ভোট এলে পদ, ভোট শেষে গায়েব, সাময়িক রাজনীতি ছেড়ে স্থায়ী সংগঠন গড়তে ব্যর্থ কংগ্রেস?
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ অক্টোবরঃ আজকের ডিজিটাল যুগে রাজনৈতিক প্রচারের ধরন বদলেছে ঠিকই, কিন্তু ভোটের লড়াই জিতে ক্ষমতায় আসার শেষ সত্যটি কিন্তু সেই এক ‘বুথ স্তরের সাংগঠনিক শক্তি’। দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং রাহুল গান্ধীর কৌশল নিয়ে এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সচেতন নাগরিক মহলে এই প্রশ্নই সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক, কমেন্ট, শেয়ার কিংবা ব্যারিকেডের ওপর দাঁড়িয়ে ছবি বা রিল পোস্ট করে ঝড় তোলা সম্ভব হলেও, ব্যালট বাক্সে বা ইভিএমে তার প্রতিফলন কতটা ঘটছে?

সচেতন নাগরিক ও রাজনীতির গভীর পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ, কংগ্রেস নেতৃত্বের সমস্ত মনোযোগ যেন কেবল সোশ্যাল মিডিয়া ভাইরাল রাজনীতি আর রাস্তায় সাময়িক কিছু আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিপরীতে, ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শত শতাংশ সুসংগঠিত ক্যাডারভিত্তিক পরিকাঠামোই তাদের বারবার ক্ষমতার শীর্ষস্থানে পৌঁছে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ের একাধিক প্রতিবাদ বা পদযাত্রায় দেখা গেছে, পুলিশের ব্যারিকেডের ওপর উঠে দাঁড়ানো রাহুল গান্ধীর ছবি বা নাটকীয় ভঙ্গি মুহূর্তের মধ্যে এক্স (টুইটার), ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ তা নিয়ে রিলস বানাচ্ছে, আবার বিরোধী শিবির তা নিয়ে ট্রল করছে। কিন্তু দিনশেষে প্রশ্ন একটাই, এই ভার্চুয়াল জনপ্রিয়তা কি বাস্তবে ভোটে রূপান্তরিত হচ্ছে?
রাজনীতিবিদ ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের মতে, রাস্তায় কয়েক হাজার মানুষ নিয়ে মিছিল বা স্লোগান দিলেই ভোটের বৈতরণী পার হওয়া যায় না। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় ভোটাররা এখন অত্যন্ত সচেতন ও বিচক্ষণ। শুধু জনসমাগম বা সোশাল মিডিয়ার ট্রেন্ড দেখে এখন আর ‘জনতা জনার্দন’ ভোট প্রদান করেন না। সরকার গঠনের জন্য যে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক পরিপক্কতা ও ধারাবাহিকতা প্রয়োজন, কংগ্রেসের সাংগঠনিক নীতিতে তার অভাব প্রকট। কংগ্রেসের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে সচেতন রাজনৈতিক মহলের সবচেয়ে বড় ক্ষোভ হলো তাদের ‘সাময়িক ও মরশুমি’ কর্মপদ্ধতি।
নির্বাচন ঘনিয়ে এলে তড়িঘড়ি রাজ্য, জেলা বা ব্লক স্তরে নতুন নতুন পদাধিকারী বা কমিটি ঘোষণা করা হয়। নির্বাচন পর্ব শেষ হওয়া মাত্রই সেইসব কমিটি ও সংগঠন আবার কাগুজে বা বাষ্পীভূত হয়ে যায়। সারা বছর ধরে সাধারণ মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকার মতো স্থায়ী দলীয় পরিকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের চরম উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়। ব্লক পর্যায় থেকে রাজ্য স্তরের নেতাদের মধ্যে কাজের সমন্বয় এবং ক্যাডারদের চাঙ্গা রাখার জন্য যে ধরনের দূরদর্শী রাজনৈতিক পরিপক্কতা দরকার, কংগ্রেসের সর্বভারতীয় ও আঞ্চলিক স্তরে তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
কংগ্রেস যেখানে কেবল শীর্ষস্তরের আলোড়ন ও সোশাল মিডিয়া প্রচারে ব্যস্ত, সেখানে বিজেপির জয়ের পেছনে কাজ করছে তাদের নিখুঁত ও অত্যন্ত শক্তিশালী সাংগঠনিক পরিকাঠামো। কংগ্রেস সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর, ইভেন্ট-ভিত্তিক আন্দোলন, রিল ও ট্রল | নির্বাচন-ভিত্তিক অস্থায়ী পদ বণ্টন, ভোট শেষ হলে সংগঠন নিষ্ক্রিয়। বিজেপি ক্যাডারভিত্তিক, আরএসএস চালিত, ডিজিটাল ও গ্রাউন্ড প্রচারের মেলবন্ধন, ‘পন্না প্রমুখ’ ও বুথ স্তরের ১০০% সক্রিয় প্যান-ইন্ডিয়া স্থায়ী পরিকাঠামো। বিজেপির এই ধারাবাহিক সাফল্যের মূল ভিত্তি হলো তাদের ‘পন্না প্রমুখ’ (ভোটদাতা তালিকার পৃষ্ঠাভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী) থেকে শুরু করে বুথ স্তরের নিখুঁত ট্র্যাকিং। সারা বছর ধরে অনুশাসন ও ক্যাডারভিত্তিক দল পরিচালনা করার ফলেই তারা নির্বাচনে বারবার নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হচ্ছে।
দেশের রাজনীতি সচেতন নাগরিকরা স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিচ্ছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিং হওয়া আর দেশের শাসনভার হাতে নেওয়া সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কংগ্রেস যদি সত্যিই বিজেপিকে জাতীয় স্তরে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে চায়, তবে তাদের কেবল সোশ্যাল মিডিয়া টিমের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না। রাহুল গান্ধী এবং কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্বকে প্রচারের আলো থেকে নেমে একদম গ্রাউন্ড লেভেলে কাজ করতে হবে। সারা বছর ধরে স্থায়ী দলীয় কার্যালয় সক্রিয় রাখা, নিষ্ঠাবান কর্মীদের মূল্যায়ণ করা এবং প্রতিটি বুথে স্থায়ী ক্যাডার বাহিনী তৈরি না করলে কেবল সোশাল মিডিয়ার রিল আর রাস্তার বিক্ষোভ দিয়ে শাসকদলের শক্তিশালী সাংগঠনিক দুর্গ চুরমার করা যে সম্ভব নয়, সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোর ফলাফল তা বারবার প্রমাণ করে দিচ্ছে।





