উজান অসমের জলপ্রলয়: প্রকৃতির তাণ্ডব নাকি নাগাল্যান্ডের পরিবেশ ধ্বংসের চরম খেসারত?

সম্প্রতি উজান অসমের চরাইদেউ, শিবসাগর ও যোরহাট জেলায় যে অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ জলপ্রলয় ঘটে গেল, তা কেবল স্বাভাবিক বর্ষার পরিণতি এ কথা মেনে নিতে অস্বীকার করছেন পরিবেশবিদ থেকে শুরু করে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। বন্যার তীব্রতা, সাধারণ জলের বদলে ঘন কাদা ও পলির আস্তরণে গ্রামগুলোর তলিয়ে যাওয়া এবং ধানক্ষেতের ওপর পুরু মাটির স্তরের উপস্থিতি স্পষ্ট নির্দেশ করছে, এই বিপর্যয় কেবল প্রাকৃতিক নয়, এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে মারাত্মক ‘মানবসৃষ্ট’কারণ। উজান অসমের এই চরম দুর্ভোগের নেপথ্যে প্রতিবেশ অঞ্চল নাগাল্যান্ডের পর্বত ধ্বংস ও অনিয়ন্ত্রিত কয়লা খননের ভূমিকা এখন বড়সড় প্রশ্নের মুখে।

বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নাগাল্যান্ডের মন জেলার ঐতিহাসিক তিরু উপত্যকা। ভারতের অন্যতম বৃহৎ এই কয়লা ভাণ্ডারে বহুবছর ধরে বিজ্ঞান ও নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে চলছে ‘র্যাট-হোল মাইনিং’বা ইঁদুরের গর্তের মতো সুড়ঙ্গ খুঁড়ে কয়লা উত্তোলনের মারাত্মক কারবার। কম খরচে বিপুল লাভের আশায় পাহাড়ের পেট চিরে ফেলা হচ্ছে।

ফলে বৃষ্টি হলেই খননকৃত উন্মুক্ত গর্তগুলো জমে উঠছে বিষাক্ত অম্লীয় জলে। টেয়াপ সহ একাধিক পাহাড়ি নদী থেকে সেই বিষাক্ত জল ও ভঙ্গুর পাহাড়ের ক্ষয়প্রাপ্ত মাটি ধসে নেমে আসছে সমতলের দিখৌ নদীতে। ২০০৮ সাল নাগাদ যে পাহাড়ি উপত্যকা ছিল প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ভরপুর, আজ সেখানে শুধুই উন্মুক্ত গর্ত, বন উজাড় এবং দূষিত জলাশয়। বর্ষাকালে উজানে অস্থায়ী ধস বা কৃত্রিম বাঁধ তৈরি হয়ে তা হঠাৎ ভেঙে পড়ায় অসমে বয়ে এনেছে এই প্রলয়ঙ্করী বন্যা।

প্রশ্ন উঠছে, কেন আটকানো যাচ্ছে না এই পাহাড় ধ্বংসের তাণ্ডব? নাগাল্যান্ডের ক্ষেত্রে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭১এ অনুচ্ছেদ স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বিশেষ অধিকার দিয়েছে। কিন্তু এই সাংবিধানিক সুরক্ষাকবচকে ঢাল করে এক শ্রেণীর অসাধু সিন্ডিকেট আইনকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নেফিউ রিও খনি নীতি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিলেও এবং গর্ত ভরাট ও বৃক্ষরোপণের নির্দেশ দিলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

২০১৪ সালের সংশোধিত খনি নীতি অনুযায়ী ভারী যন্ত্র ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে ফোকল্যান্ড ও জেসিবি ব্যবহার করে বেপরোয়া খনন অব্যাহত। ফলে ‘কনিয়াক ইউনিয়ন’-এর মতো স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলো পরিবেশ ও শ্রমিক নিরাপত্তার স্বার্থে আন্দোলন করলেও তা প্রশাসনের দরবারে ধাক্কা খাচ্ছে।

এই পরিবেশ ধ্বংসের দায় কেবল নাগাল্যান্ড সরকারের ওপর চাপিয়ে দিলেই অসমের প্রশাসন পার পেতে পারে না। অভিযোগ অত্যন্ত স্পষ্ট—নাগাল্যান্ডের এই অবৈধ কয়লা বাণিজ্যের রুট বিস্তৃত অসম পর্যন্ত। অসমের কয়লা মাফিয়া ও চোরাচালানকারী চক্রের সাথে নাগাল্যান্ডের খনি মালিকদের অশুভ আঁতাত দীর্ঘদিনের। সীমানা পেরিয়ে কীভাবে হাজার হাজার টন অবৈধ কয়লা ও পাথর অসমে প্রবেশ করে, তা নিয়ে নীরবতা প্রশাসনের ভূমিকাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।

এর সাথে যোগ হয়েছে দিখৌ নদীর নিম্নাঞ্চলে লাগামহীন পাথর উত্তোলন। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ করার বিরুদ্ধে অসম বিধানসভার তৎকালীন বিরোধী দলনেতা দেবব্রত শইকীয়া গৌহাটি উচ্চ আদালতে জনস্বার্থ মামলা পর্যন্ত করেছিলেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বদলেছে কতটুকু? নদীতল থেকে পাথর কেটে নদীকে পঙ্গু করার খেসারতই আজ দিতে হচ্ছে উজান অসমের হাজার হাজার কৃষক ও গ্রামীণ পরিবারকে।

চরাইদেউ বা শিবসাগরের যে কৃষকের ধানক্ষেত আজ পলির নিচে চাপা পড়েছে, যার ঘরবাড়ি কাদার নিচে বিলীন হয়ে গেছে, তার কাছে এটি কোনো দৈব দুর্বিপাক নয়, এটি এক সুস্পষ্ট প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও পরিবেশ অপরাধ। এখনই প্রয়োজন স্যাটেলাইট ইমেজ, ভূতাত্ত্বিক তথ্য ও বৃষ্টিপাতের হিসাব বিশ্লেষণ করে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক তদন্ত কমিটি গঠন করা।

উজানের নদীগুলোতে কৃত্রিম বাঁধ সৃষ্টি হয়েছিল কি না, তার সত্যতা উন্মোচন করতে হবে। অবৈধ র্যাট-হোল মাইনিং ও সীমান্ত পারের কয়লা সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত উভয় রাজ্যের অপরাধীদের বিরুদ্ধে জিরো-টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। যদি আজ রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক জটিলতার অজুহাত দেখিয়ে এই পরিবেশিক অপরাধের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আগামী দিনে উজান অসমকে এমন মানবসৃষ্ট জলপ্রলয়ের বলি হতে হবে বারংবার। প্রকৃতির ওপর এই বেপরোয়া অত্যাচার বন্ধের সময় পার হয়ে যাচ্ছে, প্রশাসন কি এবার জেগে উঠবে?

Related Posts

ই২০ পেট্রোল: লাভ কার, ক্ষতি কার?

২০ পেট্রোল নিয়ে দেশের বিতর্ক নতুন নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক একটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনের পর সেই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। দাবি করা হয়েছে, মাত্র তিন বছরে এপ্রিল ২০২৩ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *