বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৯ আগষ্টঃ হিমালয়ের শুভ্র তুষারাবৃত পাহাড়ের নীরবতার নিচে ধীরে ধীরে দানা বাঁধছে এক শতাব্দীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়। বিশ্ব উষ্ণায়ন ও অব্যাহত জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় দ্রুত গলে পিছিয়ে যাচ্ছে হিমালয়ের বিশালাকার হিমবাহ বা গ্লেশিয়ারগুলো। আর এই বরফগলা পানি আটকে তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার অনিয়ন্ত্রিত পাহাড়ি হ্রদ। সম্প্রতি প্রকাশিত এক যুগান্তকারী গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে এক শিহরণ জাগানো তথ্য, হিমালয় অঞ্চলজুড়ে তৈরি হওয়া হাজার হাজার হিমবাহ হ্রদের মধ্যে অন্তত ২২১টি হ্রদ অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে প্রস্তুত।
বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘গ্লেশিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ বা হিমবাহ বিস্ফোরণজনিত জলপ্রলয়। নেপালের ভোটকোশী নদীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত সেন্সরে ধরা পড়া সাম্প্রতিক প্রলয়ঙ্করি জলোচ্ছ্বাসের যে ছবি সামনে এসেছে, তা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক রক্তহিম করা সসংকেত। হিমালয়ের বুকে কেবল প্রাকৃতিক পাথর ও মাটির আল দিয়ে আটকে থাকা এই বিশাল কৃত্রিম জলাধারগুলোর পাড় ভাঙলে ভারত, নেপাল ও ভুটানের কোটি কোটি মানুষ, মেগা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং জাতীয় মূল পরিকাঠামো মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে।
ভারতের স্বনামধন্য ‘ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অব হিমালয়ান জিওলজি’-র বিজ্ঞানী লিটান মহান্তি এবং অষ্ট্রিয়ার ‘ইনস্টিটিউট অব সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’-র গবেষক প্রতীক গান্তায়াতের যৌথ গবেষণায় হিমালয়ের এই অন্ধকার দিকটি উন্মোচিত হয়েছে। গত কয়েক দশকের পাঁচটি বৃহৎ হিমবাহ সংক্রান্ত গবেষণা এবং স্যাটেলাইটের সংগৃহীত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এই রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয়েছে।
হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ হ্রদের সার্বিক চিত্র মোট চিহ্নিত হিমবাহ হ্রদ ২৪,৪৪০ টি ‘সুপ্রা গ্লেশিয়াল’ হ্রদ (উপরে) ১২,১০০টি, ০.০১ বর্গকিমির চেয়ে বড় হ্রদ ১০,১০১টি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিপজ্জনক, ২২১ টি হ্রদ প্রসারণের বার্ষিক হার ১৭% থেকে ৭৬% পর্যন্ত । গবেষণায় দেখা গেছে, হিমালয় অঞ্চলে শনাক্ত করা মোট ২৪,৪৪০টি হ্রদের মধ্যে প্রায় ১২,১০০টি হলো ‘সুপ্রা গ্লেশিয়াল’ হ্রদ,
অর্থাৎ যা সরাসরি হিমবাহের উপরিভাগে তুষার গলে জমা হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪,৫০০ থেকে ৫,৫০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এসব হ্রদের আয়তন আশঙ্কাজনক হারে ১৭ থেকে ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ মিটার উচ্চতার সংবেদনশীল অঞ্চলে বরফ দ্রুত গলে এই অববাহিকাগুলো ফুলেফেঁপে উঠছে।
চিহ্নিত ২২১টি অতি-সংবেদনশীল হ্রদের ভৌগোলিক বিস্তৃতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, বিপদের কেন্দ্রবিন্দু মূলত ভারত, নেপাল ও ভুটানের সীমান্ত ঘেঁষা নদী অববাহিকাগুলো। কোশী অববাহিকা (নেপাল ও ভারত) একক অববাহিকা হিসেবে সবচেয়ে বেশি ৪৭টি অত্যন্ত বিপজ্জনক হ্রদ এখানে পুঞ্জীভূত। ইয়ারলুং জাংবো ও তিস্তা অববাহিকা (তিব্বত ও সিকিম): দ্বিতীয় স্থানে থাকা এই দুই নদীর অববাহিকায় ২২টি করে বিপজ্জনক হ্রদ চিহ্নিত করা হয়েছে।
মানস অববাহিকা (ভুটান ও ভারত) ভুটান সীমান্ত ও সংলগ্ন অঞ্চলে রয়েছে ২১টি বিপজ্জনক হ্রদ। অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা, তিব্বতের ছিংহাই অঞ্চলে ১৫টি, পঞ্চনদে ১২টি এবং ফেলকু অঞ্চলে ৮টি সংবেদনশীল হ্রদ রয়েছে। নেপালের কোশী, তামাকোশী ও দুধকোশী এবং ভুটানের মানস অববাহিকার কুরি চু উপ-অববাহিকায় যেকোনো সময় হিমবাহের বাঁধ ভেঙে নামতে পারে কাদা, পাথর ও বরফগোলা পানির কয়েকশো ফুট উঁচু দেয়াল।
কেবল হ্রদের আকার বা পানির পরিমাণের ওপর নির্ভর করে বিজ্ঞানীদের এই দল থামেননি। তাঁরা জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম এবং ‘অ্যানালিটিক্যাল হায়ারার্কি প্রসেসপ্রযুক্তির সমন্বয়ে এক ‘যৌথ ঝুঁকিপূর্ণ মানচিত্র’ তৈরি করেছেন। এই মডেলে দেখা হয়েছে, হ্রদ বিস্ফোরিত হলে তলদেশে থাকা সাধারণ জনবসতি, সড়ক, রেলপথ এবং মেগা অবকাঠামো কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে ভারতের তিনটি অঞ্চলকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জোন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, কাশ্মীর অঞ্চলের চেনাব ও ঝিলম নদী অববাহিকা। হিমাচল প্রদেশের চেনাব ও বিয়াস নদী অববাহিকা। সিকিম রাজ্যের তিস্তা নদী অববাহিকা। জনসংখ্যার ঘনত্বের বিচারে নেপালের পরেই সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, জম্মু-কাশ্মীর এবং ভুটানের পাহাড়ি উপত্যকাগুলো।
দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি চাহিদা মেটাতে হিমালয় থেকে সৃষ্ট নদীগুলোতে গত কয়েক দশকে গড়ে তোলা হয়েছে শত শত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। কিন্তু গ্লেশিয়াল লেক বিস্ফোরণের মতো জলোচ্ছ্বাস ঘটলে এই প্রকল্পগুলো তাস ভেঙে পড়ার মতো ধসে যেতে পারে। গবেষণায় হিমালয়ের দক্ষিণাংশের মোট ১,২৪২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের এক বিস্তারিত ডাটাবেস তৈরি করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন নদী অববাহিকায় বিপুল সংখ্যক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে উঠেছে।
ভৌগোলিক অবস্থান, পরিবেশগত সংবেদনশীলতা, পাহাড়ি ঢাল ও অতীতের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ইতিহাস বিবেচনায় এসব প্রকল্পের কিছু অঞ্চলকে সম্ভাব্য ঝুঁকির দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে মনে করা হচ্ছে। বিয়াস (হিমাচল প্রদেশ) ৩৮৪ চরম বিপজ্জনক, রবি ১৮৩ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ, টনস ১০৬ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ, চেনাব (জম্মু-কাশ্মীর/হিমাচল প্রদেশ) ৫৮ চরম বিপজ্জনক, তিস্তা (সিকিম) ৫৫ অত্যন্ত সংবেদনশীল, কালী ও শতদ্রু ৭৯ মধ্যম থেকে উচ্চ ঝুঁকি, অলকানন্দা ও ভাগীরথী (উত্তরাখণ্ড) ৬৩ কৌশলগত ঝুঁকি, ঝিলম ২৮ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উত্তরাখণ্ডেও বড় উদ্বেগ যদিও সামগ্রিকভাবে উত্তরাখণ্ডকে এককভাবে দেশের সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ রাজ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি, তবুও রাজ্যটির ভৌগোলিক ও পরিবেশগত পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ।
বিশেষ করে চামোলি ও কেদারনাথের অতীতের ভয়াবহ বিপর্যয় দেখিয়েছে, পাহাড়ি অঞ্চলে ঘনবসতি এবং বিপুল জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো একসঙ্গে থাকলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিঘাত কতটা মারাত্মক হতে পারে। ফলে নদী অববাহিকায় নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা নয়, বরং ভূপ্রকৃতি, পরিবেশগত ভারসাম্য, জনবসতির ঘনত্ব, দুর্যোগের ইতিহাস এবং অবকাঠামোগত ঝুঁকি সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
বিজ্ঞানীদের মতে, কেবল দূর অনুধাবন বা স্যাটেলাইট দিয়ে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে এই প্রলয় রোখা সম্ভব নয়। পাহাড়ি এলাকায় মেঘভাঙা বৃষ্টি, ভূমিকম্প বা ভূমিকম্পজনিত ধসের কারণে যেকোনো মুহূর্তে পাহাড়ি হ্রদের স্বাভাবিক বাঁধ ভেঙে যেতে পারে। গবেষণার ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা নিচের পদক্ষেপগুলো দ্রুত কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন, ট্রান্স-বর্ডার আগাম তথ্য আদান-প্রদান ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনকে রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে যৌথ আর্লি ওয়ার্নিং (সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। হ্রদের নিচের দিকে অবস্থিত সড়ক, ব্রিজ ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে এমনভাবে নতুন করে সাজাতে হবে যাতে হঠাৎ আসা বিপুল জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কা সামলানো যায়।
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২২১টি হ্রদে সেন্সর ও রিয়েল-টাইম এআই ক্যামেরা বসাতে হবে, যেন পানির স্তর বিপদসীমা অতিক্রম করার সাথে সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। হিমালয়ের বুকে জমতে থাকা এই পাহাড়ি হ্রদগুলো মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের এক একটি টিকটিক করতে থাকা বোমা। দ্রুত ও সমন্বিত বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ না নিলে, অদূর ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে যে মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসবে, তা সামলানো পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।



