বড়খলার বারিকনগরে গ্রুপ সদস্যা শাহানারা বেগমের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ পঞ্চায়েত নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য নেতার পর নেতা কিংবা প্রার্থীর সার্টিফিকেট জালিয়াতির কারসাজি নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবার বরাক উপত্যকার বড়খলা বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত বরমবাবা জিপির বারিকনগর দ্বিতীয় খণ্ডের এক নির্বাচিত গ্রুপ সদস্যার বিরুদ্ধে শিক্ষাগত যোগ্যতার জাল সার্টিফিকেট ব্যবহার করে ক্ষমতার মসনদে বসার এক চাঞ্চল্যকর ও গুরুতর অভিযোগ সামনে এল।
অভিযোগের তির খোদ ওই এলাকার বর্তমান গ্রুপ সদস্যা শাহানারা বেগমের বিরুদ্ধে। আর এই পুরো কেলেঙ্কারির নেপথ্যে প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং তথ্যের অধিকার আইন (আরটিআই)কে বুড়ো আঙুল দেখানোর প্রবণতা নিয়ে এখন শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক।
অভিযোগের আঙুল তুলেছে খোদ ওই এলাকারই সচেতন ও লড়াকু বাসিন্দা নজরুল হক লস্কর। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে যখন গণতন্ত্রের মহোৎসব চলছে, ঠিক সেই সময়েই বারিকনগর দ্বিতীয় খণ্ড এলাকা থেকে গ্রুপ সদস্যা পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন শাহানারা বেগম। নিয়মমাফিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অঙ্গ হিসেবে তাঁকে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণপত্র বা সার্টিফিকেট রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দিতে হয়েছিল।
কিন্তু অভিযোগকারীর দাবি, শাহানারা বেগম নির্বাচনী ময়দানে টিকে থাকার এবং ভোটারদের চোখে ধুলো দেওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে যে শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট দাখিল করেছেন, তা সম্পূর্ণ ভুয়ো ও জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি। একজন জনপ্রতিনিধির মতো পবিত্র ও দায়িত্বপূর্ণ আসনে বসার জন্য যে সততা এবং নৈতিকতার প্রয়োজন, শুরুতেই সেই স্বচ্ছতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে কীভাবে তিনি জয়ের হাসি হাসলেন, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলছেন এলাকার সাধারণ মানুষ। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী এই ধরনের জালিয়াতি কেবল অপরাধই নয়, এটি সরাসরি জনমতের সঙ্গে এক বিরাট প্রতারণা।
এই জালিয়াতির তক্ষুণি পর্দাফাঁস করতে এবং সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে বসে থাকেননি অভিযোগকারী নজরুল হক লস্কর। তিনি আইনি পথ বেছে নিয়ে তথ্য জানার অধিকার বা আরটিআই (আরটিআই) আইনের আশ্রয় নেন। শাহানারা বেগমের জমা দেওয়া শিক্ষাগত যোগ্যতার শংসাপত্রের সত্যতা ও বিশদ বিবরণ চেয়ে নির্দিষ্ট দপ্তরে আরটিআই আবেদন জমা দেন তিনি।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বা স্বচ্ছতার কথা যেখানে আরটিআই আইনের মূল ভিত্তি, সেখানে সেই আবেদন জমা পড়ার পর দীর্ঘ কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে টু শব্দটিও করা হয়নি। কোনো সদুত্তর বা নথি তো দূরের কথা, ফাইলপত্র ধামাচাপা দেওয়ার এক অশুভ তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ। মাসের পর মাস কাটার পরও এই বিষয়ে কোনো জবাব না মেলায় প্রশাসনিক মহলের ভূমিকা নিয়েই এখন বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। কার স্বার্থে এই লুকোচুরি? কার ইশারায় একটি জালিয়াতির অভিযোগকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে?
তথ্য জানার অধিকার আইনে জবাব না মেলায় থেমে থাকেননি নজরুল হক লস্কর। তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে কাছাড়ের জেলাশাসক থেকে শুরু করে সরাসরি জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষের কাছেও এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে জোরালো ও লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। আশা ছিল, প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরের হস্তক্ষেপে অন্তত সত্য উন্মোচিত হবে এবং দোষীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিন্তু বাস্তব ছবিটা সম্পূর্ণ উল্টো। অভিযোগ দায়ের করার দীর্ঘ দিন কেটে গেলেও প্রশাসন বা জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো কার্যকর, দৃশ্যমান বা নজিরবিহীন তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অভিযোগের ফাইলটি টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরেই যেন থমকে গেছে। প্রশাসনের এই রহস্যময় নীরবতা এবং কালক্ষেপের নীতি দেখে আজ সাধারণ মানুষের মনেও প্রশ্ন জাগতে শুরু করেছে, তবে কি প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এই জালিয়াত চক্রটিকে বাঁচানোর কোনো অদৃশ্য খেলা চলছে?
এই গোটা পরিস্থিতিতে ক্ষোভে ফুঁসছেন এলাকার সচেতন নাগরিক ও বিরোধীরা। নজরুল হক লস্কর সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচনের মতো একটি পবিত্র গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শিক্ষাগত যোগ্যতার মতো গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র জাল করার অপরাধ কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য হতে পারে না। অবিলম্বে এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ, উচ্চপর্যায়ের এবং স্বচ্ছ বিচারবিভাগীয় তদন্ত করা হোক।
তদন্তে যদি শাহানারা বেগমের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে তাঁকে অবিলম্বে আইনগতভাবে গ্রুপ সদস্যার পদ থেকে বরখাস্ত বা অপসারণ করতে হবে। শুধু তাই নয়, অনৈতিক ও বেআইনি উপায়ে জয়ী হওয়া ওই প্রার্থীকে অপসারিত করে নির্বাচনী ফলাফলের নিয়ম অনুযায়ী ভোটের ময়দানে দ্বিতীয় স্থানে থাকা যোগ্য প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করারও জোরালো দাবি জানিয়েছেন তিনি।
বড়খলার মাটিতে বসে ক্ষমতার লোভে সার্টিফিকেট জালিয়াতির এই স্পর্ধা প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, পঞ্চায়েত স্তরেও দুর্নীতির জাল কতটা গভীরে বিস্তার লাভ করেছে। এখন দেখার বিষয়, কাছাড় জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই গুরুতর অভিযোগের পর অবশেষে ঘুম ভাঙিয়ে কোনো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, নাকি প্রশাসনিক ফাইলচাপার খেলায় এই জালিয়াতির ঘটনাও অতিতের মতো হারিয়ে যায়। বরাক উপত্যকার বিচারপ্রার্থী মানুষ এখন তাকিয়ে রয়েছে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।






