প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপের নির্দেশ আদালতের, শপথগ্রহণের আগেই স্থগিতাদেশের সম্ভাবনা, চাপে কাউন্সিলররা!
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ অক্টোবরঃ ভুয়া সার্টিফিকেট অভিযোগ নিয়েই ভোটের ময়দানে জয়ী হয়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন তাঁরা। কিন্তু নির্বাচনী লড়াই শেষ হতেই তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন আইনি লড়াই। শিলচর পুরনিগমের সাত কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত অভিযোগে দায়ের করা সাতটি নির্বাচনী মামলা শুক্রবার কাছাড়ের জেলা ও দায়রা আদালতে শুনানির জন্য গৃহীত হয়েছে।
আগামী ২৬ নভেম্বর, ২০২৬ ধার্য হয়েছে পরবর্তী শুনানির দিন। নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখ করা শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট সার্টিফিকেটের সত্যতা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন এবার আদালতের বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রবেশ করায় পুরনিগমের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সাতটি পৃথক মামলায় সাত ওয়ার্ডের নির্বাচিত কাউন্সিলরদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন মামলাকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, নির্বাচনের সময় জমা দেওয়া হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে যে তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, তার সত্যতা যথাযথভাবে যাচাই হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগের নিষ্পত্তি এখন আদালতের বিচারপ্রক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল। শুক্রবারের আদালত-পর্বের পর আগামী ২৬ নভেম্বরের শুনানির দিকে নজর থাকছে সংশ্লিষ্ট মহলের।
শিলচর পুরনিগমের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর এখন পর্যন্ত মোট সাত কাউন্সিলরের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে পৃথকভাবে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন মামলাকারীরা। ৬ নম্বর ওয়ার্ড: বিজেপির নির্বাচিত কাউন্সিলর কাঞ্চন দেবের বিরুদ্ধে নির্বাচনী মামলা দায়ের করেছেন রণজিৎ দেবনাথ। তাঁর অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে কাউন্সিলরের নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখ করা শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সংশ্লিষ্ট নথির সত্যতা। ৮ নম্বর ওয়ার্ড: নির্বাচিত কাউন্সিলর মহিতোষ মণ্ডলের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন বন্দিতা ত্রিবেদী রায়।
এই মামলাতেও নির্বাচনী হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের প্রশ্ন উঠেছে। ১৪ নম্বর ওয়ার্ড: নির্বাচিত কাউন্সিলর প্রতীক্ষা দেবের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি নির্বাচনী মামলা দায়ের করেছেন সঙ্গীতা চক্রবর্তী ও জয়া বর্ধন। ফলে একই কাউন্সিলরের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে দুটি পৃথক মামলা আদালতের বিচারপ্রক্রিয়ায় এসেছে। ১৫ নম্বর ওয়ার্ড: নির্বাচিত কাউন্সিলর পাপলি কর্মকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন এইচ. নিরুপমা সিংহ। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত তথ্য নিয়েও আইনি প্রশ্ন তুলেছেন মামলাকারী।
১৬ নম্বর ওয়ার্ড, নির্বাচিত কাউন্সিলর মিয়া খানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন লস্কর ও অ্যাডভোকেট নাজির মজুমদার। এখানেও নির্বাচনী হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। ১৭ নম্বর ওয়ার্ড: নির্বাচিত কাউন্সিলর আতাউর রহমান লস্করের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন সালমা বেগম লস্কর ও হানিফ বরভূঞা। এই মামলাতেও শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত অভিযোগের নিষ্পত্তি এখন আদালতের বিচারপ্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করছে।
২১ নম্বর ওয়ার্ড, নির্বাচিত কাউন্সিলর সুমনা দাসের বিরুদ্ধে নির্বাচনী মামলা দায়ের করেছেন মনীষা দে। নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখ করা শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্যকে কেন্দ্র করেই এই মামলা। সাতটি মামলার প্রত্যেকটিই পৃথক। ফলে কোন মামলায় কী অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে কী তথ্য রয়েছে এবং বিবাদীপক্ষ তার কী জবাব দেয়, তা পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সময় জমা দেওয়া হলফনামা প্রার্থীর নির্বাচনী নথিপত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে উল্লেখ করা তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সংশ্লিষ্ট নথি, সার্টিফিকেট এবং মামলায় উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি বিচারাধীন হয়। এই সাতটি মামলায় মামলাকারীদের মূল বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলরদের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে দেওয়া তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। হবে।
শুক্রবারের আদালত-পর্বে সাতটি মামলা শুনানির জন্য গৃহীত হওয়া এবং পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারিত হওয়ায় বিষয়টি আর কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না। এখন মামলাগুলির অগ্রগতি নির্ভর করবে আদালতের সামনে উপস্থাপিত তথ্য, নথি ও আইনি বক্তব্যের উপর। উল্লেখ্য, শিলচর পুরনিগম নির্বাচন ২০২৬-এর প্রচারপর্বেও শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত এই বিতর্ক সামনে এসেছিল।
নির্বাচনী প্রচারে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, বিজেপি খারাপ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকবে না। অন্যদিকে, কাছাড় জেলা বিজেপির তরফে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের আইনি লড়াইয়ে দল পাশে থাকবে না বলে অবস্থান প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে একদিকে নির্বাচিত কাউন্সিলরদের বিরুদ্ধে আদালতে চলা মামলা, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিজেপির অবস্থান, দুই ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক মহলের নজর রয়েছে।
এদিকে,মামলাকারীদের আইনজীবীর পূর্ণ বিশ্বাসের দাবি, বিবাদীপক্ষের পক্ষে এই মামলাগুলি টিকিয়ে রাখা কঠিন হতে পারে। তাঁর বক্তব্য, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য সামনে এলে বিষয়টি প্রমাণ করতে খুব বেশি সময় লাগবে না বলেই তিনি মনে করেন। সেই সূত্রেই মামলাগুলি প্রাথমিক পর্যায়েই খারিজ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা বিবাদীপক্ষের তরফে ভাবা হলেও, মামলাকারীদের আইনজীবীর অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত।
অন্যদিকে, মামলাকারীদের আইনজীবী সৌমেন চৌধুরী আদালতের উপর পূর্ণ আস্থার কথা জানিয়েছেন। তাঁর আশা, আদালত দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। এমনকি নবনির্বাচিত কাউন্সিলরদের শপথগ্রহণের আগেই স্থগিতাদেশ জারি হওয়ার সম্ভাবনাও তিনি উড়িয়ে দিচ্ছেন না। যদিও আইনজীবীদের এই বক্তব্য ঘিরে নতুন করে জল্পনা তৈরি হলেও, শপথগ্রহণের বিষয়ে কোনও স্থগিতাদেশ জারি হয়েছে বলে এখনও কিছু বলা যাচ্ছে না। মামলাগুলিতে আদালতের পরবর্তী নির্দেশই এ ক্ষেত্রে নির্ণায়ক হবে।
শুক্রবারের আদালত-পর্বের পর এখন নজর আগামী ২৬ নভেম্বরের শুনানির দিকে। সেদিন মামলাগুলিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী হয়, বিবাদীপক্ষের বক্তব্য ও লিখিত আপত্তি কীভাবে সামনে আসে এবং অভিযোগগুলির বিচার কোন পথে এগোয়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সাতটি মামলার প্রতিটিতে অভিযোগের প্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট নথির গ্রহণযোগ্যতা এবং বিবাদীপক্ষের জবাব আলাদাভাবে বিবেচিত হওয়ার বিষয়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। তবে রাজনৈতিক তাৎপর্যের দিক থেকে এই মামলাগুলির গুরুত্ব যথেষ্ট।
কারণ, শিলচর পুরনিগমের নির্বাচনে জয়লাভের পর সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলরদের সামনে এখন শুধু রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন নয়, নির্বাচনী হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে ওঠা অভিযোগেরও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ভোটের লড়াই শেষ হয়েছে, ফলাফলও ঘোষিত হয়েছে। কিন্তু সাত কাউন্সিলরের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বিতর্কের নিষ্পত্তি এখনও বাকি। ২৬ নভেম্বরের শুনানিতে আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, তার উপরই নির্ভর করবে এই আইনি লড়াইয়ের আগামী গতিপথ।





