বনাঞ্চলে কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে অতর্কিত হামলা, প্রশাসনের কড়া নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে রাজপথে আছড়ে পড়ল জনরোষ
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৯ অক্টোবরঃ শান্তির সমস্ত আশাকে ধূলিসাৎ করে পাহাড়ি রাজ্য মণিপুরে ফের শুরু হলো রক্তের হোলিখেলা। নতুন করে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ সহিংসতায় সন্দেহভাজন উগ্রপন্থীদের নির্বিচার গুলিতে প্রাণ হারালেন অন্তত চারজন নিরীহ বেসামরিক নাগরিক। সোমবার সকালে ইম্ফল পূর্ব এবং কাংপোকপি জেলার সীমান্ত সংলগ্ন এক দুর্গম বনাঞ্চলে কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে অতর্কিত এই হামলার শিকার হন একদল গ্রামবাসী।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর রাজধানী ইম্ফলজুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র গণক্ষোভ ও চাঞ্চল্য। বিচার ও নিরাপত্তার দাবিতে নিহতদের মরদেহ সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচাঁদ সিং-এর বাসভবনের মূল ফটকের সামনে এনে নজিরবিহীন বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন শত শত উত্তেজিত নাগরিক। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিরাপত্তা বাহিনীকে ফাঁকা টিয়ার গ্যাসের সেল নিক্ষেপ করতে হয়। ঘটনার পর থেকে রাজধানীজুড়ে জারি রয়েছে থমথমে পরিস্থিতি ও কড়া নিরাপত্তা বলয়।
বনাঞ্চলে অতর্কিত হামলা: নিমিষেই রক্তে লাল পাহাড়ি পথ
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার সকালে দৈনন্দিন জীবিকার তাগিদে ইম্ফল পূর্ব ও কাংপোকপি জেলার সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলে কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন স্থানীয় বেশ কয়েকজন গ্রামবাসী। তাঁরা যখন বনের ভেতরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই আগে থেকে ওত পেতে থাকা একদল সশস্ত্র উগ্রপন্থী তাঁদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ শুরু করে।
হঠাৎ হওয়া এই হামলায় আত্মরক্ষার কোনো সুযোগই পাননি গ্রামবসাীরা। ঘটনাস্থলেই রক্তাপ্লুত হয়ে লুটিয়ে পড়েন চারজন। গুলির শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। পরবর্তীকালে স্থানীয়রা ও উদ্ধারকারী দল গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁদের উদ্ধার করলেও প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়নি। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ার সুযোগ নিয়ে দুষ্কৃতীরা ঘন জঙ্গলের ফায়দা তুলে চম্পট দেয়।
মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনে নজিরবিহীন বিক্ষোভ: রাজপথে রাজকীয় ক্ষোভ
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়তেই দাবানলের মতো জ্বলে ওঠে জনরোষ। রাজ্যের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের গাফিলতির অভিযোগ তুলে রাস্তায় নেমে আসেন নিহতদের স্বজন ও ক্ষুব্ধ জনতা। বিচার ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে দুটি মৃতদেহ একটি বাহনে করে সোজা নিয়ে আসা হয় রাজধানী ইম্ফলে, মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচাঁদ সিং-এর সরকারি বাসভবনের সামনে।
মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের মূল ফটকের ঠিক বাইরে লাশ দুটি রেখে শত শত সাধারণ মানুষ বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করেন। নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ সরকার দূর হটো’, ‘উগ্রপন্থীদের কঠোর শাস্তি চাই, এমন নানা স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা চত্বর। বিক্ষোভকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চললেও রাজ্য ও কেন্দ্র প্রশাসন স্থায়ী কোনো সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে পারছে না।
কড়া পুলিশি পদক্ষেপ ও টিয়ার গ্যাস: ইম্ফলে থমথমে পরিবেশ
মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের মতো অতি-সংবেদনশীল এলাকায় হঠাৎ হাজারো বিক্ষোভকারীর উপস্থিতি এবং মরদেহ রেখে অবস্থান বিক্ষোভের ফলে চরম প্রশাসনিক সংকট তৈরি হয়। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর অবস্থান নেয়। রাজপথ থেকে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে ও রাজভবন এলাকা খালি করতে একাধিক রাউন্ড কাঁদানে গ্যাসের সেল ফাটায় পুলিশ ও সিআরপিএফ।
মুহূর্তের মধ্যে এলাকা ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ছোটাছুটি শুরু হয়। প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও ইম্ফল শহরের আকাশ-বাতাস এখনো থমথমে। মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচাঁদ সিং-এর বাসভবন, সচিবালয় এবং সংলগ্ন এলাকাগুলোকে মুড়ে ফেলা হয়েছে অতিরিক্ত সেনা ও আধা-সামরিক বাহিনীর ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা বলয়ে।
সমালোচনা ও মূল্যায়ন: শেষ কোথায় এই সহিংসতার?
মণিপুরে জাতিগত ও রাজনৈতিক হিংসার যে আগুন গত বহু মাস ধরে জ্বলছে, এই ঘটনা তারই এক করুণ ও বিভৎস রূপ। সরকারের একাধিক আশ্বাস এবং বিপুল পরিমাণ নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একদল উগ্রপন্থী বনাঞ্চলে ঢুকে চারজন নিরীহ মানুষকে এভাবে হত্যা করতে পারল, তা নিয়ে প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার বড় প্রশ্ন উঠে গেছে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, “সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এখন আর শুধু উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে সীমিত নেই, তা সরাসরি আছড়ে পড়ছে সরকারের দরজায়। মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে লাশ রেখে বিক্ষোভের দৃশ্য প্রমাণ করে রাজ্যবাসীর ধৈর্য ও আস্থার পারদ কতটা তলানিতে এসে ঠেকেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কেবল কাঁদানে গ্যাস বা নিরাপত্তা বাড়িয়ে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া গেলেও, মনিপুরের এই দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত মেটাতে ও নিরীহ নাগরিকদের জীবন রক্ষা করতে প্রয়োজন আরও কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও স্থায়ী সমাধান। তা না হলে রাজপথের এই প্রতিবাদের আগুন আরও দাবানলে রূপ নিতে সময় নেবে না।





