্যেই বিপদসীমা অতিক্রম করে হু হু করে প্লাবিত করতে শুরু করেছে নিম্নাঞ্চলগুলি। প্রতি বর্ষার চেনা অভিশাপ যেন আরও একবার জাঁকিয়ে বসছে এই অবহেলিত জনপদের ওপর। আকাশছোঁয়া মিজোরামের পাহাড়ি উপত্যকায় বিগত কয়েকদিন ধরে চলা টানা বর্ষণের ফল যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার চাক্ষুষ প্রমাণ মিলছে কাটাখাল নদীর রূদ্রমূর্তিতে।
সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশন এর মাটিজুরি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত অবজারভার জহিরুল ইসলাম লস্করের দেওয়া অত্যন্ত উদ্বেগের তথ্য অনুযায়ী, মিজোরাম থেকে নেমে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢল এবং অতিরিক্ত জলের ধাক্কায় কাটাখাল নদীর জলস্তরে লাগাতার বিপজ্জনক পরিবর্তন লক্ষ্য করা হচ্ছে। মিজোরামের উজান থেকে প্রায় প্রতি ১২ ঘণ্টা অন্তর বিপুল পরিমাণে অতিরিক্ত জল কাটাখাল নদীতে প্রবেশ করায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে চোখের পলকে নদীর বুক উপচে জল এখন লোকালয়ের দিকে ধেয়ে আসছে।
মাটিজুরি এলাকায় কাটাখাল নদীর পানি বর্তমানে বিপদসীমার বহু উপর দিয়ে তীব্র বেগে প্রবাহিত হচ্ছে। একই অবস্থা বিরাজ করছে ঘারমুড়া ঘাট ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকগুলিতেও। নদীপারের সাধারণ মানুষ গত কয়েকদিনের এই হঠাৎ জলবৃদ্ধিতে চরম বেকায়দায় পড়েছেন। বিগত ভয়াবহ বন্যাগুলির স্মৃতি উসকে দিয়ে নদীর ফুঁসে ওঠা জল এখন মানুষের ঘরের দুয়ারে কড়া নাড়তে শুরু করেছে।
কাটাখাল নদীর জলস্তর এই দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকলে হাইলাকান্দি জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়তে বেশি সময় লাগবে না। নদীর দুপারের শত শত বিঘা পাকা ও সদ্য রোয়া ধানক্ষেত ইতিমধ্যেই জলের তলায় তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। নদীসংলগ্ন এলাকার ছোট ছোট রাস্তাঘাটগুলি প্লাবিত হওয়ায় যাতায়াত বিচ্ছিন্ন হওয়ার জোগাড় হয়েছে।
গবাদি পশুগুলির খাদ্য সংকট এবং সুপেয় জলের অভাব নিয়েও দুর্ভাবনায় দিন কাটাচ্ছেন গ্রামবাসীরা। যদি মিজোরামে বৃষ্টির তীব্রতা না কমে এবং পাহাড়ি ঢলের এই স্রোত অব্যাহত থাকে, তবে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হাইলাকান্দির বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে এক ভয়াবহ ও সর্বাত্মক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়া কেবল সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি দেখে জেলা প্রশাসন ও জলসম্পদ বিভাগ সূত্রে পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। নদীপারের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সম্ভাব্য বিপদ এড়াতে সতর্ক থাকার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং ও বিশেষ পরামর্শ জারি করা হয়েছে। পরিস্থিতির আকস্মিক পরিবর্তন মোকাবিলায় জেলা বিপর্যয় মোকাবিলা দলগুলিকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে খবর।
তবে কেবল সতর্কবার্তা জারি বা প্রশাসনের নজরদারির লোক দেখানো প্রস্তুতি দিয়ে যে এই প্রাকৃতিক কোপ থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা যাবে না, তা ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন স্থানীয় সচেতন মহল। পাহাড়ি ঢলের জল সামাল দিতে স্থায়ী কোনো বাঁধ বা বিজ্ঞানভিত্তিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব বারবার সামনে এনে দিচ্ছে প্রশাসনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার শূন্যতা। নদীর এই সর্বগ্রাসী রূপের সামনে এখন কেবল চরম উৎকণ্ঠার দিন গুনছে হাইলাকান্দির কাটাখাল পারের অসহায় মানুষগুলি।





