ইন্দিরা ভবনের সামনে জেলা কংগ্রেসের বিক্ষোভ: বেহাল সড়ক, লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি ও বেকারত্বের জাঁতাকলে পিষ্ট জনজীবন

এদিন শহরের প্রাণকেন্দ্র তথা ব্যস্ততম এলাকা ইন্দিরা ভবনের সামনের ব্রিজ রোডে দুপুর ১২টা থেকে শুরু করে একটানা দীর্ঘ দু’ঘণ্টা ধরে এক নজিরবিহীন ও তীব্র প্রতিবাদী ধর্না কর্মসূচির সফল রূপায়ণ ঘটাল হাত শিবিরের নেতাকর্মীরা। কংগ্রেসের বিভিন্ন শাখা সংগঠনের তাবড় এবং প্রথমসারির নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সুদূর প্রান্ত থেকে ছুটে আসা শত শত সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ এই রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সতঃস্ফূর্তভাবে শামিল হয়ে বর্তমান শাসকদলের জনবিরোধী নীতি ও চরম ব্যর্থতার বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ ও ধিক্কার উগরে দেন।

এদিনের এই উত্তাল ধর্না মঞ্চ থেকে বর্তমান কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক বিস্ফোরক ও তির্যক অভিযোগের তীর ছুঁড়ে দেন জেলা কংগ্রেস সভাপতি তাপস পুরকায়স্থ। তাঁর ঝাঝালো ও তথ্যবহুল বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রাত্যহিক জীবন আজ কীভাবে এক দুর্বিষহ ও নরকীয় যন্ত্রণায় পর্যবসিত হয়েছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগাতার ঊর্ধ্বগতির জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সাধারণ মানুষের হেঁশেলের বারোটা বেজে গিয়েছে। রান্নাঘরের প্রধান উপকরণ চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, নুন, মশলা থেকে শুরু করে বাজারের প্রতিটি শাকসবজি ও খাদ্যপণ্যের দাম আজ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সম্পূর্ণ বাইরে চলে গেছে। এর সঙ্গে দোসর হয়েছে জনজীবনকে পঙ্গু করে তোলা পেট্রোল, ডিজেল এবং অগ্নিমূল্য রান্নার গ্যাসের সীমাহীন দাম বৃদ্ধি।

সাধারণ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক পরিবারগুলো কীভাবে মাসের পর মাস সংসার চালাবে, ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাবে কিংবা দুবেলা দুমুঠো ডাল-ভাত মুখে তুলবে, তা নিয়ে আজ তারা সম্পূর্ণ দিশাহারা ও বাকরুদ্ধ। জেলা কংগ্রেস সভাপতির সরাসরি অভিযোগ, এই লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিন্দুমাত্র সদিচ্ছা তো দূর অস্ত, বরং তাদের ভুল ও হঠকারী নীতিই এই ভয়াবহ সংকটকে দিন দিন আরও বেশি করে ঘনীভূত করে তুলছে। অথচ দিল্লির তখত থেকে শুরু করে রাজ্যের মসনদ সর্বত্রই শাসকদলের নেতারা কেবল ফাঁকা বুলি আওড়েই নিজেদের সমস্ত দায় ও দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের ক্ষুধার জ্বালা তাদের স্পর্শই করছে না।

করিমগঞ্জ জেলার সামগ্রিক রাস্তাঘাটগুলোর বর্তমান বেহাল ও কঙ্কালসার দশা নিয়ে ইতিমধ্যেই ক্ষোভে ফুটতে শুরু করেছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট পূর্ত বিভাগ এবং প্রশাসনিক মহলের চরম উদাসীনতা ও নখদন্তহীন নিষ্ক্রিয়তার কারণে আজ জেলার প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা চলাচলের অযোগ্য হয়ে এক একটি মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। বড় বড় খানাখন্দে ভরা এই বিপজ্জনক রাস্তায় প্রতিদিন যাতায়াত করতে গিয়ে নিত্যদিন মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটছে, প্রাণ হারাচ্ছেন নিরপরাধ মানুষ। পিচ সম্পূর্ণ উধাও হয়ে ইট-পাথর বেরিয়ে পড়ায় এবং রাস্তার একাধিক জায়গায় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় বহু গ্রামীণ ও শহুরে সড়ক যাতায়াতের সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে।

কংগ্রেস নেতৃত্বের জোরালো দাবি, এই বেহাল রাস্তাগুলো দ্রুত সংস্কারের জোরালো দাবিতে এর আগে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দফতর, ঠিকাদার সংস্থা ও প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ কর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে বিগত আগস্ট মাসের মধ্যেই মেরামতির কাজ সুচারুভাবে শুরু হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই আশ্বাসের বাণী নিছক কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে, কাজের কাজ বিন্দুমাত্র হয়নি।

ক্যালেন্ডারের পাতার হিসেবে সামনেই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্বশ্রেষ্ঠ ও প্রধান আনন্দ উৎসব শারদোৎসব তথা দুর্গাপূজা কড়া নাড়ছে দরজায়। অথচ পূজার এই প্রাক্কালেও শহরের ও সমগ্র জেলার রাস্তাগুলির এই চরম বেহাল ও লজ্জাজনক দশা দূর করতে প্রশাসনের তরফ থেকে কোনো প্রকার তৎপরতা, উদ্যোগ বা সদিচ্ছা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ফলে আসন্ন পূজার আনন্দ মাটি হয়ে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি ও অবর্ণনীয় কষ্টের শিকার হতে হবে বলেই তীব্র আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

বরাক উপত্যকার সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থবিরতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বেহাল কর্মসংস্থানের করুণ চিত্রটিও এদিনের প্রতিবাদ মঞ্চ থেকে অত্যন্ত সোচ্চারে তুলে ধরা হয়। বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই সম্ভাবনাময় অঞ্চলে কোনো উল্লেখযোগ্য ভারী শিল্প, মাঝারি শিল্প বা কলকারখানা গড়ে তোলার বিন্দুমাত্র সদিচ্ছা দেখায়নি সরকার। যার ফলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন করে বের হওয়া হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আজ চরম অন্ধকারের দিকে সুকৌশলে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

গ্র্যাজুয়েশন বা মাস্টার্স পাস করার পরেও যখন যুবসমাজ উপযুক্ত কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তখন তাদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ জন্ম নেওয়াটাই স্বাভাবিক। এনএইচআইডিএল এবং পূর্ত বিভাগের খামখেয়ালীপনা, দুর্নীতি এবং লাগামছাড়া অনিয়মের কারণে করিমগঞ্জের যোগাযোগ ও উন্নয়ন আজ চরম প্রহসনে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন বক্তারা।

বিদেশে লুকিয়ে থাকা কালো টাকা দেশে ফিরিয়ে এনে প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা জমা, দেশ ও রাজ্য থেকে দুর্নীতি চিরতরে দমন, জাঁকজমকপূর্ণ ‘স্মার্ট সিটি’ গড়ার আকাশছোঁয়া প্রতিশ্রুতি, নারীদের সার্বিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং প্রতি বছর দেশের দুই কোটি বেকারের হাতে চাকরির সোনালী সুযোগ তুলে দেওয়ার সেই ফাঁকা আওয়াজ আজ প্রতিটি ক্ষেত্রেই যে সরকার শোচনীয়ভাবে এবং সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে, তা জোরালো পরিসংখ্যান তুলে ধরে প্রমাণ করে দেন তাঁরা। সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার, বিশ্বাস এবং পবিত্র আস্থার সঙ্গে একরকম চরম প্রতারণা করা হচ্ছে বলেই অভিযোগের সুরে জানান নেতারা।

জনসাধারণের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা, আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা, বেহাল রাস্তাঘাটের দ্রুত সংস্কার এবং বেকার সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে বঞ্চনার অবসান না ঘটলে আগামী দিনে করিমগঞ্জ জেলা জুড়ে আরও অনেক বৃহত্তর, তীব্র ও সর্বাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলনের কড়া হুশিয়ারি করেই এদিনের এই সফল ধর্না কর্মসূচি সমাপ্ত হয়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলের প্রতিটি স্তরে করিমগঞ্জের এই জোরালো কংগ্রেস আন্দোলন এখন সর্বাপেক্ষা আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

Related Posts

পুজোর আনন্দ মুহূর্তে পরিণত হল মৃত্যুমিছিলে! চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে ১৭ জনের মৃত্যুর খবর

বৃষ্টির মধ্যে মণ্ডপে উপচে পড়া ভিড়, পিছন থেকে ধাক্কা, তার পরই হুড়োহুড়ি! বহু আহতের অবস্থা সংকটজনক, মৃতের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ অক্টোবরঃ পুজোর আনন্দ, আলোর ঝলকানি আর…

২০২৩ সালেই কি শুরু হয়েছিল ‘নির্বাচনী নিয়ন্ত্রণের’ আসল খেলা?

বিরোধীদের ঘুম ভাঙতে দেরি, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন ঘিরে প্রশ্নের মুখে গণতন্ত্রের নিরপেক্ষতা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ অক্টোবরঃ ভারতের গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং অবাধ ও…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *