হিন্দুত্বের অর্থ মুসলিমদের বাদ দেওয়া নয়, নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ারে দাঁড়িয়ে বার্তা মোহন ভাগবতের
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩১ আগষ্টঃ “ধর্ম ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানবতা এক। সত্য একটাই, আর সেই সত্যেরই অবধারিত ফল হলো মানবজাতি।” সুদূর মার্কিন মুলুকের মাটিতে দাঁড়িয়ে বিশ্বমঞ্চ থেকে সম্প্রীতি, বহুত্ববাদ এবং মানবতার অনন্য বার্তা দিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবত। শনিবার নিউইয়র্কের জনাকীর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ এক মেগা ইভেন্টে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, ভারতবর্ষের মূল চেতনা কোনও সংকীর্ণ বেড়াজালে আবদ্ধ নয়, বরং তা সর্বজনীন এবং সর্বধর্ম সমভাবে বিশ্বাসী। আজকের চরম বিভাজিত বিশ্বে শান্তি ও ঐক্যের পথ দেখাতে এই ভারতীয় দর্শনই একমাত্র পাথেয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বর্তমানে তিন দেশীয় আন্তর্জাতিক সফরে আমেরিকা, কানাডা এবং যুক্তরাজ্য চষে বেড়াচ্ছেন আরএসএস প্রধান। স্থানীয় প্রবাসী ভারতীয় সংগঠনগুলির শতবর্ষ উদযাপনের বিশেষ আমন্ত্রণে তাঁর এই ঐতিহাসিক বিদেশ যাত্রা আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সমাজতত্ত্বে এক নতুন আলোচনার ঝড় তুলেছে। সফরের শুরুতেই নিউইয়র্কের মর্যাদাপূর্ণ ‘ওয়ান ওয়ার্ল্ড, ওয়ান হিউম্যানিটি’ (এক বিশ্ব, এক মানবতা) শীর্ষক অনুষ্ঠানের মূলমঞ্চে তাঁর এই প্রাজ্ঞ ভাষণ প্রবাসী ভারতীয়দের পাশাপাশি বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে।
অনুষ্ঠানে নিজের বক্তব্যের শুরুতেই অত্যন্ত বিনীত এবং স্পষ্ট সুরে মোহন ভাগবত বলেন, আমি কোনও ধর্মীয় পণ্ডিত নই, আপনাদের মতো কোনও ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের আসনেও বসেনি। কিন্তু আমি এমন এক সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, যার দীর্ঘদিনের সংস্কার, ঐতিহ্য এবং অনুশীলন বলে, পথ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু লক্ষ্য এক। সমস্ত পথই শেষ পর্যন্ত সেই পরমেশ্বরের দিকেই ধাবিত হয়।
এর পরেই বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণের বিরুদ্ধে তীব্র তির্যক মন্তব্য করে তিনি এক প্রকার নজিরবিহীন ও সাহসিকতাপূর্ণ বার্তা দেন। ভাগবত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, “যদি কোনও ব্যক্তি নিজেকে হিন্দু বলে দাবি করেন অথচ মনে মনে ভাবেন যে ভারতে কোনও মুসলিমের স্থান থাকা উচিত নয়, তবে তিনি আর যাই হোন, প্রকৃত অর্থে হিন্দু থাকতে পারেন না।
নিজেকে হিন্দু পরিচয়ে গৌরবান্বিত করতে চাইলে সবার আগে এই গভীর বিশ্বাস থাকতে হবে যে, সমস্ত পথ একই পরম লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যায় এবং প্রত্যেক মানুষের অন্তর্নিহিত মর্যাদা সম্পূর্ণ সমান। মানবতার এই বিচারে মানুষের মধ্যে কোনও ভেদাভেদ বা বৈষম্যের অবকাশ নেই।
মানুষ কেন বারবার ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়, তার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও তুলে ধরেন আরএসএস প্রধান। তাঁর মতে, সত্য এক এবং অদ্বিতীয়, আর মানবতা সেই পরম সত্যেরই সৃষ্টি। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন মানুষ নিজের সীমিত উপলব্ধি ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিকে পরম সত্য বলে জাহির করতে চায়। একই সত্যকে মানুষ বিভিন্ন সময়ে নিজের মতো করে প্রকাশ করে।
এই প্রসঙ্গে মানুষের চিন্তাভাবনাকে আধুনিক প্রযুক্তির কোডিংয়ের সঙ্গে তুলনা করে তিনি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে বলেন, মানুষ আসলে তার নিজের মস্তিষ্কে তৈরি করা এক অদৃশ্য ও কৃত্তিম ‘সফটওয়্যারের’ বন্দি। এই মনস্তাত্ত্বিক সফটওয়্যারই মানুষের চিন্তার পরিধি নির্দিষ্ট করে দেয় এবং সত্যকে নিজের সুবিধামতো বোঝার ও ব্যাখ্যা করার পদ্ধতিকে প্রভাবিত করে। মানুষ অনেক সময় নিজের চিন্তার সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় অহংকার, গোঁড়ামি এবং অন্ধবিশ্বাসের এক বিশাল বোঝা বহন করে চলে। সমাজ ও মন থেকে সেই অপ্রয়োজনীয় বোঝা দূর করে মানবতার প্রকৃত ঐক্যের ভাবনাকে সবার আগে সামনে আনতে হবে।
ধর্মীয় রীতিনীতি এবং শৃঙ্খলার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভাগবত জানান, আজকের বিশ্বে ধর্মকে অনেকাংশে কিছু বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান ও রীতিনীতির মাধ্যমেই সংজ্ঞায়িত করা হয়। আত্মিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং দিব্যতার দিকে বা ঈশ্বরের সান্নিধ্যে পৌঁছাতে এই আচারগুলির নিজস্ব একটি ভূমিকা রয়েছে। তবে সমাজের সঠিক শিক্ষাটুকু না থাকলে মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়া অবধারিত।
ইতিহাসের নানা কালো অধ্যায়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, অতীতের কোনও এক সময়ে সমাজবিরোধী বা বিদেশি আক্রমণকারী শক্তির আগ্রাসনে ভারতীয় সমাজ গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল, বহু মূল্যবান ঐতিহ্য ও জ্ঞান ভাণ্ডার ধ্বংস বা হারিয়ে গিয়েছিল। তবে অত্যন্ত আশার কথা হলো, এতদ্সত্ত্বেও ভারতের অন্তর্নিহিত এক বিশ্ব, এক মানবতা’র শাশ্বত দর্শন আজও সমাজের গভীরে টিকে রয়েছে এবং তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সাধারণ মানুষকে আলো দেখাচ্ছে।
বর্তমানের বিশ্বরাজনীতি এবং ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে আরএসএস প্রধান বলেন, মানবতার এই ঐক্য ভারতের সনাতন চিন্তাধারার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিভিন্ন সময়ে দেশের দূরদর্শী নেতারাও এই ভাবনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। স্বাধীনতার পর প্রণীত ভারতীয় সংবিধানেও এই ধারণাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আজ স্বাধীনতার দীর্ঘ দশক পরেও সেই মহৎ ভাবনা এখনও সর্বস্তরে সম্পূর্ণরূপে বাস্তবে রূপায়িত করা সম্ভব হয়নি।
রাজনীতিকে তীক্ষ্ণ ভাষায় আক্রমণ করে ভাগবত বলেন, রাজনীতি আজ আর জনকল্যাণের বা সেবার মাধ্যম নয়, তা পুরোপুরি স্বার্থের খেলায় পরিণত হয়েছে। যেখানে কেবল আমি এবং আমার অধিকারের সংকীর্ণ ভাবনা কাজ করে, সেখান থেকে কখনও স্থায়ী সমাধান বেরিয়ে আসতে পারে না।
এর একমাত্র প্রতিষেধক হলো আমরা এবং আমাদের যৌথ দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা, ভারতের দীর্ঘ ইতিহাস ও অভিজ্ঞতাই আমাদের শিক্ষা দেয় যে, কোনো বড় সামাজিক বা মানসিক পরিবর্তন কখনোই কেবল রাজনীতির আঙিনা থেকে আসতে পারে না; আসল পরিবর্তন আনতে হলে সমাজকেই সবার আগে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
মোহন ভাগবতের এই তিন দেশ সফর ঘিরে আমেরিকা, কানাডা ও ইউরোপের প্রবাসী ভারতীয় মহলে তুমুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে নিউইয়র্কের ঐতিহাসিক ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে রবিবার রাতের এই মেগা অনুষ্ঠানে প্রায় ৫ হাজার মানুষের রেকর্ড সমাগমের প্রত্যাশা করা হয়েছিল।
আরএসএস-এর সর্বভারতীয় প্রচারপ্রধান সুনীল আম্বেকর আগেই জানিয়েছিলেন যে, এই ‘সার্বজনীন ঐক্য উদ্যাপন’ বা ইউনিভার্সাল ইউনিটি সেলিব্রেশন আসলে একটি বিরাট আন্তঃধর্মীয় মহাসম্মেলন। যেখানে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রিত হয়ে বিশ্বশান্তি ও মানবতার পক্ষে এক নতুন দিশা প্রদর্শন করছেন।
বিশেষজ্ঞমহলের মতে, মার্কিন মুলুকের মাটিতে দাঁড়িয়ে সংঘ প্রধানের মুখে এই ধরনের উদারনৈতিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং অসাম্প্রদায়িক বক্তব্য বিশ্বমঞ্চে ভারতের প্রকৃত ভাবমূর্তিকে আরও বহুগুণ উজ্জ্বল করবে। বিভাজনের রাজনীতির ভিড়ে দাঁড়িয়ে বিশ্ববাসীর সামনে এক বিশ্ব, এক মানবতার এই বার্তা বর্তমান শতকের অন্যতম শক্তিশালী ও ইতিবাচক রাজনৈতিক-সামাজিক পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।





