তিন দশকে বদলাল ছবি, তবু বাল্যবিবাহের বিশ্ব তালিকায় উদ্বেগে ভারত

এমনকি ২০২৬ সাল নাগাদ সাম্প্রতিক আইনি কাঠামো (ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, ২০২৩) অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সি স্ত্রীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ককেও ধর্ষণের অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। কিন্তু এই দীর্ঘ লড়াই ও আইনি কঠোরতার পরেও এক কঠিন ও নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দেশের কোটি কোটি শৈশব। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক তথ্য ও জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে বাল্যবিবাহের হার গত তিন দশকে উল্লেখজনকভাবে কমলেও সমস্যাটির সম্পূর্ণ অবসান ঘটেনি।

বর্তমানে দেশের প্রতি পাঁচজন তরুণীর মধ্যে প্রায় একজনের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। ১৯৯৬ সালে এই হার ছিল ৫০ শতাংশেরও বেশি। জাতীয় স্তরে এই পতন ইতিবাচক সংকেত দিলেও, বিশ্বজুড়ে বাল্যবিবাহের শিকার মোট মেয়েদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ভারতের যা প্রশাসনিক ও সামাজিক উদ্বেগের অন্যতম বড় কারণ। জাতীয় গড়ের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে রাজ্যভিত্তিক ও ভৌগোলিক মারাত্মক বৈষম্য। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মোট বাল্যবিবাহের অর্ধেকেরও বেশি ঘটে মাত্র পাঁচটি রাজ্যে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রদেশ।

বিপরীত চিত্রে, কেরল এবং লাক্ষাদ্বীপের মতো রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে অনেকটাই ভালো। জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার উপাত্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সি মহিলাদের মধ্যে ২৭ শতাংশের বিয়ে হয়েছিল ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। সেখানে শহরাঞ্চলে এই হার ১৪.৭ শতাংশ। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোতে ১৮ বছরের কম বয়সে মেয়েদের বিয়ের হার ৩৯.৭ শতাংশ, যেখানে সচ্ছল পরিবারে এই হার মাত্র ৭.৫ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘সিআরওয়াই’ এর প্রধান পূজা মারওয়াহা এবং ‘জাস্ট রাইটস ফর চিলড্রেন’-এর জাতীয় আহ্বায়ক রবি কান্তের মতে, বাল্যবিবাহের পেছনে মূল চালিকাশক্তি দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং অজ্ঞতা। অনেক দরিদ্র পরিবারে কন্যাসন্তানের নিরাপত্তা, পড়াশোনা এবং সামাজিক সুরক্ষার খরচ জোগাতে না পেরে অল্প বয়সেই বিয়ে দেওয়াকে দায়মুক্তির সহজ পথ বলে মনে করা হয়। কিন্তু এর ফলে একটি মেয়ের পড়াশোনা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়, অল্প বয়সে গর্ভধারণের কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে।

পাশাপাশি তাদের আর্থিক স্বাধীনতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও সংকুচিত হয়ে আসে। বাল্যবিবাহ রোধ করা মানে শুধু একটি বিয়ের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া নয়। এটি একটি মেয়ের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং স্বাধীনভাবে নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার লড়াই। পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে শিক্ষার বিস্তার বাল্যবিবাহ রোখার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পাওয়া মহিলাদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের হার যেখানে ৪৮ শতাংশ, সেখানে মাধ্যমিক বা উচ্চশিক্ষা পাওয়া মহিলাদের ক্ষেত্রে এই হার একধাক্কায় কমে দাঁড়ায় মাত্র ১৮.৯ শতাংশে। ফলে মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখা এবং মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ করানো অত্যন্ত জরুরি।

২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণ নির্মূল করার লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর কেন্দ্রীয় সরকার চালু করে ‘বাল বিবাহ মুক্ত ভারত’ মেগা অভিযান। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত এই প্রচার কর্মসূচির মাধ্যমে ১১ কোটি ৮১ লক্ষের বেশি মানুষের কাছে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সরকারি পোর্টালে ৪০ লক্ষের বেশি মানুষ বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে অঙ্গীকার নথিভুক্ত করেছেন এবং গ্রাম পঞ্চায়েত স্তর পর্যন্ত ৬৬ হাজারেরও বেশি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আধিকারিককে যুক্ত করা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞ মহলের স্পষ্ট অভিমত আইন প্রয়োগ এবং সরকারি প্রচারের পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া, মেয়েদের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় স্তরে সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো না গেলে ২০৩০ সালের মিশন সম্পূর্ণ সফল করা চ্যালেঞ্জিং হবে।

Related Posts

পুজোর আনন্দ মুহূর্তে পরিণত হল মৃত্যুমিছিলে! চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে ১৭ জনের মৃত্যুর খবর

বৃষ্টির মধ্যে মণ্ডপে উপচে পড়া ভিড়, পিছন থেকে ধাক্কা, তার পরই হুড়োহুড়ি! বহু আহতের অবস্থা সংকটজনক, মৃতের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ অক্টোবরঃ পুজোর আনন্দ, আলোর ঝলকানি আর…

২০২৩ সালেই কি শুরু হয়েছিল ‘নির্বাচনী নিয়ন্ত্রণের’ আসল খেলা?

বিরোধীদের ঘুম ভাঙতে দেরি, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন ঘিরে প্রশ্নের মুখে গণতন্ত্রের নিরপেক্ষতা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ অক্টোবরঃ ভারতের গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং অবাধ ও…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *