বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৭ আগষ্টঃ ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অসমের পরিবারগুলির পাশে দাঁড়িয়ে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার আবাসন সহায়তা অনুমোদন করল কেন্দ্রীয় সরকার। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা-গ্রামীণ প্রকল্পের আওতায় রাজ্যের বন্যাকবলিত পরিবারগুলির জন্য মোট ৩.৮ লক্ষ নতুন বাড়ির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যোগ্য কোনও পরিবার যাতে আবাসন সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে সমীক্ষার সময়সীমা আরও ১৫ দিন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা এবং কেন্দ্রীয় কৃষি ও কৃষক কল্যাণমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি নেওয়া হয়। বৈঠকেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অসমের জন্য প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা-গ্রামীণের আওতায় ৩.৮ লক্ষ বাড়ির অনুমোদনপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ্যমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন।
বৈঠকের পর শিবরাজ সিং চৌহান জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার আবাসন অনুমোদন করা হয়েছে। পাশাপাশি সমীক্ষার সময়সীমা ১৫ দিন বাড়ানো হয়েছে, যাতে কোনও যোগ্য পরিবার বাদ না পড়ে। বন্যায় ঘরবাড়ি হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিনের বৈঠকে শুধু আবাসন নয়, বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য কৃষি সহায়তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। কৃষকদের পুনরুদ্ধারে কৃষি উন্নয়ন যোজনা এবং রাষ্ট্রীয় কৃষি বিকাশ যোজনার আওতায় মোট ৮৩২.৭০ কোটি টাকার কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়েছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের জন্য আরও ৩৩.৩৬ কোটি টাকা এবং সমন্বিত উদ্যানপালন উন্নয়ন মিশনের আওতায় ৯৬.৮৭ কোটি টাকা অনুমোদন করা হয়েছে।
এছাড়া অসমে কৃষিক্ষেত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার জন্য রাষ্ট্রীয় কৃষি বিকাশ যোজনার আওতায় আরও ১৩৯ কোটি টাকার অনুমোদনপত্র মুখ্যমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী। চা-বাগান শ্রমিকদের পরিবারগুলিকেও আবাসন প্রকল্পের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব চা-বাগান শ্রমিক পরিবার জমির পাট্টা পাবেন, তাঁদের জন্য ডিজিটাল সমীক্ষার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে জমি ও আবাসনের সমস্যায় থাকা চা-বাগান এলাকার বহু পরিবার উপকৃত হতে পারেন।
অসমের ভয়াবহ বন্যার প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রের এই আর্থিক সহায়তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। চলতি বছরে রাজ্য ছয় দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হয়েছে। বন্যা ও ভূমিধসে ১০৫ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। বিস্তীর্ণ এলাকায় বসতবাড়ি, কৃষিজমি, রাস্তাঘাট ও অন্যান্য পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশেষ করে উচ্চ অসমের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার প্রভাব ছিল ব্যাপক। মঙ্গলবারও উজান অসমের চার জেলায় বন্যার প্রভাব অব্যাহত ছিল। ১০টি জেলার ৯১টি গ্রাম এখনও বন্যার সমস্যায় জর্জরিত। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পুনর্বাসন, কৃষি পুনরুদ্ধার এবং গ্রামীণ পরিকাঠামো পুনর্গঠনে দ্রুত সরকারি সহায়তা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
কেন্দ্রের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, অসমের বন্যা মোকাবিলায় কেন্দ্র যেভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং রাজ্যের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। মুখ্যমন্ত্রী একই সঙ্গে ‘বিকশিত অসম’-এর স্বপ্ন বাস্তবায়নে গ্রামের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।
তাঁর বক্তব্য, অসমের প্রকৃত উন্নয়ন শুরু হবে গ্রাম থেকেই এবং সেই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হবেন গ্রামের মানুষ। শুধু সরকারি প্রকল্পের সুবিধাভোগী হিসেবে নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার সক্রিয় অংশীদার হিসেবে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
গ্রামীণ উন্নয়নের এই পরিকল্পনায় যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং জনপরিষেবার সুযোগ সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। গ্রামের সঙ্গে নিকটবর্তী শহর ও বাণিজ্যকেন্দ্রগুলির যোগাযোগ উন্নত হলে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ, শিক্ষার সুযোগ, চিকিৎসা পরিষেবা এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। বন্যার পর আবাসন ও কৃষি ক্ষেত্রে কেন্দ্রের ঘোষিত আর্থিক সহায়তা অসম সরকারের গ্রামীণ পুনর্গঠন কর্মসূচিকে আরও গতি দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।
পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্বনির্ভর অসম গড়ে তোলার লক্ষ্যেও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ‘বিকশিত অসম’-এর ভিত্তি হবে গ্রাম।
স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন, মতামত এবং অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়েই উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। বন্যাবিধ্বস্ত পরিবারগুলির পুনর্বাসন থেকে শুরু করে কৃষি ও জীবিকার পুনর্গঠন, সমন্বিত এই উদ্যোগের মাধ্যমে রাজ্যের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।





