চন্দ্রনাথপুর-লঙ্কা দ্বিতীয় রেলপথ চালুর দাবিতে শ্রীভুমি জেলায় ধর্না, ব্রডগেজ রূপায়ণ সংগ্রাম কমিটির

চন্দ্রনাথপুর থেকে লঙ্কা পর্যন্ত বহুকাঙ্খিত দ্বিতীয় রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ অবিলম্বে শুরু করার দাবিতে আয়োজিত এই কর্মসূচি থেকে কেন্দ্রীয় সরকার ও রেল মন্ত্রকের বিরুদ্ধে কঠোর হুংকার দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনকারীদের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন কেবল জারি থাকবে না, বরং প্রয়োজনে তা আরও তীব্র থেকে তীব্রতর রূপ নেবে।

পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, এদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এই ধর্না কর্মসূচি চলে। সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছিল যে, রবিবারের এই আন্দোলনের দিনক্ষণ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পাশাপাশি গত শনিবারই করিমগঞ্জ রেল স্টেশনের স্টেশন ম্যানেজারকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছিল। তবে এদিন সকালে ধর্না মঞ্চে বসার ঠিক প্রাক্কালে রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স এর পক্ষ থেকে বাধার মুখে পড়তে হয় আন্দোলনকারীদের।

জনৈক আরপিএফ কর্মী নেপাল দাস স্টেশন চত্বরে ধর্না বসায় আপত্তি জানান। যদিও খোদ স্টেশন ম্যানেজার এই বিষয়ে কোনো আপত্তি বা নিষেধাজ্ঞা জারি করেননি এবং ঘটনাস্থলে কোনো ধরনের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি হয়নি। তা সত্ত্বেও প্রশাসনের অতি-উৎসাহী মনোভাবের প্রতিবাদে এবং সংঘাতে না গিয়ে সংগ্রাম কমিটির সদস্যরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে রেল স্টেশনের মূল প্রবেশদ্বারের বাইরে সুবিশাল বটবৃক্ষের নীচে বসে অবস্থান ধর্না শুরু করেন।

এদিনের ধর্না মঞ্চ থেকে বিভিন্ন বক্তারা বদরপুর-লামডিং পাহাড় লাইনের বিপজ্জনক ও নাজুক বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বক্তারা ক্ষোভের সঙ্গে জানান, প্রতি বছর বর্ষা মরশুমে বদরপুর-লামডিং রেলপথে ধস নামার কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মাসাধিককাল ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে রেল চলাচল। চলতি বছরেও এই রুটে লাগাতার ধস নেমেছে। যদিও বর্তমানে কোনো রকমে ট্রেন চলাচল চালু রাখার দাবি করা হচ্ছে, তবে তা মোটেও স্বাভাবিক নয়।

বিগত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে পাহাড় লাইনে ট্রেনগুলোকে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত গতিতে চালানো হচ্ছে। নিরাপত্তার খাতিরে রাতেরবেলা এই লাইনে সমস্ত ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে এবং যাত্রীবাহী ট্রেনগুলি কেবল দিনের আলোয় পাহাড় পারাপার করছে। এর ফলে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছাতে দীর্ঘ ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় নষ্ট হচ্ছে এবং সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞমহল ও রেল সূত্রের বরাত দিয়ে বক্তারা আরও জানান, পাহাড় লাইনের ট্র্যাকের নীচের মাটি ধসে সরে যাচ্ছে। বদরপুর-লামডিং রুটে যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রেনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে পাহাড় লাইনের ট্র্যাকের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যা এখানকার দুর্বল মাটি আর সহ্য করতে পারছে না। অবিলম্বে একটি সমান্তরাল বা বিকল্প রেলপথ নির্মিত না হলে ভবিষ্যতে যে কোনো মুহূর্তে এক ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে, যা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা রেল বিভাগের থাকবে না।

বিগত বছরগুলিতে হাফলং রেল স্টেশনে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ভূমিধস এবং দীর্ঘ তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার তিক্ত স্মৃতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বক্তারা বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার ও রেল মন্ত্রক এই অঞ্চলের বেহাল দশা সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল থাকা সত্ত্বেও কেন এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চন্দ্রনাথপুর-লঙ্কা দ্বিতীয় রেলপথ প্রকল্পটিকে ফাইলবন্দি করে ‘হিমঘরে’ ফেলে রেখেছে, তা সাধারণ মানুষ কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।

বরাক উপত্যকার বঞ্চনার ইতিহাসের কথা তুলে ধরে বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, বরাকবাসী অতীতেও ভিক্ষা নয়, বরং তীব্র লড়াই ও আন্দোলনের মাধ্যমেই নিজেদের নায্য অধিকার আদায় করে নিয়েছে। অতীতে ব্রডগেজ রূপায়ণ সংগ্রাম কমিটির ঐতিহাসিক আন্দোলনের ফলেই এই উপত্যকায় ব্রডগেজ ট্রেন চালুর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছিল। আজ লঙ্কা-চন্দ্রনাথপুর দ্বিতীয় রেলপথের দাবিতেও সেই একই লড়াইয়ের অগ্নিশিখা জ্বলে উঠেছে।

আগামী দিনে এই আন্দোলনকে আরও বৃহত্তর রূপ দিতে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সংগ্রাম কমিটি। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর করিমগঞ্জ এরিয়া ম্যানেজারের কার্যালয়ের সামনে এক বিশাল বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হবে। পরবর্তীতে এরিয়া ম্যানেজারের মাধ্যমেই সরাসরি রেল মন্ত্রীর কাছে লঙ্কা-চন্দ্রনাথপুর দ্বিতীয় রেলপথের দ্রুত নির্মাণকাজের দাবিতে জোরালো স্মারকলিপি প্রেরণ করা হবে।

রবিবারের এই প্রতিবাদী ও প্রাণবন্ত ধর্না কর্মসূচিতে বরাক উপত্যকার বিভিন্ন মহল থেকে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। এদিনের কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক অরুণাংশু ভট্টাচার্য। অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী জ্যোতিষ পুরকায়স্থ, রাহুল চক্রবর্তী, সুনীতি দত্ত, তুষার দাস, সুদীপ্তা দে চৌধুরী, বদরুল হক চৌধুরী, বিষ্ণু দত্ত পুরকায়স্থ, দেবব্রত শুক্ল, বাছিত চৌধুরী, গোপাল চন্দ্র পাল সহ আরও অনেকে। রেলওয়ের উদাসীনতার বিরুদ্ধে বরাকবাসীর এই ঐক্যবদ্ধ লড়াই আগামী দিনে শাসকদল ও রেল মন্ত্রকের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল।

Related Posts

শিলচর পুরনিগম নির্বাচন: ডিগ্রিতে জালিয়াতি করলেই কপালে শনি, জাল সার্টিফিকেট জমা দিলেই শ্রীঘরে যাওয়ার রাস্তা পাকা!

ভুঁইফোড় বোর্ডের সার্টিফিকেট দিয়ে আর পার পাওয়া যাবে না, মেধা ও সততার অগ্নিপরীক্ষায় নামতে হচ্ছে প্রার্থীদের, শিলচর পুরনিগম নির্বাচনে প্রার্থিতা বাতিলের কড়া হুঁশিয়ারি বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩ সেপ্টেম্বরঃ বরাক উপত্যকার…

শিলচরে ব্যবসার নামে লোভনীয় লভ্যাংশের ফাঁদ পেতে প্রায় ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ, শিলচরের বেরেঙ্গার সাদ্দামের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ।

গ্রেপ্তারির পর জামিনে বেরিয়ে সামাজিক বিচারসভার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ; ২৫ দিন পূর্ণ হওয়ার আগেই উধাও প্রতারক। বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ বরাক উপত্যকার বাণিজ্যিক কেন্দ্র শিলচরে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *