প্রণামী চুরি ধরা পড়েছিল ২০২১ সালেই, তথ্য ও প্রমাণ জমা মহিপাল সিংয়ে, খতিয়ে দেখছে বিশেষ তদন্তকারী দল
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৬ আগষ্টঃ অযোধ্যার রামমন্দিরকে ঘিরে বহু প্রতীক্ষিত স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলেও এবার সেই মন্দিরের আর্থিক স্বচ্ছতা ও পরিচালনা নিয়ে উঠল একাধিক গুরুতর প্রশ্ন। প্রণামী (চাঁদা) চুরি মামলায় তদন্ত চলাকালীন নতুন করে বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে এনে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন রামমন্দির ট্রাস্টের প্রাক্তন হিসাবরক্ষণ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহিপাল সিং।
শুধু সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ তুলেই থেমে থাকেননি তিনি; তদন্তকারী বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি)এর কাছেও অভিযোগের সমর্থনে বিভিন্ন নথি ও তথ্য জমা দিয়েছেন। পাশাপাশি মন্দির নির্মাণ, আর্থিক লেনদেন এবং সম্পত্তি ক্রয় নিয়ে একাধিক নতুন অভিযোগও করেছেন তিনি।
মহিপাল সিংয়ের অভিযোগ, রামমন্দির ট্রাস্ট গঠনের সময় মন্দির নির্মাণের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮০০ কোটি টাকা। কিন্তু পরবর্তীতে কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ২,২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা এখনও সরকারি তদন্তে প্রমাণিত হয়নি, তবু এত বড় অঙ্কের ব্যয়বৃদ্ধির অভিযোগ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
গত ২৬ জুলাই, তদন্তকারী এসআইটির প্রধান এবং লখনউয়ের কমিশনার বিজয় বিশ্বাস পন্ত ই-মেলের মাধ্যমে মহিপাল সিংকে তাঁর অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ জমা দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি প্রয়োজন হলে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তাঁর বয়ানও রেকর্ড করা হবে বলে জানানো হয়। সেই আহ্বানের জবাবেই মহিপাল সিং বিভিন্ন নথি ও তথ্য তদন্তকারীদের হাতে তুলে দেন, যা তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ৯ জুন সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে তিনি প্রথম একাধিক বিস্ফোরক অভিযোগ করেছিলেন। তাঁর দাবি, ২০২১ সালেই তিনি প্রণামীর অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ধরে ফেলেছিলেন, কিন্তু বিষয়টি জানিয়েও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মহিপাল সিংয়ের অভিযোগ অনুযায়ী, রামশঙ্কর যাদব ওরফে টিন্নু-র মদতে ব্যাংককর্মী রত্নেশ চতুর্বেদী এবং গগনদীপ প্রণামীর অর্থ গণনার সময় অতিরিক্ত নোটের বান্ডিল সরিয়ে টাকা আত্মসাৎ করতেন।
তিনি দাবি করেছেন, বিষয়টি তিনি ট্রাস্টের তৎকালীন মহাসচিব চম্পত রায়কে জানালে তাঁকে বিষয়টি নিয়ে নীরব থাকতে বলা হয়। শুধু তাই নয়, পরদিনই তাঁকে হিসাবরক্ষণের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করা হয় সুভাষ শ্রীবাস্তব-কে। উল্লেখযোগ্যভাবে, বর্তমানে ওই সুভাষ শ্রীবাস্তব এই মামলায় পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। যদি এই অভিযোগগুলির সত্যতা প্রমাণিত হয়, তবে তা শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, অভিযোগ গোপন করার চেষ্টার দিকেও ইঙ্গিত করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
প্রণামীর অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের পাশাপাশি মন্দির নির্মাণের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মহিপাল সিং। তাঁর অভিযোগ, নির্মাণকাজ তদারকির জন্য জগদীশ আফলে নামে একজন বৈদ্যুতিক প্রকৌশলীকে প্রকল্প প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল, যদিও তাঁর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোনও অভিজ্ঞতা ছিল না। ফলে মন্দিরের নির্মাণকাজ পরিকল্পনা ও স্থাপত্যগত মানদণ্ড অনুযায়ী সম্পন্ন হয়নি বলে তাঁর দাবি।
এছাড়াও তিনি অভিযোগ করেছেন, বাঁশি পাহাড়পুরের উন্নতমানের পাথর বিনামূল্যে পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ট্রাস্ট তা গ্রহণ না করে নিম্নমানের পাথর কিনেছিল। এই অভিযোগও তদন্তের আওতায় আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
মহিপাল সিংয়ের আরও দাবি, মহন্ত শশিকান্ত দাসকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর রাম কচেহরি মন্দিরে ট্রাস্টের কার্যালয় স্থাপন করা হয়। অথচ জগন্নাথ মন্দির, লব-কুশ মন্দির এবং রংমহল মন্দিরে বিনামূল্যে জায়গা পাওয়ার সুযোগ ছিল। তাঁর অভিযোগ, ট্রাস্ট এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকেও একাধিক বিতর্কিত সম্পত্তি কিনেছিল, যাঁদের ওই সম্পত্তির ওপর বৈধ মালিকানা ছিল না। ফলে পরবর্তীতে ট্রাস্ট সেই সম্পত্তির দখল পায়নি এবং আদালতে মামলা পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।
এসআইটির কাছে জমা দেওয়া নথিতে মহিপাল সিং আরও দাবি করেছেন, ট্রাস্টের তৎকালীন ক্যাশিয়ার বীরেন্দ্র বর্মা এমন বহু ব্যক্তির নামে অর্থ প্রদান করেছেন, যাঁরা বাস্তবে কোনও নির্মাণকাজ বা পরিষেবা প্রদান করেননি। অভিযোগ অনুযায়ী, এই ধরনের অর্থপ্রদান আর্থিক অনিয়মের ইঙ্গিত বহন করে এবং বিষয়টি তদন্তে গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। রামমন্দির দেশের কোটি কোটি মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আবেগের কেন্দ্রবিন্দু। তাই এই ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে এও মনে রাখা জরুরি, মহিপাল সিংয়ের উত্থাপিত অভিযোগগুলি বর্তমানে তদন্তাধীন এবং এখনও আদালত বা তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি। এখন নজর তদন্তকারী এসআইটির দিকে। জমা পড়া নথি ও তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত কতদূর এগোয়, অভিযোগগুলির সত্যতা কতটা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রয়োজনে কারও বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না সেদিকেই নজর থাকবে দেশবাসীর।





