বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৭ আগষ্টঃ কোটি কোটি টাকার উন্নয়নমূলক প্রকল্প কি তবে এখন পুরোপুরি দলীয় রাজনীতির কুক্ষিগত? উত্তর করিমগঞ্জ বিধানসভা এলাকায় ৩৭ নম্বর জাতীয় সড়কের বহু প্রতীক্ষিত সংস্কার প্রকল্পের ভূমিপূজনকে কেন্দ্র করে এই মুহূর্তে তীব্র রাজনৈতিক অসন্তোষ ও উত্তেজনার পারদ চড়েছে বদরপুরে।
সংশ্লিষ্ট এলাকার নির্বাচিত বিধায়ককে আমন্ত্রণের তোয়াক্কা না করার গুরুতর অভিযোগ তুলে ন্যাশনাল হাইওয়েজ অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড এর বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে বদরপুর চৈতন্যনগর ব্লক কংগ্রেস। শুধু কথার লড়াইয়ে নয়, আগামী দিনে শ্রীভূমিতে এনএইচআইডিসিএলের প্রধান কার্যালয় ঘেরাও করার মতো কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে তারা।
সূত্রের খবর, উত্তর করিমগঞ্জ বিধানসভা এলাকার অন্তর্গত মালুয়া-কান্দিগ্রাম পয়েন্ট থেকে করিমগঞ্জ বাইপাস পর্যন্ত ৩৭ নম্বর জাতীয় সড়কের দীর্ঘদিনের বেহাল দশা ঘুচাতে প্রায় ৩২ কোটি ৬৯ লক্ষ টাকা বিশাল অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। এলাকার মানুষের যাতায়াতের নরকযন্ত্রণা লাঘব করতে এই সংস্কার কাজ অত্যন্ত জরুরি ছিল। গত শনিবার ঘটা করে এই প্রকল্পের শিলান্যাস বা ভূমিপূজন সম্পন্ন হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল সহ শ্রীভূমি জেলার একাধিক শীর্ষস্থানীয় বিজেপি নেতা-কর্মী। প্রকল্প অনুমোদন ও কাজ শুরু হওয়ায় সাধারণ মানুষের মনে প্রাথমিক স্বস্তি মিললেও, এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় আসল রাজনৈতিক বিতর্ক।
কংগ্রেসের মূল ক্ষোভের জায়গাটি হলো, যে বিধানসভা এলাকার ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেই এলাকার জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত বিধায়ক জাকারিয়া আহমেদ পান্নাকেই এই ভূমিপূজন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। প্রটোকলকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একজন জনপ্রতিনিধিকে পাশ কাটানোর এই ঘটনাকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না বিরোধী শিবির।
এই নজিরবিহীন ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার তীব্র ক্ষোভ উগরে দিতে বদরপুর চৈতন্যনগর ব্লক কংগ্রেস কার্যালয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে দলীয় নেতারা সরকারি সংস্থার পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে ব্লক কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি সফরুল ইসলাম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রশ্ন তোলেন, উন্নয়নের মতো একটি পবিত্র ও জনস্বার্থের বিষয়েও কি এখন নোংরা দলীয় রাজনীতি করা হবে? একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে সরকারি প্রকল্পের সূচনা করা গণতান্ত্রিক রীতির চরম পরিপন্থী এবং ঐতিহ্য ও শিষ্টাচারের পরিপন্থী।
কংগ্রেসের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে দাবি করা হয় যে, ৩৭ নম্বর জাতীয় সড়কের এই বেহাল ও মরণফাঁদ সদৃশ দশা নিয়ে বিধানসভার অন্দরে ও বাইরে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার ছিলেন বিধায়ক জাকারিয়া আহমেদ পান্না। সাধারণ মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ ও যন্ত্রণার কথা তুলে ধরে তিনি ক্রমাগত সড়ক সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
অথচ যখন সেই প্রকল্প আলোর মুখ দেখল এবং কাজ শুরু হলো, তখন যার নিরলস প্রচেষ্টায় বা জনমতের চাপে এই উদ্যোগ, তাঁকেই আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হলো না, এটি কোনো সাধারণ ভুল হতে পারে না বলে দাবি কংগ্রেস নেতাদের।
সফরুল ইসলাম আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, উন্নয়নের কৃতিত্ব নিয়ে সস্তা রাজনীতি করা বন্ধ করুন। এলাকার সাধারণ মানুষের স্বার্থে সবাইকে আস্থায় নিয়ে কাজ করা প্রশাসনের দায়িত্ব। বিধায়ককে কেন আমন্ত্রণ জানানো হলো না, তার সদুত্তর এনএইচআইডিসিএল কর্তৃপক্ষকে প্রকাশ্যে দিতেই হবে।
এই ঘটনাকে ‘রাজনৈতিক সংকীর্ণতার নিদর্শন’ বলে আখ্যা দিয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী মাহবুবুর রহমান বলেন, বদরপুরের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন নজিরবিহীন দ্বিচারিতা অতীতে কখনো দেখা যায়নি। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে রাজনৈতিক দলের কুক্ষিগত হয়ে কাজ করছে, এটি তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
সাংবাদিক সম্মেলনের গণ্ডি পেরিয়ে এবার আন্দোলনের রূপ বদলাতে চলেছে। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই অপমানের জবাব দিতে তারা পিছপা হবে না। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে শ্রীভূমিতে অবস্থিত এনএইচআইডিসিএলের মূল কার্যালয় ঘেরাও করে এর তীব্র প্রতিবাদ জানানো হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি দাবি করা হবে।
সব মিলিয়ে, ৩৭ নম্বর জাতীয় সড়কের এই কোটি টাকার সংস্কার প্রকল্প সাধারণ মানুষের মনে যাতায়াতের স্বস্তির বার্তা বয়ে আনলেও, ভূমিপূজনকে ঘিরে চলা রাজনৈতিক রশিটানাটানি বদরপুরের আকাশ-বাতাসকে করে তুলেছে উত্তপ্ত।
এখন দেখার বিষয়, কংগ্রেসের এই গুরুতর অভিযোগের পর এনএইচআইডিসিএল কর্তৃপক্ষ বা শাসক শিবির কী সাফাই দেয় এবং এই রাজনৈতিক চাপানউতোর আগামী দিনে কোন মোড় নেয়। এদিনের এই প্রতিবাদী সাংবাদিক সম্মেলনে সাহাদ আহমেদ সহ ব্লক কংগ্রেসের অন্যান্য বিশিষ্ট কর্মকর্তা ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।






