১৯৬১ সালের জন্মশতবর্ষের ঐতিহ্যকে সম্মান জানাতে শিলচর জেলা গ্রন্থাগার প্রেক্ষাগৃহের নামকরণের জোরালো দাবি।
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ বরাক উপত্যকার সাংস্কৃতিক রাজধানী শিলচরের দীর্ঘদিনের লালিত ঐতিহ্য এবং আবেগ জড়িত রয়েছে যে ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে, তা হলো শহরের জেলা গ্রন্থাগার ও প্রেক্ষাগৃহ। কিন্তু নানা জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে জড়িয়ে এই ভবনের নবনির্মাণ কাজ আজও সম্পূর্ণ না হওয়ায় ফুঁসে উঠেছে শিলচরের সংস্কৃতিমনস্ক সুশীল সমাজ।
শিলচরের নবনির্মীয়মান জেলা গ্রন্থাগার প্রেক্ষাগৃহের কাজ অবিলম্বে সম্পন্ন করা এবং এর নাম ‘রবীন্দ্র শতবার্ষিকী প্রেক্ষাগৃহ’ ও ভেতরের ছোট হলটির নাম ‘কামিনী কুমার চন্দ হল’ রাখার এক সুনির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী দাবিতে এবার সরাসরি আসরে নামল ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ, শিলচর’। বুধবার কাছাড়ের জেলা কমিশনারের (ডিসি) মাধ্যমে আসামের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার উদ্দেশ্যে একটি জোরালো স্মারকলিপি পেশ করে মঞ্চের প্রতিনিধিদল। এই আন্দোলন কেবল একটি নামকরণের দাবি নয়, বরং বরাকের সাংস্কৃতিক পরিসরকে পুনরুদ্ধারের এক দীর্ঘমেয়াদী লড়াই।
স্মারকলিপিতে তুলে ধরা ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬১ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষের মহান ক্ষণেই শিলচরে নির্মিত হয়েছিল এই জেলা গ্রন্থাগার প্রেক্ষাগৃহটি। তদানীন্তন কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগ ও বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতায় তৎকালীন অসমের চৌদ্দটি জেলা গ্রন্থাগারের মধ্যে অন্যতম হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল এই প্রতিষ্ঠান।
সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষের স্মৃতিকে অমর করে রাখতেই সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ জোরালো দাবি তুলেছে যে, বর্তমান নবনির্মিত শিলচর জেলা গ্রন্থাগার প্রেক্ষাগৃহের আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হোক ‘রবীন্দ্র শতবার্ষিকী প্রেক্ষাগৃহ’। পাশাপাশি, এই কমপ্লেক্সের ভেতরে থাকা ছোট হল বা প্রেক্ষাগৃহটির কাজ দ্রুত শেষ করে বরাক উপত্যকার অন্যতম কৃতি পুরুষ ও বিশিষ্ট আইনজীবী-নেতা কামিনী কুমার চন্দের স্মরণে তার নাম রাখা হোক ‘কামিনী কুমার চন্দ হল’। ঐতিহাসিক মূল্যায়নের দিক থেকে এই দাবি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
বিগত ২৮ বছর ধরে বরাক উপত্যকার ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে নিরলস কাজ করে চলা ২৫টি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থার এক শক্তিশালী যৌথ মঞ্চ হলো এই ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ’। শিলচরের এই প্রাণকেন্দ্রিক জেলা গ্রন্থাগার ভবন ও প্রেক্ষাগৃহের আধুনিকায়ন এবং নির্মাণকাজ নিয়ে এর আগেও বহুবার রাজ্য সরকারের সঙ্গে পত্রালাপ ও স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।
মঞ্চের অভিযোগ, ইতিপূর্বে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, নবনির্মিত এই ভবনের যাবতীয় কাজ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শেষ করে গত বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই তা শহরের সংস্কৃতিমনস্ক সুশীল সমাজের হাতে সমর্পণ করা হবে। কিন্তু ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে সময় গড়ালেও বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এখনো ঝুলে রয়েছে অসমাপ্ত কাজ। শিলচরের মতো একটি জনবহুল ও সংস্কৃতি-পাগল শহরে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি প্রেক্ষাগৃহের অনুপস্থিতি সাংস্কৃতিক চর্চাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এই দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রশাসনিক উদাসীনতায় তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মঞ্চ।
মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে প্রেরিত এই স্মারকলিপির মাধ্যমে অত্যন্ত বিনীত অথচ দৃঢ় ভাষায় অনুরোধ জানানো হয়েছে, যেন কালবিলম্ব না করে শিলচরের জেলা গ্রন্থাগার ভবন ও প্রেক্ষাগৃহের চাবিকাঠি বরাকের জনগণের হাতে তুলে দেওয়া হয়। শুধু মুখ্যমন্ত্রীই নন, এই ন্যায্য দাবির কথা যাতে সরকারের প্রতিটি স্তরে পৌঁছায়, তার জন্য স্মারকলিপির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে অঞ্চলের প্রভাবশালী জননেতাদের কাছে।
এর মধ্যে রয়েছেন, সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য, সাংসদ কণাদ পুরকায়স্থ, মন্ত্রী কৌশিক রাই, মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল এবং বিধায়ক ডাঃ রাজদীপ রায়। বরাকের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের এই তালিকায় যুক্ত করার মাধ্যমে মঞ্চ বুঝিয়ে দিয়েছে যে, সংস্কৃতি নিয়ে আর কোনো কালক্ষেপণ বরদাশত করা হবে না।
বরাক উপত্যকার দীর্ঘদিনের বঞ্চনা এবং সাংস্কৃতিক পরিকাঠামোর বেহাল দশার বিরুদ্ধে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চের এই পদক্ষেপ নতুন করে আলোড়ন তুলেছে। এখন দেখার বিষয়, সরকারের শীর্ষ মহল থেকে এই ঐতিহাসিক নামকরণের দাবি এবং দ্রুত ভবন হস্তান্তরের আহ্বানে কতটা ইতিবাচক সাড়া মেলে। শিলচরের নাট্যকর্মী, শিল্পী ও সাহিত্যপ্রেমীদের একটিই কথা, আর নয় অপেক্ষা, অবিলম্বে খুলে দেওয়া হোক রবীন্দ্র শতবার্ষিকী প্রেক্ষাগৃহের দরজা।





