বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩১ আগষ্টঃ খেলার মাঠের ঘাস বা ঘামে ভেজা জার্সি আজও যাদের প্রেরণা জোগায়, সেই লড়াকু ক্রীড়াবিদ ও সমাজসেবকদের বুকভরা সম্মান জানাতে ফের একবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করল শহরের অন্যতম পরিচিত সামাজিক, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ‘খোঁজ শিলচর’। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বরাক উপত্যকার মাটি ও মানুষকে ঘিরে নানাবিধ ইতিবাচক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসা এই সংস্থাটি গত শনিবার (২৯শে আগস্ট) অত্যন্ত সাড়ম্বরে ও বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালন করল ‘জাতীয় ক্রীড়া দিবস’। ভারতীয় হকির অমর কিংবদন্তি, জাদুকর মেজর ধ্যানচাঁদ সিংয়ের জন্মবার্ষিকী স্মরণে সুভাষ নগরের অগ্রণী ক্লাব প্রাঙ্গণে এদিন এক আবেগঘন ও জাঁকজমকপূর্ণ সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল, যা মুহূর্তেই এক মিলনমেলায় রূপ নেয়।
খেলার বাঁশি, ট্রফি আর করতালির শব্দে মুখরিত সেই অনুষ্ঠানে বরাক উপত্যকার ক্রীড়াঙ্গন, সংস্কৃতি জগৎ এবং সমাজসেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আজীবন অবদান রেখে চলা একাধিক কৃতি ব্যক্তিত্বকে এক মঞ্চে সমাদৃত করা হয়। সংস্থার ঐতিহ্যবাহী প্রয়াত গুণীজনদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রবর্তিত ‘আরতি রানি দেব, প্রাণেশ রঞ্জন দেব ও পূর্ণ চন্দ্র পাল স্মৃতি সম্মাননা’ তুলে দেওয়া হয় শহরের নির্বাচিত বিশিষ্ট মুখগুলির হাতে।
হকি, ফুটবল, ক্রিকেট থেকে শুরু করে ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস, যোগাসন, এমনকি নাট্যমঞ্চ ও সমাজসেবার নানা প্রান্তে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাওয়া এই গুণীজনদের সংবর্ধনার মাধ্যমে মূলত বরাকের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সোনালী অধ্যায়গুলোকেই যেন নতুন করে কুর্নিশ জানানো হলো।
এদিনের এই জমকালো আয়োজনে সংবর্ধিত ব্যক্তিত্বদের তালিকাটি ছিল এককথায় তারকার হাট। ব্যাডমিন্টন কোর্টের বহু পুরানো রোমাঞ্চ ফিরিয়ে আনা প্রাক্তন কৃতি খেলোয়াড় প্রশান্ত চৌধুরী ঠাকুরকে এ দিন বিশেষ সম্মান জানানো হয়। পাশাপাশি, ক্রিকেটের বাইশ গজে অতীতে ঝড় তোলা প্রাক্তন খেলোয়াড় অভিজিৎ দাস ও দীপঙ্কর দেবের হাতেও তুলে দেওয়া হয় স্মারক।
হকি ও ফুটবলের জোড়া ময়দানে সমান পারদর্শী দুই প্রবীণ ক্রীড়াবিদ হিরণ্ময় দাস ও অসীম উদ্দিন আহমেদ যখন মঞ্চে উঠে আসেন, তখন উপস্থিত ক্রীড়াপ্রেমীদের হাততালিতে ফেটে পড়ে সভাকক্ষ। এছাড়া সবুজ ঘাসে পায়ের জাদুকরি দক্ষতা দেখানো প্রাক্তন ফুটবলার সান্তনু দাস এবং হকি স্টিকের জাদুকর বিশ্বজিৎ ঘোষকেও বিশেষভাবে সংবর্ধিত করা হয়। খেলাধুলার পাশাপাশি হকির প্রসারে আজীবন নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবী রবীন্দ্রনাথ সাহার অবদানকেও এদিন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
পুরুষদের পাশাপাশি নারী শক্তির জয়গান শোনা গেছে এদিনের মঞ্চেও। ময়দানে পুরুষ রেফারিদের ভিড়ে দক্ষতার সঙ্গে ম্যাচ পরিচালনা করা অদম্য মহিলা ফুটবল রেফারি গ্রাংজুম লংশিতাপ্পী ও যোগাসনের মঞ্চে রাজ্য তথা দেশের নাম উজ্জ্বল করা কৃতি ঋতুজমা নাথের হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। শুধু খেলাধুলাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি এই আয়োজন; সংস্কৃতির পীঠস্থান শিলচরের নাট্যমঞ্চে দাপিয়ে বেড়ানো গুণী নাট্য অভিনেতা বিশ্বজিৎ দত্তের হাতেও তুলে দেওয়া হয় সম্মাননা স্মারক।
অন্যদিকে, টেবিল টেনিসের বোর্ডে খেলোয়াড় হিসেবে দক্ষতা দেখানোর পাশাপাশি বহু নতুন প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা প্রাক্তন টিটি খেলোয়াড় তথা সফল কোচ পার্থ দেবকেও সংবর্ধিত করা হয়। সমাজের অন্যন্য দিকগুলি যেমন খেলাধুলার পাশাপাশি ক্রিকেট ও সমাজসেবায় অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী মাহফুজুল বারি (মামুন) এবং মানবতার টানে মুমূর্ষু রোগীর পাশে দাঁড়ানো নিয়মিত রক্তদাতা তথা জনপ্রিয় ইউটিউবার নবেন্দু সাহার হাতেও স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
প্রতিটি সম্মাননা প্রদানের মুহূর্তটি উপস্থিত দর্শকদের চোখেমুখে এক অদ্ভুত আবেগের জোয়ার এনে দিয়েছিল। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত প্রবীণ থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্মের ক্রীড়াবিদদের উপস্থিতিতে সুভাষ নগরের প্রাঙ্গণটি এক প্রাণবন্ত রূপ নিয়েছিল। অনুষ্ঠানের একেবারে অন্তিম লগ্নে ‘খোঁজ শিলচর’-এর সাধারণ সম্পাদক সজল লস্কর অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বক্তব্য রাখেন।
তিনি বলেন, বরাকের এই অবহেলিত ক্রীড়াঙ্গনকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মকে খেলার মাঠে ফিরিয়ে আনতে এই গুণীজনদের লড়াই ও অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। পরিশেষে, এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানকে সফল করে তুলতে যাঁরা নানাভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, সেই সমস্ত ক্রীড়াপ্রেমী, সদস্য ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে জাতীয় ক্রীড়া দিবসের এই মহোৎসবের সফল সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।






