শিলচর পুরনিগম নির্বাচন ২০২৬, শিলচরে শাসকদলের কাউন্সিলর সুমনা দাসের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে

ভোটে জয় ছিনিয়ে নিলেও হলফনামার মারপ্যাঁচ আর ডিগ্রির সত্যতা নিয়ে এমন গুরুতর প্রশ্ন এর আগে শিলচরের পৌর রাজনীতিতে খুব কমই দেখা গেছে। আজ, ১৬ অক্টোবর, কাছাড়ের জেলা ও দায়রা জজ আদালতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতীক্ষিত সেই প্রথম শুনানির মুখোমুখি হতে চলেছেন সুমনা দাস। শহরের সচেতন নাগরিক সমাজ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলের একটাই প্রশ্ন, ডিগ্রির এই মহাজালিয়াতির জাল কি শেষ পর্যন্ত তাঁর কাউন্সিলর পদটাই গ্রাস করবে?

আইনজীবী ও আদালতের নথি সূত্রে জানা গেছে, ৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত শিলচর পুরনিগম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় সুমনা দাস যে নির্বাচনী হলফনামা জমা দিয়েছিলেন, সেখানেই তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার বিবরণ ঘিরে দানা বেঁধেছে ঘনীভূত রহস্য। হলফনামায় তিনি যে ক্রমানুসারে নিজের শিক্ষাগত সাফল্যের বয়ান দিয়েছেন, তা একবার খতিয়ে দেখলে চোখ কপালে ওঠে, মাধ্যমিক ১৯৯৩ সালে করিমগঞ্জের নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘এমএমএমসি গার্লস হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল’ থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

উচ্চমাধ্যমিক ১৯৯৭ সালে করিমগঞ্জেরই রবীন্দ্র সদন গার্লস কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। স্নাতক ডিগ্রি তাঁর দাবি অনুযায়ী, সুদূর সিকিমের ‘ভিনায়ক মিশন সিকিম ইউনিভার্সিটি’ থেকে তিনি বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। আইন পাঠ্যক্রম বর্তমানে তিনি নাকি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ স্বনামধন্য এ কে চন্দ্র ল কলেজ এ এলএলবি পাঠক্রমে নিয়মিত অধ্যয়ন করছেন!

কিন্তু বিতর্ক ও আইনি ঝামেলার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ওই ‘ভিনায়ক মিশন সিকিম ইউনিভার্সিটি’ থেকে অর্জিত তাঁর তথাকথিত বিএ ডিগ্রি এবং তার সত্যতা। অভিযোগকারীদের দাবি, দূরবর্তী বা বিতর্কিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এই শংসাপত্রের নেপথ্যে রয়েছে ফাঁকি এবং অসত্য তথ্যের এক বেপরোয়া কারবার।

সুমনা দাসের এই শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ইতিমধ্যে পৃথকভাবে দুটি হাই-প্রোফাইল ইলেকশন পিটিশন বা নির্বাচনী মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলা দায়ের করেছেন প্রবীণ সাংবাদিক ও ‘বরাকবাণী’ পত্রিকার সম্পাদক নিখিল দাস। অন্য মামলাটি দায়ের করেছেন ২১ নম্বর ওয়ার্ডের পরাজিত নির্দল প্রার্থী মনীষা দে।

আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, মনীষা দে-র দায়ের করা মামলাটি গত ১৫ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। যার ফাইলিং নম্বর ৬৭৩/২০২৬, রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৭/২০২৬ এবং সিএনআর নম্বর ASCC010016642026। আসাম পৌর নিগম আইন, ২০২২-এর ২(৪), ৮(১)(v), ৮(৬), ৮(৬)(m), ৮(৮), ৩৭৯, ৩৮০, ৩৮১, ৩৮২ ও ৩৮৩ ধারার উল্লেখ করে দায়ের করা হয়েছে। এই মামলায় বাদী পক্ষের হয়ে আইনি লড়াইতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিশিষ্ট আইনজীবী প্রিয়াঙ্কা রায়।  মামলায় সুমনা দাসের পাশাপাশি নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত পাঁচটি কর্তৃপক্ষ বা পদাধিকারীকে প্রতিপক্ষ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার, জেলা নির্বাচনী আধিকারিক, ২১ নম্বর ওয়ার্ডের সহকারী রিটার্নিং অফিসার, পরিচালক এবং শিলচর পৌর নিগমের কমিশনার।

আসাম পৌর নিগম আইন, ২০২২-এর ৮(৬)(m) ধারায় নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা-সংক্রান্ত বিধান পৌর নির্বাচনে প্রার্থীর যোগ্যতার প্রশ্নে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করা প্রার্থীর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষেত্রে একটি আবশ্যিক শর্ত। ফলে কোনও প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা কেবল ব্যক্তিগত বা প্রশাসনিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকে না, সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান অনুসারে তাঁর নির্বাচনী যোগ্যতা ও নির্বাচনের বৈধতার প্রশ্নও বিচার্য হয়ে উঠতে পারে।

মনীষা দের দায়ের করা এই নির্বাচনী মামলায় শিক্ষাগত যোগ্যতা-সংক্রান্ত অভিযোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আইনি বিধানগুলির প্রয়োগের বিষয়টিও আদালতের বিবেচনার জন্য উত্থাপিত হয়েছে। আদালতে উপস্থাপিত নথি, প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইনের ব্যাখ্যার ভিত্তিতেই এই বিরোধের নিষ্পত্তি হবে। মামলাটি বিচারাধীন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আদালত আইন অনুযায়ী সুমনা দাসের নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করতে পারেন।

শিলচরের বুদ্ধিজীবী মহল এবং সচেতন নাগরিক সমাজের মতে, জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের পবিত্রতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যদি কেউ ভুয়া বা সন্দেহজনক ডিগ্রির জোরে ক্ষমতার মসনদে বসে পড়েন, তবে তা গণতন্ত্রের মুখে এক বিরাট চপেটাঘাত। শিলচরের বিশিষ্ট আইনজীবী মহলের বক্তব্য, মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় রিটার্নিং অফিসারের দপ্তরে সমস্ত সার্টিফিকেট পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করার কঠোর বিধান রয়েছে। তা সত্ত্বেও কীভাবে এই ধরনের প্রশ্নবিযুক্ত ও বিতর্কিত ডিগ্রিধারী প্রার্থীরা কমিশনের ছাড়পত্র পেয়ে গেলেন, তা নিয়ে আজ বড়সড় দুর্নীতির গন্ধ পাচ্ছে সুশীল সমাজ।

শিলচরের এক প্রবীণ বুদ্ধিজীবীর তীব্র কটাক্ষ, ভোটে ইভিএমের বোতাম টিপে সাধারণ মানুষকে বোকা বানানো যায়, কিন্তু আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে জাল সার্টিফিকেটের নথিপত্র প্রমাণ করা অত সহজ নয়। শাসকদলের ছত্রছায়ায় যতই প্রভাব খাটানো হোক না কেন, সত্য একদিন না একদিন ফাসবেই।

বর্তমানে মামলাটি প্রাথমিক শুনানি বা অ্যাডমিশন হিয়ারিং পর্যায়ে রয়েছে। আজ ১৬ অক্টোবর এই মামলার প্রথম শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে কাছাড়ের জেলা ও দায়রা জজ আদালতে। আদালতের প্রথম এই পদক্ষেপে বিচারক কী নির্দেশ দেন, সুমনা দাসের আইনজীবীরা এর কী জবাব দেবেন এবং নির্বাচন কমিশন বা প্রশাসন এই জালিয়াতির দায় এড়াতে কী সাফাই গায়—সেদিকেই এখন একচিলতে চোখ রাখছে পুরো শিলচর শহর। নির্বাচনী বৈতরণী তো পার হয়ে গেছেন, কিন্তু জাল ডিগ্রির এই বৈতরণী পার হতে গিয়ে সুমনা দাসের কাউন্সিলর নৌকা শেষ পর্যন্ত মাঝসাগরে ডোবে, নাকি আইনি মারপ্যাঁচ কাটিয়ে জয়ী হন, আজকের আদালতের রায়ই তা নির্ধারণ করে দেবে!

Related Posts

শিলচর পুরনিগম নির্বাচন ২০২৬: জাল সার্টিফিকেটের মোড়কে ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশ! ৫ বিচারপ্রার্থী কাউন্সিলরের ভাগ্য এখন আদালতের কাঠগড়ায়

ভুয়ো ডিগ্রি কাণ্ড: শিলচরের ৫ কাউন্সিলরের বিচারে বসছে আদালত! আদালতেই কি ডুববে কাউন্সিলরদের তরী? বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১৬ অক্টোবরঃ গণতন্ত্রের উৎসবে ভোটের রায় প্রকাশের পর যেখানে আবির খেলা, মিষ্টি…

বিজেপির বোর্ড, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট কোথায়?

১০০ ভোটারের মধ্যে বিজেপির পাশে প্রায় ৩৫ জন, বিরোধী ভোট ছড়িয়েই কি গেরুয়া বোর্ডের রাস্তা পরিষ্কার? রাজু দাস, বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ১১ অক্টোবরঃ শিলচর শহরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বিজেপিকে ভোট দেননি।…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *